বিজ্ঞাপন

দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনীতি ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা যাদের, তাদের নাগরিকেরাই করোনায় ভুগেছেন সবচেয়ে বেশি। ইতালির মৃত্যুর মিছিল কমে এলেও যুক্তরাষ্ট্রে তা এখনো মর্মান্তিকভাবে চলমান। বলা হয়, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জইর বোলসেনারো যে সত্যিকার মানবিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ, বিভিন্ন জরিপ ও পরিসংখ্যান তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু আমেরিকা এই ব্যর্থতা স্বীকারে রাজি নয়। গত শনিবারে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যখন একযোগে বলেছে, জাতিসংঘের ৭৫ বছরের ইতিহাসে বিশ্বে এমন সংকট খুব কমই দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজ, অর্থনীতি, বাণিজ্য—সবই করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। এই মহামারি প্রতিরোধ ও এর ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সংহতি ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছে বলেও তারা আহ্বান জানিয়েছে। সবাই একমত হলেও এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে দুটি পরমাণু ক্ষমতাধর রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এদেরই অনুসারী হাঙ্গেরি ও ইউক্রেন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। আগামী মঙ্গলবার থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৫তম অধিবেশন শুরু হবে। ওই অধিবেশনে এ প্রস্তাব পাস হওয়ার কথা রয়েছে।

শিল্পীর ছবিতে সুপারহিরোরা সংকটে তাদের ব্যর্থতা স্বীকার করে চিকিৎসকসমাজকেই প্রকৃত বীর হিসেবে স্বীকার করে নিলেও বাস্তবের দুনিয়ার সুপার-স্টেটের সুপারহিরো ইমেজ উপভোগ করা নেতারা উটপাখি সাজাই আরামদায়ক বলে মনে করেছেন। উটপাখি বালুতে মুখ ঢেকে ঝড় থেকে লুকাতে চায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প মুখ লুকিয়েছেন টেলিভিশনে। নিয়মিতভাবে টেলিভিশনের ক্যমেরার সামনে হাজির হয়ে তিনি চীনকেই যত নষ্টের গোড়া বলে দায় সেরেছেন।

আরও আশ্চর্য যে এহেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম নোবেল কমিটির বিশ্বশান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকাতেও এসেছে। তাঁর সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন হাঙ্গেরির ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট। সুপার-স্টেটের সুপারহিরো নেতারা, জোনাথন সুইফটের বিখ্যাত উপন্যাসের নায়ক গালিভারের মতো অতিকায় ভাবমূর্তির পূজারিরা করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে না দাঁড়ালেও লিলিপুটিয়ান রাষ্ট্র কিউবার ডাক্তাররা তৈরি করেছেন আশাবাদী এক দৃষ্টান্ত। বিশ্বের বেশ কিছু মানবতাবাদী সংস্থা প্রস্তাব করেছে, করোনা মোকাবিলায় ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কিছু দেশে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক বাহিনী পাঠিয়ে অজস্র মানুষের জীবন বাঁচানো কিউবান ডাক্তারদের দলকেই এই পুরস্কার দেওয়া হোক।

বণিক সভ্যতা গাছ দেখে না কাঠ দেখে, জমি দেখে না ভূমি দেখে, মানুষ দেখে না ক্রেতা দেখে, সমাজ দেখে না স্বার্থ খোঁজা সমিতি দেখে। সোসাইটি মানেই তার কাছে কনজিউমার সোসাইটি। কিন্তু বীরের পয়দা হতে সত্যিকার মানুষের সত্যিকার সমাজের প্রয়োজন হয়। বড় আকাঙ্ক্ষা সমাজের মনে দানা না বাঁধলে বড় নেতাও আসেন না, এলেও পাত্তা পান না—লোকে সেই অসময়ের বীরদের পাগলও বলে। আমাদের জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো মানুষ, যাঁর প্রতিদিন ডায়ালাইসিস করাতে হয়, তিনি অনেক অসাধ্যসাধনের উদ্যোগ নিয়েও দুর্বল সামাজিক সমর্থনের কারণে রাষ্ট্রীয় বাধা জয় করতে পারছেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, জগতে যোগ্য লোক রয়েছে, কিন্তু তাদের বরণ করার মতো যোগ্য মঞ্চের বড় অভাব। নোবেল পুরস্কারের মঞ্চে যোগ্যরাই পুরস্কৃত হন, তা বলা যাবে না। কিন্তু জনতার হৃদয়ে স্থান পেয়েছে কিউবা, স্থান পেয়েছেন যার যার দেশের নিষ্ঠাবান সাহসী চিকিৎসকেরা। এই লড়াইয়ের বীরও তাঁরা, শহীদও তাঁরা। তাঁদের মধ্যে এগিয়ে কিউবার চিকিৎসকেরা।

করোনাভাইরাসের বিপদ কাটতে অনেক দেরি। এই বিপদ গেলেও আরও অনেক বিপদ আসবে, মহামারি আর পুঁজিবাদ দুজনে দুজনার হয়ে এই গ্রহের জীবজগতের আরও বিনাশ ঘটাবে। এমনকি বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত টিকা নিয়ে চলবে ভূরাজনীতি, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা আর টিকার বিনিময়ে স্বার্থ হাসিলের খেলা। এই পরিস্থিতির মুখে নতুন ধরনের বীর আমাদের প্রয়োজন। হলিউড সিনেমার সুপারহিরোদের মতো তারা আকাশে উড়বেন না, তাঁরা মাটির মানুষের সঙ্গে তাঁদের জীবনের ভরসা হবেন। মানবিক ও চৌকস বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ, মানবিক অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তো লাগবেই, সবার আগে লাগবে মানবিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। কিন্তু এত সব আয়োজন তখনই সফল হয়, যখন জনগণ নিজের স্বার্থেই মানবিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসে, যখন জনগণ কাল্পনিক ভাবমূর্তির সুপারহিরোদের জায়গায় সমাধান জানা নেতা ও বিশেষজ্ঞের জন্য সত্যিকারভাবেই তৃষ্ণার্ত হয়। মহাকাব্যে, হলিউডের সিনেমায় এবং বাস্তবেও; মার খাওয়া মানুষই ঘুরে দাঁড়িয়ে বীর হয়ে ওঠে। করোনা ভাইরাসের মার, মানুষকে অসহায় বানানোর রাজনীতির মার খাওয়ারা কি নিজেদের ভেতর আগামীর বীরের ধুকপুকানি টের পান?

* ফারুক ওয়াসিফ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ও লেখক।

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন