default-image

বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। হাসপাতালে রোগীর সংকুলান করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির তীব্রতা দেখে মনে হচ্ছে দ্বিতীয় ঢেউয়ের উচ্চতা অনেক বেশি হবে। তাই আংশিক বা এলাকাভিত্তিক লকডাউনের কথা বলছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

আংশিক বা সর্বাত্মক লকডাউন কার্যকর করতে পারলে সুফল আসে, যদি কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়ানোর পর লকডাউন করলে সংক্রমণ কমার বা নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং উল্টো জনদুর্ভোগ অনেক গুণে বেড়ে যায়। বাংলাদেশে কমিউনিটিতে সংক্রমণ বছরব্যাপী ছড়িয়েছে। এখন তার তীব্রতা প্রকট হয়েছে। অ্যান্টিবডি টেস্ট করে সেরো-প্রিভালেন্স বের করলে হয়তো দেখা যাবে যে জনগণের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। গত বছর টোলারবাগে আংশিক লকডাউন সফল হয়েছিল, কেননা তখন কমিউনিটিতে সংক্রমণ তেমন ছড়ায়নি। কিন্তু পরে রেড-জোনভিত্তিক লকডাউন যখন করা হলো, তা কিন্তু তেমন সফল হয়নি। কারণ, তখন রেড-জোন কমিউনিটিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।

বিজ্ঞাপন
ঢিলেঢালা লকডাউন অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি এবং মানুষের ভোগান্তিই বাড়ায়। তাই সর্বাত্মক তো নয়ই, বরং আংশিক লকডাউনও যে কোনো সুফল বয়ে আনবে না, এ তো আমরা গতবারের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি। আর দেশব্যাপী লকডাউনের আর্থিক ক্ষতির অঙ্কটাও নিশ্চয়ই কম নয়

লকডাউন সফল করার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো জনগণকে সম্পৃক্ত করা, প্রান্তিক আয়ের মানুষদের সরকার কর্তৃক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর কোনোটির সক্ষমতাই আমরা অর্জন করতে পারিনি। গত বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা জানি যে আমাদের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশ এবং জনগণের অসহিষ্ণুতার কারণে এর কোনোটিই ভালোভাবে পালন করা সম্ভব নয়।

তা ছাড়া ঢিলেঢালা লকডাউন অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি এবং মানুষের ভোগান্তিই বাড়ায়। তাই সর্বাত্মক তো নয়ই বরং আংশিক লকডাউনও যে কোনো সুফল বয়ে আনবে না, এ তো আমরা গতবারের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি। আর দেশব্যাপী লকডাউনের আর্থিক ক্ষতির অঙ্কটাও নিশ্চয়ই কম নয়। গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের অর্থনৈতিক ক্ষতি আমরা হিসাব করেছিলাম। যেখানে শিক্ষা খাতের ক্ষতি বাদেই প্রতিদিন ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হিসাবে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল। এখন দেশব্যাপী লকডাউন দিলে ক্ষতির অঙ্কটা নিশ্চয়ই আগের তুলনায় কম হবে না।

এসব কথা মাথায় রেখে তাই হয়তো সরকার দেশব্যাপী লকডাউনের চিন্তা করছে না। আর সেটাই যুক্তিসংগত। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। তবে এসব নির্দেশনা কার্যকরভাবে কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা-ও বিচার্য। যেমন গণপরিবহনে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নেওয়া এবং কলকারখানা ও অফিসে অর্ধেক জনবল দিয়ে পরিচালনা করা বাস্তবিক পক্ষে বেশি দিন চলমান রাখা সম্ভব নয়। আর কিছু কিছু নির্দেশনা তো সারা বছর ধরে চলমান রয়েছে, কিন্তু সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আবার কিছু নির্দেশনা তো বাস্তবধর্মীই নয়। যেমন ৫০ ভাগ লোকবল দিয়ে অফিস বা কলকারখানা চালানো। এর ফলে নিয়ম রক্ষার্থে অফিস বা কারখানা খোলা থাকলেও কার্যকরভাবে কিছু হয় না।

তাহলে বিকল্প কী? আমাদের নিজস্ব আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাবতে হবে। ইউরোপ কিংবা প্রতিবেশী দেশ কী করল, সেটা না ভেবে আসুন আমরা নিজেদের মতো করে ভাবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা বা কলকারখানা এবং অফিস অর্ধেক জনবল দিয়ে পরিচালনা করা কোনো সমাধান নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি খোলা রেখে সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং সর্বাত্মক মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সর্বাত্মক মাস্ক ব্যবহার করা সরকার ঘোষিত ১৮ দফা নির্দেশনার মধ্যেও অন্যতম। পাশাপাশি হাত ধোয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে আরও ভালো সুফল আসবে।

তাই টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনগণকে সর্বাত্মক মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করাই বাংলাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণের মূল নিয়ামক হতে পারে। এ জন্য একদিকে যেমন জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে, অন্যদিকে সরকারের হয়তো আরও কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। উল্লেখ্য, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আর্থিক জরিমানা বা অন্য কোনো মৃদু শাস্তি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পেরেছে, এমনটি মনে হয় না। তাই নতুন কোনো পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে।

দেশ-বিদেশের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে বস্তিতে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের করোনা সংক্রমণের হার শহরাঞ্চলের তুলনায় কম নয়। তবে তাদের ভেতরে রোগের তীব্রতা তেমন নেই। তাই তাদের মধ্যে মৃত্যুহারও অনেক কম। কারণ হিসেবে তাদের শরীরে ভিটামিন ডির পর্যাপ্ত উপস্থিতির বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়েছে। তাই শহরাঞ্চলে বসবাসরত জনগণকে প্রতিদিন সকালবেলার কিছু সময়, বিশেষ করে সকাল ১০টার ভেতরে রোদে থাকার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধাসহ অন্য যেসব সংকট তীব্রভাবে বিরাজমান, তা নিয়েও ভাবতে হবে। রাতারাতি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বা আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো সম্ভব নয়। আর আইসিইউ চালানোর জন্য দক্ষ জনবলের সংখ্যা রাতারাতি বাড়ানো তো একেবারেই অসম্ভব। তাই এ ক্ষেত্রেও আমাদের বিকল্প ভাবতে হবে।

প্রথমত, সরকারি হাসপাতালের যেসব আইসিইউ শয্যা অকেজো আছে, তা দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আইসিইউ বেড পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল জোগানের ব্যবস্থা করতে হবে। বসুন্ধরা সিটি এবং মগবাজারের নবনির্মিত কাঁচাবাজার ভবনে যে করোনা ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তা আবার চালু করতে হবে। জেলা এবং বিভাগভিত্তিক যেসব বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সুবিধা আছে, কিন্তু করোনা রোগী চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, তাদের করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থা চালুর জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সরকার প্রয়োজনে এসব হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণসহ সার্বিক সহযোগিতা করতে পারে। এতেও যদি সংকুলান না হয়, তাহলে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ও প্রয়োজনে স্টেডিয়ামেও অস্থায়ীভাবে করোনা রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন