default-image

সীমান্ত নিয়ে বিরোধ প্রায় সারা বিশ্বে রয়েছে। এই মুহূর্তে উত্তেজনা চলছে চীন–ভারতের সীমান্তবিরোধ নতুন করে সহিংস রূপ ধারণ করায়। ১৬ জুন চীন–ভারত সংঘর্ষে গোলাগুলি বিনিময় ছাড়াই ২০ জন ভারতীয় নিহত হয়, বেশ কিছু চীনা সৈন্যও হতাহত হয় বলে ভারত দাবি করে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ চলছে নেপালেরও। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধের মূল কারণ এ অঞ্চলে ব্রিটিশদের কলোনিয়াল শাসন ও তাদের কর্তৃক একতরফা সীমানা নির্ধারণ। আবার কিছু ক্ষেত্রে সীমানা নির্ধারণ দ্বিপক্ষীয়ভাবে হলেও তা মানতে চায় না সম্প্রসারিত বা সংকুচিত নতুন রাষ্ট্র। ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্তবিরোধের একটি বড় কারণ এটি।

ভারতের উত্তর-পুব অঞ্চলের সঙ্গে চীনের তিব্বত অঞ্চলের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে কমপক্ষে তিনবার। প্রথমবার ১৮৬৫ সালে জনসন (ব্রিটিশ ভারতের একজন অফিসার) লাইন বা সীমান্তরেখার মাধ্যমে এটি করা হয় একতরফাভাবে। দ্বিতীয়বার ১৮৯৯ সালে ম্যাকার্টনি-ম্যাকডোনাল্ড লাইন অনুসারে সীমানাবর্তী এলাকা লাদাখের আকসাই চীন অঞ্চলের বৃহত্তর অংশ চীনের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়। তৎকালীন চীনা রাজার কাছে এটি পাঠানো হলেও চীন এ নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তৃতীয়বার ১৯১৪ সালে ম্যাকমোহন লাইনের মাধ্যমে এটি করা হয় তিব্বতের (তিব্বত ১৯১৩ সালে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করে) সঙ্গে ব্রিটিশ-ভারত সরকারের আলোচনাক্রমে। তিব্বত সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল না এ অজুহাতে চীন এটি মেনে নিতে চায়নি। ১৯৫১ সালে চীন তিব্বতের অধিকাংশ অঞ্চল পুরোপুরি দখল করে নেয়।

আকসাই চীনসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে চীন আর ভারতের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি হয় ১৯৬২ সালে। যুদ্ধের আগে ১৯৫০–এর দশকে দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সে সময় ভারতের সম্পূর্ণ অগোচরে কারাকোরাম পর্বতের অন্য পাশে চীন ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের একটি রাস্তা জিনজিয়াং থেকে পশ্চিম তিব্বত পর্যন্ত নির্মাণ করলে এবং ১৯৫৮ সালের মানচিত্রে তা দেখালে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা ঘটে। রাস্তাটির কিছু অংশ আকসাই চীন অঞ্চলে যা জনসন ও ম্যাকমোহন লাইন অনুসারে ভারত তাদের নিজেদের বলে দাবি করে থাকে। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়, চীন আকসাই চীন ও অরুণাচল প্রদেশ দখল করে নিলেও একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অরুণাচল থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয়।

আকসাই চীন রয়ে যায় চীনের জিনজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের অংশ হিসেবে। আকসাই চীন আর লাদাখের মধ্যবর্তী গালওয়ান ভ্যালির ঠিক পাশে রয়েছে দুই দেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা। প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের এ নিয়ন্ত্রণরেখাকে ১৯৫৯ সালে চীন ডি ফ্যাকটো সীমান্তরেখা হিসেবে ঘোষণা করে। তবে এটি সুস্পষ্টভাবে দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এলাকাটির নদী, লেক হিমবাহসহ বিভিন্ন টপোগ্রাফিক্যাল পরিবর্তন এবং পর্বতসংকুল অঞ্চলে জরিপ ও সীমানা নির্ধারণে প্রতিকূলতা। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা আশপাশে গত এক দশকে দেশ দুটো কর্তৃক ব্যাপকভাবে রাস্তা, সেতু, রেল লিংক ও এয়ার ফিল্ড নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। গত বছর লাদাখে কেন্দ্রশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত করার পর ভারত তার সামরিক ঘাঁটির সঙ্গে সংযুক্ত করে নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর একটি রাস্তা লাদাখে নির্মাণ করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে।

গালওয়ান রিভার ভ্যালি লাদাখে হলেও নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন একটি এলাকা। ভারতের অভিযোগ, চীন একতরফাভাবে এ ভ্যালিতে সৈন্য প্রবেশ করিয়ে তার বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে এবং এখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করছে। তাদের বাধা দিতে গিয়ে মূলত ১৬ জুন সংঘর্ষটির সূচনা। সংঘর্ষের পর চীন ও ভারত আপাতত শান্ত রয়েছে। তবে ভারতে চীনা পণ্য বর্জনের ডাক এসেছে, সেখানে চীনের বিশেষ করে টেলিকম খাতে বিনিয়োগে কিছুটা অনিশ্চয়তাও তৈরি হতে পারে এতে। এর পাশাপাশি ১৬ জুনের সংঘর্ষে আসলে বেশি চীনা সৈন্য মারা গেছে, এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করতে দেখা যেতে পারে ভারত সরকারকে।

অন্যদিকে গালওয়ান ভ্যালিতে ঢুকে পড়ে স্থিতাবস্থা বজায় রেখে চীন সন্তুষ্ট থাকতে পারে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ আরও সম্প্রসারিত করে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে আকসাই চীন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর এবং নেপালকে ভারতের হুমকিমুক্ত রাখার জন্য চীন একে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

২.

ভারত-চীন সংঘর্ষের অভিঘাত অবশ্য এখানে থেমে থাকবে না। ভবিষ্যতে নেপাল আর পাকিস্তানকে দিয়ে প্রক্সি ওয়ার চালাবে চীন। ভারত-নেপাল দুই দেশের মধ্যে ৯৮ শতাংশ সীমানা নির্ধারণ হয়ে গেলেও ক্ষুদ্র একটি এলাকা এখনো বিরোধপূর্ণ রয়েছে। সেখানকার লেপুলেখ পাস, কালাপানি ও লিমপিয়াধুরা স্থান তিনটিকে ভারত গত নভেম্বরে তার নতুন মানচিত্রে নিজেদের এলাকা হিসেবে দেখায়। এর মধ্যে লেপুলেখ পাস ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের সঙ্গে তিব্বতকে সংযুক্ত করেছে বলে এর অপরিসীম কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। কয়েক মাস আগে ভারত উত্তরাখন্ড থেকে লেপুলেখ পাস পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ করে। কাশ্মীরকে ভাগ করার পর ভারতের এসব ব্যবস্থা নেপাল ও চীনকে সন্দিগ্ধ করে তোলে।

স্পষ্টত চীনের সমর্থনের সাহসে নেপাল নিজেও উপরিউক্ত তিনটি স্থানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে এবং এ মাসে তা আইনসভায় পাস করিয়ে নেয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন যে ১৯১৬ সালে সুগালি চুক্তি অনুসারে নেপালের পশ্চিম সীমান্তের এই তিন স্থান নেপালের। চুক্তিতে কালী নদীর উৎসমুখকে ভারত-নেপালের সীমানা হিসেবে দেখানো হলেও উৎসমুখটি ঠিক আসলে কোথায়, এ নিয়ে দুই দেশের বিরোধ রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে, বিশেষ করে কাশ্মীর সীমান্ত নিয়ে বিরোধ রয়েছে পাকিস্তানের। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিনি ভারতীয় কাশ্মীর বলতে আকসাই চীন এবং পাকিস্তান অধিকৃত অঞ্চলকেও বোঝান। অরুণাচল প্রদেশের বিজেপি থেকে নির্বাচিত সংসদ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীরের দুটো অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করছেন।

আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে ভারতের আশপাশে মিত্র না থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে তার বড় মিত্রদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র। ভবিষ্যতে সামরিক সংঘর্ষ হলে ভারত ইসরায়েল থেকেও প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা পেতে পারে।

৩.

দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো সামরিক সংঘর্ষের আশঙ্কা অবশ্য কম। প্রচলিত যুদ্ধে ভারতের জয়ের ঘটনা খুব একটা নেই। সামরিক শক্তিতেও ভারত চীন থেকে পিছিয়ে। ভারতের বরং লক্ষ্য থাকবে অসামরিকভাবে চীনকে চাপে রাখা। করোনা–পরবর্তী বিশ্বে চীন সত্যি কোণঠাসা হলে, চীন থেকে বিপুল বিনিয়োগ অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হলে, ভারত হিসাব কষবে চীনের পণ্য ও বিনিয়োগের ওপর কতটা কঠিন শর্ত আরোপ করা যায়। কিংবা ব্রিকস ব্লক, এশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা সাংহাই করপোরেশনের মধ্যে সহায়তা কাঠামোতে কতটা শক্তভাবে থাকবে ভারত। চীন-ভারত সংঘর্ষ কোনো দাবানল সৃষ্টি করবে না। তবে এর আগুন ধিকিধিকি জ্বলবে নানা জায়গায়, বহুদিন ধরে।

আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন