বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিছু খবরের শিরোনাম দেখা যাক। দোকানে বিক্রি হচ্ছে উজি পিস্তল (২৮ অক্টোবর, ২০২০, প্রথম আলো)। মডেল পিয়াসার হাতে উজি পিস্তলের ছবি ভাইরাল। চেয়ারম্যানের দেহরক্ষীর পিস্তল হাতে ছবি ভাইরাল (যুগান্তর, ৫ জুলাই, ২০২১), সাধারণ মানুষের হাতে মিলিটারি গ্রেডের অস্ত্র, উদ্বিগ্ন পুলিশ (বাংলা ট্রিবিউন, ২৯ অক্টোবর, ২০২০), ইসি সচিব চান শটগানধারী দেহরক্ষী, (যদিও পিস্তলধারী রয়েছে তাঁর) (প্রথম আলো, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮)। এ রকম অজস্র ঘটনা আছে। অস্ত্র অনেকেই রাখেন এখন। কেউ দেখান, কারওটা বেরিয়ে পড়ে, অন্যরা সময়মতো দেখাবেন বলে যত্ন করে রেখে দিয়েছেন।

এর মধ্যে বেশি মারাত্মক হলো বেসামরিক ব্যক্তিদের হাতে চলে আসা সামরিক গ্রেডের ৫৩টি উজি পিস্তল। তাঁরা এগুলো লাইসেন্সের বলে কিনেছেন এবং অস্ত্রের কারবারিরাও আইনের ফাঁকটাকে বড় করে এক পদের আগ্নেয়াস্ত্রের জায়গায় আরেক পদের আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি করে সেরেছেন। চমকের বিষয়টা অন্য জায়গায়। এসব অস্ত্রের ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই রাজনীতির লোক। থানা পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে মাঝারি গোছের নেতারাও আছেন অস্ত্রের মালিকানায়।

সুতরাং আমরা নেতা পেলাম, আমলা পেলাম, মডেল পেলাম, এমপি-চেয়ারম্যান পেলাম, ইসি–সচিব পেলাম। ঢাকায়ও পেলাম, ঢাকার বাইরেও পেলাম। এমনকি গর্হিতভাবে ফাঁস হওয়া ফোনালাপে শুনলাম, রাজধানীর বিখ্যাত ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের প্রিন্সিপাল বলছেন, তাঁর বালিশের নিচে পিস্তল থাকে, ভ্যানিটি ব্যাগেও থাকে। এবং আমরা এও দেখলাম, সুপার ধনী পরিবারের দুই সন্তান পিস্তল দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তার গাড়িতে গুলি করছেন। তার আগে দেখেছি সরকারদলীয় নারী এমপির সন্তান রাস্তার যানজটে বিরক্ত হয়ে গুলি ছুড়েছেন। তাতে মারা গেছেন একজন গরিব রিকশাচালক। ভানুমতীর এই বায়োস্কোপের খেলায় আমরা এও দেখেছি, পুরান ঢাকার প্রতাপশালী একজন নেতার বাড়িতে বিবিধ রকম অস্ত্র ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম!

এসব কিসের আয়োজন, কিসের প্রস্তুতি? রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন, আমলাতন্ত্রের গদিনশিন থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি মায় বিচারক পর্যন্ত ব্যক্তিগত অস্ত্র কিংবা অস্ত্রধারী দেহরক্ষী ছাড়া নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন করছেন না? রাষ্ট্র কি আর তার কর্মচারী কিংবা নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না? নাকি এ ব্যক্তিরা এমন কিছু করেছেন, যার জন্য তাঁদের বাড়তি নিরাপত্তা নিতে হচ্ছে? অস্ত্রের ট্রিগারটা নিজের হাতেই রাখতে হচ্ছে?

রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন, আমলাতন্ত্রের গদিনশিন থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি মায় বিচারক পর্যন্ত ব্যক্তিগত অস্ত্র কিংবা অস্ত্রধারী দেহরক্ষী ছাড়া নিরাপদ বোধ করছেন না? কেন করছেন না? রাষ্ট্র কি আর তার কর্মচারী কিংবা নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না? নাকি এ ব্যক্তিরা এমন কিছু করেছেন, যার জন্য তাঁদের বাড়তি নিরাপত্তা নিতে হচ্ছে? অস্ত্রের ট্রিগারটা নিজের হাতেই রাখতে হচ্ছে?

অস্ত্রবাজির লাগামছাড়া প্রচলনের চূড়ান্ত চেহারা হলো বালক–শিশুদের গুলি ছুড়তে শেখানো। যে বিচারক এটি করেছেন, তিনি বলেছেন, এটি ২০১৫ সালের ঘটনা। ছবিটাও সেই সময়ের। অস্ত্র তাঁর লাইসেন্স করানো হলেও শিশুদের হাতে সেসব তুলে দেওয়ার জন্য তিনি দুঃখিতও বটে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বিগত ছয় বছরে শিশু দুটি কি গুলি করে লক্ষ্যভেদ করা শিখেছিল?

শিশুর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া অপরাধ। অস্ত্র চালানো শেখানো আরও মারাত্মক অপরাধ। আগেকার যুগের রাজার সন্তান রাজা হতো। রাজতন্ত্র বলপ্রয়োগের ওপর প্রতিষ্ঠিত শাসন, অস্ত্রই সেখানে আইন। রাজার ছেলেকে অবশ্যই অস্ত্র চালনায় দক্ষ হতে হতো। কারণ, যুদ্ধ করে রাজত্ব রক্ষার দায়িত্ব তো রাজা ও তাঁর পরিবারের ওপরই ওপরই বর্তায়। আমাদের ‘ক্ষমতাবানেরা’ কি নিজেদের রাজা বা রাজপরিবারের সমতুল্য মনে করছেন? অবস্থা যা, মনে করতেই পারেন।

কিন্তু রাজকীয় মানসিকতা একটা খাসলত। আইনি-বেআইনি পথে আমলা-প্রশাসন-ব্যবসায়ী-নেতা-ছাত্রনেতাদের অস্ত্রনির্ভরতার অর্থ আরও ব্যাপক ও উদ্বেগজনক। তাঁরা কি মনে করছেন যে ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? নিজেদের সশস্ত্র ও সতর্ক না রাখতে পারলে সমূহ বিপদ? তার জন্য এমনকি নাবালক সন্তানকেও অস্ত্রকুশলতা শেখাতে হচ্ছে? রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে একে বলে দুর্গ মানসিকতা।

দুর্গ মানসিকতা হলো একদল মানুষের সার্বক্ষণিক ভীতির অবস্থা। কোনো গোষ্ঠী যদি বিশ্বাস করে যে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বা শত্রুপরিবেষ্টিত হয়ে গেছে এবং তারা অনবরত হামলার শিকার হচ্ছে বা হবে, তখন নিজেদের তারা আলাদা করে ফেলে। তাদের মনের মধ্যে কাজ করে যে হয় তুমি আমার পক্ষে নয়তো তুমি আমার শত্রু। চারপাশ নিয়ে তীব্র সন্দেহ ও ভয় তাদের আর বাস্তবতা বুঝতে দেয় না। তারা অতি প্রতিক্রিয়া করা শুরু করে।

এই অতি প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ হরেদরে অস্ত্রধারী হওয়ার হিড়িকের মধ্যে দেখা যায়। এটা হলো ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া। সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল এ বছরের এপ্রিল মাসে থানায় হামলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর ফরিদপুরে। তারপর দেখা গেল, বালুর বস্তার পেছনে মেশিনগান বসেছে সিলেট ও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি থানার সামনে। সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যদের সার্বক্ষণিক অস্ত্র ও গুলি সঙ্গে রাখার বিষয়ে পরামর্শও দেওয়া হয়, এখনো যা বহাল রয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা বন্ধ করায় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে। কিন্তু দুর্গ মানসিকতা প্রশাসনের ভেতরকার আস্থা ও জনসংযোগের ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে সাধারণের থেকে। সাধারণের মধ্যে এক দেশ দুই ‘নিরাপত্তা’র ধারণা তৈরি হতে পারে, যেখানে নাকি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিকেরা অস্ত্র রাখবেন, দেহরক্ষী রাখবেন, কিন্তু ক্ষমতাহীনেরা বেডরুমেও নিরাপত্তা পাবে না। শুধু তা–ই নয়, জনবিক্ষোভ দমনে পুলিশ-র‍্যাবের পাশাপাশি ‘সশস্ত্র সিভিলিয়ানদের’ও দেখা যাচ্ছে। তাঁরা মাথায় হেলমেট পরে শটগান দিয়ে গুলি করছেন, এমন বেশ কিছু ভিডিও কিশোর আন্দোলন থেকে শুরু করে মোদিবিরোধী বিক্ষোভের সময়ও দেখা গেছে।

দুর্গ মানসিকতার প্রথম লক্ষণ হলো বেসরকারি অস্ত্রধারী গোষ্ঠী বা বাহিনীর উদয়। শুরুর দিকে এটা চলে ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের মাধ্যমে। পরে আরও বড় আকারে রাজনৈতিক বন্দুকবাজ পোষার প্রচলন ঘটায়। তখনই দেখা যায় যুদ্ধবাজ নেতা বা ওয়ার লর্ডদের আবির্ভাব। আমাদের দেশে অনেক লর্ডের আবির্ভাব হয়েছে সত্য, কিন্তু ওয়ার্ড লর্ড পর্যায়ে আমরা যাইনি। দুর্গ মানসিকতা ও অস্ত্রে ভক্তি না কমলে সেই পথ আরও চওড়া হতে পারে। হরেদরে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করাই শুধু নয়, লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারেও তদন্ত হওয়া দরকার। ব্যক্তিগত বন্দুকবাজির সংস্কৃতি কেবল ভয়ের আবহকেই বাড়াবে। দুর্গ মানসিকতা বিক্ষুব্ধদের মধ্যে পাল্টা সহিংস মানসিকতার জন্ম দিতে পারে। তাই সাধু, বন্দুক সামলান। বন্দুক কার হাতে তুলে দিচ্ছেন, সেটাও ভাবুন। কেননা, অস্ত্রের স্বভাব ভালো না। যখন হাতবদল হয়, তখন তা তার মালিকের সঙ্গেও বেইমানি করে।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন