বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রের সিংহভাগ টাকাই আসে জনগণের পকেট থেকে। তাই জনগণের পয়সা নিয়ে জনগণের সামগ্রিক মুক্তির জন্য কাজ করাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। যেকোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তা-ই করা উচিত। বলা দরকার, আর্থিক দিক থেকে রাষ্ট্রের আইনসিদ্ধ ভূমিকা হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া এবং জনতার অর্থের বিচক্ষণ ও ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন করা। সে দায়িত্ব কোনোরকম পালন করেই যদি কোনো সরকার দাবি করে বসে, তারাই বিশ্ববিদ্যালয়কে টাকা দেয়, তখন কি সত্যের অপলাপ হয় না?

দ্বিতীয় প্রশ্ন, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে কি সরকার আদৌ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখেছে বা রাখতে চেয়েছে কখনো? একচোখা দল–অনুগত ব্যক্তিদের সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথবা বৈচিত্র্যময় তদবিরের তেজারতিতে তুষ্ট হয়ে ‘অযোগ্য’ ও সুবিধা-অন্বেষীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। এর মধ্যে সজ্জন হয়তো কিছু আছেন, তবে সে সংখ্যা নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায় না মোটেই। এতে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটা যে স্বাধীন থাকতে পারছে, তা সবাই এখন বোঝেন।

সেই সঙ্গে উল্লেখ করা যায়, শিক্ষার্থীদের দলীয় রাজনীতির ক্রীড়নক বানানোর বিস্তর কাঠামোগত আয়োজনের কথাও। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন-রাজনৈতিক, প্রভাবশালী আমলা ও বিরাট ব্যবসায়ীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ তো আছেই। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে উপাচার্য নিয়োগের জন্য গ্রহণযোগ্য সার্চ কমিটিই এখন হ্যাজাক জ্বালিয়ে সার্চ করতে নামতে হচ্ছে। তারপরও কোথাও তার হদিস মিলছে না।

এই সূত্র ধরে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কার্যকর অর্থে কোনো স্বায়ত্তশাসন নেই। উল্লেখ্য, প্রজাতন্ত্রের কিছু কর্মচারী এবং গণমাধ্যমের কেউ কেউ অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবেই দেখেন। দেখাতেও চান। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে তো বটেই। এটা তাদের আলাপ-আলোচনা, প্রতিবেদন ও মন্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। সাম্প্রতিক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন পর্যালোচনা করলেও যে কেউ এগুলোকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বলতে পারেন। সরকারি কর্তৃত্বের কাঠামোগত বিন্যাসটা এমনই রাখা হয়েছে সেখানে। এ রকম বাস্তবতার মধ্যে পড়ে প্রশ্ন আসে, রাষ্ট্রের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ন্যায়ত সরকারি হবে, নাকি স্বায়ত্তশাসিত হবে?

প্রকৃতপক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম কাজগুলোর একটি হচ্ছে নতুন নতুন জ্ঞান সৃজন করা। আর জ্ঞানকে তো অবশ্যই ‘সত্য’-নির্ভর ও নির্মোহ হতে হবে। তাই নতুন জ্ঞান ওই সময়ের ক্ষমতাসীনদের দর্শন ও বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ক্ষমতার একচেটিয়াপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। তা ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধরে নেওয়া বিশ্বাস, বাজারের বয়ান, সামাজিক মূল্যবোধ ইত্যাদির ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার শর্ত হাজির করতে পারে কোনো কোনো গবেষণার ফলাফল। তাই কর্তৃত্ববাদী সত্তার নিয়ন্ত্রণরেখার ভেতরে ‘প্রকৃত জ্ঞান’ সৃষ্টি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ, সরকারি, সামাজিক বা ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সত্যের প্রতি বিশ্বস্ত এবং মহাকালের প্রতি অনুগত বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান উৎপাদনের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

আর বস্তুনিষ্ঠ ও প্রগতিসূচক জ্ঞান উৎপাদন করতে ব্যর্থ হলে কোনো একটি জাতিকে অনন্তকালের জন্য পরাজয় ও পশ্চাৎপদতার গ্লানি বরণ করে নিতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই তাতে। অথচ কেউ কি গত কয়েক যুগে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো গবেষণা দেখেছেন, যা ক্ষমতাসীনদের মতাদর্শের সঙ্গে মৌলিক অর্থে সাংঘর্ষিক? আবার এ কথাও বলতে হবে, হীন উদ্দেশ্য নিয়ে ক্ষমতা-নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বিশেষ ধরনের জ্ঞান উৎপাদনে মাঠে নেমে পড়াটাও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হতে পারে না। মানবমুক্তির জন্য সত্যনিষ্ঠাই এসব প্রতিষ্ঠানের আরাধ্য হওয়া উচিত।

স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আরও একটু বলা যাক। স্বাধীনতা দিলেই যে তার প্রতি সুবিচার করা হবে, এমন নজির বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে বেশ কিছুটা সীমাবদ্ধতা ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা ও সম্পদের কুৎসিত পুঞ্জীভবন সেসব সংকীর্ণতাকে আরও প্রবলভাবে উৎসাহিত করেছে।

এটা মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। তাই এখান থেকে উত্তরণ আবশ্যক। এমন বাস্তবতায় সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিদ্বজ্জন, রাজনীতিবিদ, নির্মোহ-শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংলাপ আয়োজিত হোক। আর এ পথ ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কল্যাণমূলক-স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেই সবচেয়ে বেশি আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা ধারণ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি সমাজের আরোগ্যনিকেতন। সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে। বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও অগণন মুক্তিযোদ্ধার রক্তের বেদিতে গড়ে উঠেছে প্রিয় এই বাংলাদেশ। তাকে যদি আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে চাই, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর অর্থেই স্বাধীনতা দিতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্বায়ত্তশাসনের শিশু–ভোলানো গল্প দিয়ে সমাজে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা মোটেই সম্ভব হবে না। তাই দায়িত্বশীলেরা কালক্ষেপণ না করে এখনই উদ্যোগ নিন।

* কাজী মসিউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন