এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে যাদের নেওয়া হয়েছিল, তারা কিন্তু মূলত জনবিচ্ছিন্ন একটা গ্রুপ। কেউ সাবেক আমলা, কেউ সাবেক বিচারপতি। তাঁদের সঙ্গে রাজনীতি কিংবা দেশের কোনো আন্দোলনের যোগসূত্র নেই, জনগণের সুখ-দুঃখের সঙ্গে তাঁরা নেই। কিন্তু নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে তাঁদের সেখানে বসানো হয়েছে। এটি একবার, দুবার হয়েছ। কিন্তু এটি একটি প্রক্রিয়া হিসেবে থাকতে পারে না।

এর বদলে নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষমতাটা প্রয়োগ করতে পারে। নির্বাচনকালীন সরকারের ওপরও তারা কর্তৃত্ব দেখাতে পারে। যখন-তখন যেকোনো ডিসি, এসপিকে সরিয়ে দিতে পারবে। সে ধরনের ক্ষমতা যদি কমিশনকে দিয়ে দেওয়া হয় এবং সেটি প্রয়োগ করার মানসিকতা যদি তাদের থাকে, তাহলেই পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমার কাছে সবচেয়ে বড় ব্যত্যয় বলে মনে হয়, আমরা স্বাধীনতা কাকে বলে, সেটিই ভুলে গেছি। যেমন অনেকে বলেন বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়। কিন্তু কেউ যদি ওপর থেকে বিচার বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চায় এবং বিচারক যদি সেটা অবজ্ঞা করেন বা না মানেন, তাহলে বিচারকের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। এখানে ক্ষমতা বা স্বাধীনতা যে তাঁর আছে, সেটি তো বিচারককে বুঝতে হবে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও আমরা যতই সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দিই না কেন, তাদের তো আগে বুঝতে হবে কী ক্ষমতাটা তাদের আছে।

অনুসন্ধান কমিটিকেই বৈধভাবে সাংবিধানিক আইনে রূপ দেওয়া হচ্ছে। বিএনপিসহ যেসব রাজনৈতিক দল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিরোধিতা করছে, তাদের দাবি ছিল একটি আইন করা হোক। কিন্তু তারা সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়নি। যে কারণে সরকার তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই আইনটি করতে যাচ্ছে। সরকার এখন বলবে আমরা তো আইন করে দিয়েছি।

প্রশ্ন হলো, আমরা আইনটি কেন চেয়েছি? জাতীয় নির্বাচন কিংবা স্থানীয় নির্বাচন যেটিই হোক না যেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন হয়। মানুষ নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোট যেন দিতে পারেন। নির্বাচনকালে যেন প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব থাকে।

আইন যেটিই হোক, মূল সমস্যাটি রাজনৈতিক। দলগুলোর মধ্যে যদি সহিষ্ণুতা না থাকে, সবকিছুর সমাধান যদি নেপথ্যে হয়, তাহলে তো কোনো কিছুই এগোবে না। আওয়ামী লীগ হোক, বিএনপি হোক কিংবা অন্য কোনো দল হোক—সবাই ক্ষমতায় আসতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষাটা স্বাভাবিক। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাবোধ কতটুকু, সেটিই বড় প্রশ্ন। সেই অর্থে দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নেই। বিরোধী দল যখন আন্দোলনের মধ্যে থাকে, তখনো একটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। কোনো দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদেরও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হয়। দলের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকলে তাদের কাছ থেকে গণতন্ত্র আশা করা যায় কীভাবে?

যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, নির্বাচন কমিশন তার মোসাহেবি করে। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন নিয়ে মানুষের আস্থা থাকছে কি না। স্বতন্ত্রদের নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা সৃষ্টির পর তারা স্থানীয় নির্বাচনকেও দলভিত্তিক করেছে। এই যে সীমাবদ্ধতা নির্বাচন কমিশন করে দিয়েছে, এতে যতই আমরা আইন করি না কেন, তাতে গণতন্ত্র সুসংহত হবে না।

দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখুন, সব দলেই এখন নারী নেতৃত্ব আছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন আছে। কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ কতটা হচ্ছে? বরং সব আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনো আইন সমর্থন করে না। কিন্তু কত নামেই তো সেটা হচ্ছে। এতে মানুষের বিচার বিভাগের প্রতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা থাকে না। মূল কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রতি সবার আস্থা থাকতে হবে। জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি থাকতে হবে।

অনুসন্ধান কমিটির বিষয়কে নির্বাচন কমিশন আইনে রূপ দেওয়া হলেও সেটি সবার কাছে গৃহীত হবে না। আবার যে আইনই করা হোক, আজ সর্বজনীন হলে, ভবিষ্যতে সর্বজনীন থাকবে, সেটাও নয়। নব্বইয়ে এখানে রাজনৈতিক দলগুলো তিন জোটের রূপরেখা করেছিল। কিন্তু পরে এর ধারেকাছেও কেউ যায়নি। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে আমাদের দলগুলো ভালো ভালো কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে উল্টে যায়। মূল কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা থাকতে হবে।

এখন বাংলাদেশে নির্বাচনের ক্ষেত্রে অলিখিত আইন হচ্ছে, কোটিপতি না হলে কেউ নির্বাচন করতে পারবে না। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সেটি হচ্ছে। পত্রিকার খবরেই এসেছে, ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য একজন ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। ইউপি নির্বাচনে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কী হতে পারে? এত টাকা খরচ করে মনোনয়ন নেওয়ার ক্ষমতা কয়জনের আছে?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটা অবক্ষয় বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্েছ। তা না হলে ভারতের মতো একটি দেশে বিজেপির মতো দল ক্ষমতায় কীভাবে আসে? আব্রাহাম লিঙ্কনের দলের প্রতিনিধি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমাদের দেশেও সে অবক্ষয়ের কাল চলছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটি সামনে আনা দরকার, সেটি হলো কার জন্য গণতন্ত্র? কী ধরনের গণতন্ত্র?

আমাদের দেশে গণতন্ত্রের নামে একটি অগণতান্ত্রিক পথে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। বর্তমান কিংবা বিগত সরকারগুলোও এর বাইরে নয়। ভবিষ্যতেও এর পরিবর্তন হবে না যদি না আমরা আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে না পারি। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোটের অধিকার নয়, নির্বাচিত হওয়ার অধিকারও থাকতে হবে। নির্বাচন মানে কোটি টাকার খেলা—এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, নির্বাচন কমিশন তার মোসাহেবি করে। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন নিয়ে মানুষের আস্থা থাকছে কি না। স্বতন্ত্রদের নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা সৃষ্টির পর তারা স্থানীয় নির্বাচনকেও দলভিত্তিক করেছে। এই যে সীমাবদ্ধতা নির্বাচন কমিশন করে দিয়েছে, এতে যতই আমরা আইন করি না কেন, তাতে গণতন্ত্র সুসংহত হবে না। আইনে থাকতে হবে, যে কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে, অমুক সংখ্যক ভোটারের সমর্থন আদায়ের বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

আইনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কৃতি পরিবর্তন দরকার। আইন প্রয়োগের জন্য তাদের আন্তরিকতা থাকতে হবে। আমার মত হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। সেখানে পাঁচজন প্রার্থী থাকলে পাঁচজনই যেন সমান সুযোগ পান। কিন্তু এখন অলিখিত আইনের কাছে সবাই বন্দী। জনগণ যাতে অলিখিত আইনের কাছে বন্দী না হয়, সে রকম একটি আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। গণমুখী নীতিমালা থাকতে হবে। গণতন্ত্র যদি ব্যবসায়ী ও ধনীদের জন্য শুধু হয়, গরিবেরা যদি শুধু ভোট দেওয়ার জন্য থাকে, তাহলে গণতন্ত্র হবে না।

নির্বাচন কমিশন আইনে গণতন্ত্রের সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকতে হবে।

  • জেড আই খান পান্না আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন