বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
যেখানে হাজার হাজার চোখ খোলা, সেখানেও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করেই অপরাধী শনাক্ত করতে হয় কেন? মানুষকে কি পাওয়া যাচ্ছে না সাক্ষীসাবুদ হিসেবে? কেন সিসি ক্যামেরাকেই সাক্ষী মানতে হয়? প্রত্যক্ষদর্শীরা কি সাক্ষ্য দিতে বা সাক্ষী হতে রাজি হন না? না হলে কেন হন না? কিসের এত ভয়?

বিশ্বে আরও ৩০টি দেশ আছে কোস্টারিকা আদলের। এর মধ্যে কয়েকটি কোস্টারিকা দ্বারাই অনুপ্রাণিত। এসব দেশের কোনো সশস্ত্র জাতীয় সেনাবাহিনীই নেই। যেমন গ্রিনল্যান্ড, ডমিনিকা, গ্রানাডা, আইসল্যান্ড, কিরিবাতি, মরিশাস, মোনাকো, নাউরু, পানামা, সান ম্যারিনো, টুভ্যালু, সলোমন আইল্যান্ড, ইত্যাদি। দেশগুলো বিশেষ প্রয়োজনে অন্য দেশ থেকে সেনাবাহিনী ভাড়া করে। বিস্ময়ের বিষয়, এই ৩০ দেশও কোস্টারিকার মতোই পৃথিবীর সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ দেশের তালিকার শীর্ষে থাকে সব সময়। ‘তিজা ব্যুনিয়িনি’ দর্শন এসব দেশেও কার্যকর। তাদের কাছ থেকে সামাজিক ব্যবস্থাপনায় অপরাধ দমনের পাঠ নিয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকার ধনী দেশগুলো।

একটি জনপ্রিয় ও কার্যকর অপরাধ দমন পদ্ধতি হিসেবে ‘নেইবারহুড ওয়াচ’ বা ‘পাড়া-মহল্লাভিত্তিক নজরদারি’ ইউরোপ ও আমেরিকায় দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আশির দশকের শেষ দিকে একজন অপরাধবিজ্ঞানী এল এস হুইটমোর সমাজভুক্ত মানুষের অংশগ্রহণে অপরাধ প্রতিরোধে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া অনেকগুলো কেসস্টাডির আলোকে ‘অপরচুনিটি-রিডাকশন অ্যাপ্রোচ’ বা ‘সুবিধা-তিরোহিতকরণ পন্থা’র ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর এই পথনির্দেশের মূল কথা এটিই যে অপরাধ করার সুযোগ-সুবিধাগুলো জারি রেখে শুধু ‘অপরাধীকে ধরো’ পদ্ধতি কখনোই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগবে না। অপরাধীর জন্য জিইয়ে রাখা সুযোগ-সুবিধাগুলো খর্ব করা খুবই দরকার। আর অপরাধের সুযোগ খর্ব করার অন্যতম প্রধান উপায়, জনতার চোখ বা গণনজরদারিতাকে শক্তিশালী করা। সমাজভুক্ত মানুষকে ক্ষমতাবান করা এবং অপরাধীরা কোনো কিছুর প্রশ্রয়ে অপরাধ সংঘটনের সাহস দেখালে, সেই প্রশ্রয়ের মূলোৎপাটন করা। সিসি ক্যামেরা নয়, জনতার চোখকে ব্যবহার করা।

২.

স্বামী-সন্তানসহ কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া নারী গণধর্ষণের শিকার হলেন। খবর পাঠে জানা গেল, সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা গেছে। এই আলোচনা সমাজবৈজ্ঞানিক। তাই আলাপে সরাসরি ঢুকে পড়া প্রয়োজন। যেখানে হাজার হাজার চোখ খোলা, সেখানেও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করেই অপরাধী শনাক্ত করতে হয় কেন? মানুষকে কি পাওয়া যাচ্ছে না সাক্ষীসাবুদ হিসেবে? কেন সিসি ক্যামেরাকেই সাক্ষী মানতে হয়? প্রত্যক্ষদর্শীরা কি সাক্ষ্য দিতে বা সাক্ষী হতে রাজি হন না? না হলে কেন হন না? কিসের এত ভয়? অপরাধীদের ভয়? অপরাধীদের ভয় পাওয়ার কারণ কী এটিই যে তাঁরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান মানুষের লোক? কারণ কি এই যে তাঁদের খুঁটির জোর অনেক শক্ত? ‘অপরচুনিটি-রিডাকশন’ তত্ত্বকে আমলে নিলে তাঁদের কোন সুযোগ-সুবিধা খর্ব করা প্রয়োজন, সেদিকে নজর দেওয়াই জরুরি নয় কি? অপরাধীরা ধরা পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, অপরাধীরা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় থেকে নিজেদের রাজনীতি-পরিচয়ের জোরেই অপরাধ করে থাকেন। এই মাধ্যমে গুজব, সন্দেহ, অনুমানও ছিল যে অপরাধীদের ঠিকই ধরা হবে, তবে খানিকটা সময়ক্ষেপণের পর। তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে নানা মহলের সংযুক্তির কারণে তাঁদের ধরা হলে কেঁচোর বদলে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে। সে জন্য অন্য সংশ্লিষ্টদের নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা হলেই অপরাধীরা ধরা পড়বেন। জনমনে সন্দেহ টিকে থাকার অন্য অর্থ, অপরাধ দমনে তারা সহজে এগিয়ে আসবে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততার সঙ্গে অপরাধীকে ধরতে পারায় ধন্যবাদার্হ। এবার স্থানীয় জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করলে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না।

কক্সবাজার জনাকীর্ণ স্থান। অসংখ্য দর্শনার্থীর বাইরেও বিশালসংখ্যক স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয়রোজগারের মূল উৎস সৈকতগুলো। সেখানে স্থানীয় ব্যক্তিদের সবাই সবাইকে চেনেন, জানেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে তাঁরা কি চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নাম বলেননি? আমাদের জানা না থাকলেও, সিসি ক্যামেরা দ্বারা শনাক্ত করা হলে এই ধারণাই হওয়া স্বাভাবিক যে তাঁরা বলেননি। কক্সবাজারের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘সৈকতের পাশেই বাহারছড়া এলাকা। সেখানে আশিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অন্তত ৩২ জনের একটি গ্রুপ সক্রিয়। তারা সন্ধ্যার পর ফাঁদ পাতে। এভাবেই হয় কারও সর্বস্ব লুট করে নেয়, নারীকে ধর্ষণ করে। এই আশিকুল চার মাস আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তিনি একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। মাদকসহ একাধিক মামলারও আসামি।’

স্থানীয় সাংবাদিকেরা প্রভাবশালী ও সাহসী হন, তদুপরি এই উক্তিকারী জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। তবু তাঁর ভাষ্যটি দিলেন ‘নাম প্রকাশ না করার শর্তে’। পত্রিকায় বিভিন্ন সংবাদের নিচে পাঠক-মন্তব্যের ব্যবস্থা থাকে। লক্ষণীয়, মন্তব্যকারীদের বেশির ভাগই ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ পরিচিতিসহ মন্তব্য লেখেন। কারণ, ভয়। অধ্যাপক গবেষক আলী রীয়াজের মাধ্যমে আমরা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ ধারণাকাঠামো এবং বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত। তারপরও কথা থেকে যায়। মানুষের সামাজিক দায়বোধহীনতা কোন পর্যায় পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে? যেসব স্থানে সিসি ক্যামেরা নেই, সেসব স্থানে অপরাধী শনাক্তকরণের ব্যবস্থা তাহলে আরও দুর্বলতম হয়ে পড়ছে কি না, সে প্রশ্নও তোলা জরুরি নয় কি? মাত্র কয়েক দশক আগেও অপরাধীদের মানুষ ভয় পেত না, ঘৃণা করত। সামাজিকভাবে প্রতিহত করত। ধরিয়ে দিত। এখন তাহলে কিসের এত ভয়? তখন এ রকম ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা সরাসরি বলে দিতেন, ‘চিনি, আশিক তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে নারীটি ও তাঁর স্বামী-সন্তানকে তুলে নিয়ে গেছে। আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

৩.

সিসি ক্যামেরা যান্ত্রিক চোখ। এর চোখগুলো শুধুই দেখে। এগুলোর কোনো বোধ নেই, জিজ্ঞাসা নেই, ভাবনা নেই। মতামত বা পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটলে, বিদ্যুৎ চলে গেলে চোখগুলো অন্ধ। সেগুলোর পক্ষে কতটুকুই-বা নজরদারি সম্ভব? সন্দেহ নেই, প্রযুক্তিটি অপরাধী চিহ্নিত করায় দারুণ সহায়ক। কিন্তু সিসি ক্যামেরানির্ভরতা যেন সমাজিদের সম্মিলিত চোখের শক্তিতে নির্ভরতার চাইতে বড় না হয়ে ওঠে। তা না হলে যেখানে সিসি ক্যামেরা নেই, সেখানে সংঘটিত অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করাই কঠিন হয়ে পড়বে। কক্সবাজারের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় অপরাধ দমনে ঘানার ‘তিজা ব্যুনিয়িনি’ দর্শনের প্রয়োগ দরকার। কমিউনিটি পুলিশিং ছাড়াও ‘নেইবারহুড ওয়াচ’ বিষয়ে সুগভীর ভাবনা এবং পরিকল্পনা শুরু হওয়া দরকার।

হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন