default-image

মৃত্যু অবধারিত। এটি সবাই মানলেও আমরা মৃত্যুর জন্য সামগ্রিকভাবে প্রস্তুত থাকি না। আচরণে মৃত্যুকে গ্রহণে আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা প্রতিফলিত হয়। সৈয়দ শামসুল হক মৃত্যুকে গ্রহণ করার জন্য বেশ প্রফুল্ল চিত্তেই প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। যা সৈয়দ শামসুল হক স্মারকগ্রন্থ ‘ফুলের গন্ধের মতো রয়ে যাব’-তে ‘জলেশ্বরীর ভূমিপুত্র’ শিরোনামের লেখায় তার বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

সৈয়দ শামসুল হক নিজের সমাধিস্থান নিজে নির্বাচন করে গেছেন। কবরের এপিটাফও লিখে গেছেন নিজেই। তিনি সমাধিসৌধের ডিজাইন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও স্থপতি কবি রবিউল হুসাইনকে। তিনি বেঁচে থাকতে তাঁকে সমাধিস্থানটি দেখাতে সঙ্গে আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তাঁর মৃত্যুর পর রবিউল হুসাইন কুড়িগ্রামে একাধিকবার সমাধিসৌধের নকশা প্রণয়নের জন্য এসেছিলেন। তাঁর সমাধিস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক শিক্ষাসচিব সোহরাব হোসেন ও সংস্কৃতিসচিব ইব্রাহিম খান। এসেছিলেন কবি তারিক সুজাত।

শুনেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি খসড়া প্রকল্প তৈরি করেছে, যার মধ্যে জলেশ্বরী কমপ্লেক্স ও সমাধিসৌধ পাশাপাশি রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে একটি মিলনায়তন, গবেষণাকেন্দ্র, পাঠাগার, অফিস, মুক্তমঞ্চসহ বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। প্রকল্পটি যাতে দ্রুত হয়, সে জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল নকশা প্রণয়ন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে জমি হস্তান্তর করা। জমির জটিলতা যাতে না হয়, সে জন্য সেই সময় শিক্ষাসচিব ও সংস্কৃতিসচিব মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে এসেছিলেন। তাঁরা সম্মতিও দিয়ে গেছেন। কুড়িগ্রামের নাগরিকেরা এবং কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের অনাপত্তি দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

রবিউল হুসাইন মৃত্যুর আগে নকশা জমা করেছেন। নকশা নিয়ে বেশ কয়েকবার সভাও হয়েছিল। নকশা সংশোধনের কথাও হয়েছিল। আমি রবিউল হুসাইন ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছিলাম, তিনি সংশোধনও করে দিয়েছিলেন। এরপর আর অগ্রগতি দেখি না। এ বিষয়ে সাবেক জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান, খান মো. নূরল আমিন, সুলতানা পারভিন ও বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম নিজ নিজ দায়িত্বকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁরা লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু অবস্থার কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। না প্রকল্পের অগ্রগতি, না সমাধির উন্নয়ন।

২০১৬ সালে সেপ্টেম্বরের ঘোর বর্ষায় সৈয়দ শামসুল হক সমাধি নিয়েছিলেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে। সে সময়ে কলেজের কখানা ভাঙাচোরা টিন দিয়ে কবরের ওপর নামমাত্র একটি ছাদ দেওয়া হয়েছিল, যাতে কবরটি ভেঙে না যায়। সেদিন কোমরজলের মধ্যে কাঠের বাক্স তৈরি করে চারদিকে বালুর স্তূপ করে দিয়ে কবর তৈরি করা হয়েছিল। এ জন্য সে সময়ের পৌর মেয়র আব্দুল জলিলের বিশেষ অবদান ছিল। শহরের ২০ থেকে ২৫টি ট্রাক্টর দিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেল থেকে শুরু করে ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরের পরও বালু এনে সমাধিটি তিনি প্রস্তুত করতে সহযোগিতা করেছিলেন। ওই ব্যয় কুড়িগ্রাম পৌরসভার মেয়র বহন করেছিলেন। এখনো সেই ভাঙা টিনের চালই কবরের ওপর রয়েছে। এখন যদি ওই টিন কোনো কারণে সরানো হয় বা ঝড়–বাদলায় উড়ে যায়, তাহলে বৃষ্টির জলে বালু–মাটির কারণে কবরটি যেকোনো সময়ে ভেঙে দেবে যাবে।

জানি না আজকে জলেশ্বরী কমপ্লেক্সের কত দূর এগোল। কোন সুতোর ফাইলে এটি বন্দী আছে। এরই মধ্যে কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন এ প্রকল্প কবে বাস্তবের মুখ দেখবে জানি না। কুড়িগ্রাম কলেজের উপাধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দিন সংগত কারণে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, ‘সৈয়দ শামসুল হকের সমাধি কমপ্লেক্সের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে বিবেচনাধীন থাকায় আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে যে সমাধিটির উন্নয়ন করব, সে সুযোগও কম।’ তিনি এ বিষয়ে মনঃকষ্ট নিয়ে একটি বেদনাভরা পোস্ট দিয়েছিলেন তাঁর ফেসবুক পাতায়।

এই জেলায় যাঁরা আসেন, তাঁদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি সৈয়দ শামসুল হকের সমাধিটি দেখতে যান বেশ আগ্রহভরে। কিন্তু যখন গিয়ে দেখেন তাঁর সমাধি অমর্যাদাকর অবস্থায় পড়ে আছে, তখন তাঁরা অবাক হন, আহত হন এবং মনঃকষ্ট নিয়ে ফিরে যান। বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এ সাহিত্যিক শুধু কুড়িগ্রামের মানুষেরই অহংকারের নন, তিনি সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর জন্য গৌরবের। তাঁর সমাধির এ চিত্র দর্শনার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে কুড়িগ্রামের মানুষকে বেশি করে আহত করে।

গত ২৭ ডিসেম্বর সৈয়দ শামসুল হকের পত্নী আনোয়ারা সৈয়দ হক (যিনি নিজেও এ দেশের খ্যাতিমান মানুষ, যাঁর বয়সও আজ ৮০ বছরের ওপরে) প্রয়াত সব্যসাচীর লেখা নিজ কবরের জন্য প্রণীত এপিটাফটি আমাকে পাঠানোর সময় কষ্ট নিয়ে বলেছেন, ‘লিংকন, আমারও যাবার পালা হলো, বেঁচে থাকতে থাকতে যদি সমাধিসৌধ ও জলেশ্বরী কমপ্লেক্সটির পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন দেখতে পেতাম, তা হতো আমার জন্য আনন্দের। মরে গেলে ওপারে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে যদি দেখা হয়, তাঁকে বলতে পারতাম, এ দেশের মানুষ এখনো তাঁকে ভালোবাসে।’ তিনি বললেন, রাষ্ট্র তার মালিকানাধীন জমিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই সমাধি করেছে। এই কবর এখন একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে পারিবারিকভাবে সমাধির উন্নয়ন করার সুযোগ নেই। নৈতিকভাবে তাঁদের পরিবার সেটি করতে পারলেও বিষয়টি তো বিধিসম্মত নয়।

আনোয়ারা সৈয়দ হক যথার্থ বলেছেন, এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমার কষ্ট লাগে তখন, যখন কেউ বলেন, ‘এত লড়াই–সংগ্রাম করে কবির কবরটি যখন কুড়িগ্রামে দিলেন, সে কবরের এ দীনহীন অবস্থা কেন?’ সত্যিই তো, আমরা কুড়িগ্রামের সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, অনেক রাজনীতিকই চেয়েছিলাম কুড়িগ্রামেই কবির সমাধি হোক। আমাদের এ চাওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সায় ও সমর্থন ছিল বলেই আমাদের বাদশাহ কুড়িগ্রামে মাটির ঘরে ঠাঁই নিয়েছেন।

কেন সৈয়দ হকের সমাধি কমপ্লেক্সের কাজ এগোচ্ছে না, সেটি একটু তলিয়ে দেখতে অনুরোধ করি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে। অবহেলিত সমাধির জন্য সৈয়দ শামসুল হকের কিছুই যায়–আসে না। তিনি আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু এটি আমাদের অবহেলা, আমাদের দীনতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে।

এস এম আব্রাহাম লিংকন উত্তর জনপদের সংস্কৃতিকর্মী ও বিশিষ্ট নাগরিক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন