বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ রকম নাজুক বাস্তবতার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশের পরিবহনমালিকেরা মানুষকে জিম্মি করে ধর্মঘট ডেকে এবং সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি করে বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছেন। জ্বালানির দাম বাড়ানোকে তাঁরা পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর একটা সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন। তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়লেও ডিজেল ব্যবহারের অনুপাতে বাসভাড়া ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে নিয়েছেন। বাড়তি এ ভাড়ার প্রভাব এর মধ্যেই পড়েছে বাসযাত্রায়। প্রতিটি বাসেই এখন পরিবহনশ্রমিকদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

অবশ্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহনভাড়া বাড়লে পরিবহনশ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বচসা এর আগেও হয়েছে। কিন্তু এবার এর মাত্রা অনেক গুণ বেশি। পরিবহনশ্রমিকদের হাতে যাত্রীরা যেমন লাঞ্ছিত হচ্ছেন, আবার যাত্রীদের হাতে শ্রমিকেরাও লাঞ্ছিত হচ্ছেন। জনগণের দুই অংশকে এখানে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের তো কোনো দায় নেই। এ দায় সরকার ও পরিবহনমালিকদের। বাড়তি ভাড়াকে কেন্দ্র করে জনগণের বিভিন্ন অংশের যে অসন্তোষ, শিক্ষার্থী ও শ্রমিক দুই অংশের মধ্যে তা সংগঠিত রূপেও প্রকাশ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছেন ‘হাফ পাস’-এ তাঁরা গণপরিবহনে চলাচলের সুযোগ চান। এ দাবিতে আন্দোলন করতে নেমে ছাত্রলীগের হামলার শিকারও হয়েছেন তাঁরা। আবার পরিবহনশ্রমিকদের একটা অংশ উদ্ভূত বাস্তবতায় ‘ওয়ে বিল’ ব্যবস্থা বাতিল চেয়ে আন্দোলনও করেছেন।

করোনার দেড় বছরের ক্ষতি কাটিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে, সাধারণ মানুষ যখন নানাভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এক ধাপে এ মূল্যবৃদ্ধি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে। এই আতঙ্কের প্রভাব পড়ছে সামাজিক আচরণে। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। কিন্তু উন্নয়নের এই খড়্গ কেন জনগণের ওপর তখনই নেমে এল, যখন তাদের বৃহত্তর অংশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।

করোনার দেড় বছরের ক্ষতি কাটিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে, সাধারণ মানুষ যখন নানাভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এক ধাপে এ মূল্যবৃদ্ধি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে। এই আতঙ্কের প্রভাব পড়ছে সামাজিক আচরণে। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। কিন্তু উন্নয়নের এই খড়্গ কেন জনগণের ওপর তখনই নেমে এল, যখন তাদের বৃহত্তর অংশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। করোনাকালেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ইতিবাচক। মাথাপিছু আয়ও অনেক বেড়েছে। অতিধনীর সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। কিন্তু দরিদ্রের সংখ্যাও যে বহুগুণ বেড়েছে। ‘শনৈঃশনৈঃ করে আমাদের সম্পদ বাড়ছে, রাত পোহালেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি’—পরিকল্পনামন্ত্রীর এ বক্তব্য সমাজের একটা অংশের জন্য তো সত্যই। সরকারের যে অর্থনৈতিক নীতি, সেখানে সম্পদ কিছু মানুষের হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক, সম্পদ বানানোর এ সুযোগে একটা অংশই যখন সুবিধা পাচ্ছে, তখন জ্বালানির মতো কৌশলগত পণ্যে সাধারণ মানুষ কেন সমান বোঝা বহন করবে?

করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশ্বের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক তেল উৎপাদন সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। গত সপ্তাহে জো বাইডেন ও সি চিন পিং ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে আমেরিকা ও চীন তাদের মজুত তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও কমবে। ফলে সরকার অস্থির হয়ে দাম না বাড়িয়ে আরও কিছুদিন সহজেই পর্যবেক্ষণ করতে পারত। সারা বিশ্বই এখন একটা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে। ফলে শুধু তেল নয়, কাঁচামালের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে আমদানির ওপর নির্ভরশীল অনেক পণ্যের দাম বাড়ছে, সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রায় আরও চাপ পড়বে। এ চাপ কতটা প্রশমন করা যাবে, সেটাই সরকারের নীতি হওয়া দরকার।

করোনা মহামারি অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে বিশ্বের অর্থনৈতিক নীতিতেও বদল আনছে। ধনী দেশগুলোই মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপর এখন পুরোপুরি নিজেদের সঁপে দিতে পারছে না। মুক্তবাজার অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরতে নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনীতিকেও সমন্বয় করে নিচ্ছে। কম গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে অর্থ এনে স্বাস্থ্য খাতসহ নানা জনকল্যাণে তারা ব্যয় বাড়িয়েছে। সর্বশেষ বাইডেন ও সি চিন পিং বৈঠকে তেলের দাম কমানোর যে পদক্ষেপ, সেটাও কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির ছক থেকে বেরিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য আরও সুযোগ রয়েছে জনকল্যাণে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার। সে ক্ষেত্রে উন্নয়নকে কেন বিন্ধ্য পর্বতের মতো জনস্বার্থের সামনে বাধা হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে?

শুধু তেলের মূল্যবৃদ্ধি নয়, আরও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জনস্বার্থের উল্টো চিত্র দেখছি। ১৫ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু ও মুক্তারপুর সেতুতে টোল হার বাড়ানো হয়েছে। সেতু কি ডিজেলে চলে, নাকি বিশ্ববাজারের ওপর এর পরিচালন ব্যয় নির্ভরশীল যে এখন টোল হার বাড়াতেই হলো? বঙ্গবন্ধু সেতুর যে নির্মাণ ব্যয়, সেটা নির্ধারিত বছরের আগেই উঠে এসেছে। ১৮০ শতাংশ নির্মাণ ব্যয় উঠে আসার পরও কেন এমন এক সময়ে টোল হার বাড়ানো হলো, যখন অযৌক্তিক হারে পরিবহনভাড়া বাড়ানো নিয়ে জনহতাশা চরমে পৌঁছেছে। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতে টোল হার বাড়ানো হয়েছে। সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৩,৭৪৫ দশমিক ৬০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত টোল আদায় হয়েছে ৬,৭৪০ কোটি টাকা। যানবাহনভেদে টোল বেড়েছে ১০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। টোল হার বাড়ানোর ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যাতায়াত ব্যয় বাড়বে।

উত্তরবঙ্গ সবজিসহ নানা কৃষিপণ্যের ভান্ডার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব পণ্যের জোগান যায় উত্তরবঙ্গ থেকে। ডিজেল, পরিবহনভাড়ার পর বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল—সব মিলিয়ে কৃষিপণ্যের দামে তো বড় প্রভাব পড়বেই। টোল হার বাড়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন পরিবহনচালক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, ‘পরিবহনশ্রমিকেরা বলছেন, মাত্র কদিন আগে ডিজেলের দাম বাড়ানো হলো। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবার সেতুতে বাড়তি টোল দিতে হচ্ছে। সেবার মান তো বাড়েনি। তাহলে কেন এই টোল বাড়ানো হলো? নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই সেতু পারাপারে টোল বাড়ানোয় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়বে। এতে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে।’ (বঙ্গবন্ধু সেতুতে বাড়তি টোল আদায় শুরু, পরিবহনচালক ও নাগরিকদের অসন্তোষ; ১৯ নভেম্বর ২০২১)

বঙ্গবন্ধু সেতুতে টোল সর্বশেষ বেড়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু তেলের দাম, নিত্যপণ্যের দাম, জীবযাত্রার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে জনজীবনে যখন নাভিশ্বাস উঠছে, সে সময়টাতেই কেন টোল বাড়াতে হলো?

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন