বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভর্তি নিয়ে জটিলতার শুরু হয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের (মাউশি) ভর্তির বয়স পুনর্নির্ধারণী পরিপত্র জারির মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী প্রথম শ্রেণি হতে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের বেশি। কিন্তু মাউশি বলে, ষষ্ঠ শ্রেণির দরজা তার জন্যই খোলা থাকবে, যে ১১ বছর পার করেছে। ১০ বছরের বেশি আর ১১ বছর পার করা এক কথা নয়। দৈনিক ইত্তেফাক-এর এক প্রতিবেদনে (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০) আমরা দেখতে পাই, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা: ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১০। সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত। জেএসসি পরীক্ষা: ১৪ ন্যূনতম বয়স হতে হবে। সর্বনিম্ন ১৪ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত। এসএসসি পরীক্ষা: ১৬ ন্যূনতম বয়স হতে হবে। সর্বনিম্ন ১৬ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, বয়স সীমাবদ্ধ থাকলে রেজিস্ট্রেশন করবেন। পরীক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে তারা দায়ী থাকবে না।

এর আগে বয়সের এ হিসাব ছিল আরও জটিল। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করার বয়স ছয় বছর নির্ধারণ করা হলেও এসএসসির ন্যূনতম বয়স ধরা হয়েছিল ১৪ বছর। এসব গরমিলের ছেদ টানার জন্য জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকা সাবেক অতিরিক্ত সচিব আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করেছেন দিনের পর দিন। তাঁকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি দুঃখের সঙ্গে জানান, ‘আমরা আসলে কেউই অঙ্ক কষি না। অঙ্ক না কষেই সংখ্যা বসিয়ে সারিয়ে ফেলতে চাই। আর দোষ চাপাই শিশুদের ঘাড়ে।’ ছয় বছর বয়সে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হলে একজন শিক্ষার্থী যেকোনো অবস্থাতেই ১৪ বছর বয়সে এসএসসি দেওয়ার জন্য উপযুক্ত হতে পারে না। কিন্তু মাউশিকে সেটা বোঝাতে দুই দশক লেগে গেছে জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের।

বর্তমান জটিলতা শুরু হয় ২০১৭ সালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপন জারির পর, যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির বয়সসীমা ১১ বছরের ঊর্ধ্বে নির্ধারণ করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনের পর অনেক শিক্ষার্থী পরের শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করতে পারছিল না। কারণ, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য বয়স হতে হবে ছয় বছরের বেশি। এ হিসাবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির বয়স হতে হবে ১১ বছরের বেশি। সে বছর ডিসেম্বরে সরকারি স্কুলে ভর্তি নিয়ে এক মহাসংকটের সৃষ্টি হয়। ১০ বছরের বেশি, কিন্তু ১১ বছরের কম বয়সী শিশুরা পিইসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তারা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদনই করতে পারছিল না। শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উত্কণ্ঠায় অভিভাবকেরা নানা জায়গায় ধরনা দিতে থাকেন। সন্তানদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে বয়সের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার দাবি জানাতে থাকেন তাঁরা। কেউ কেউ হয়তো নতুন জন্মনিবন্ধন করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সন্তানদের একটা বছর নষ্টের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

তবে সাহস করে মুন্সিগঞ্জের জনৈক মিজানুর রহমান আদালতের কড়া নাড়েন। তাঁর সন্তানের জন্ম ২০১১ সালের ৩০ জুলাই। সেই হিসাবে ওই শিক্ষার্থীর বয়স ২০২০ সালে হয় সাড়ে ৯ বছর। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের কারণে অনলাইনের সফটওয়্যারে ওই শিক্ষার্থীর আবেদন নাকচ হয়ে যায়। ফলে তার ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মিজানুর রহমান ২০১৭ সালের জারি করা ভর্তির নীতিমালা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া ২০১৭ সালের নীতিমালাটি গত বছর স্থগিত করেন আদালত। ফলে ১১ বছরের কম বয়সের শিক্ষার্থীরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করার বাধাটা আর থাকে না।

এ বছর আবার কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। পাবনার ভাঙ্গুড়ায় লটারি স্থগিতের খবর শুনে মনে হয়েছিল, এবার একটা সমাধানের পথ খুলছে। কিন্তু সেখানকার ইউএনও সংবাদমাধ্যমকে জানালেন, ১১ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে তাদের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করতে বলা হয়েছে। সেই জন্য লটারি বন্ধ রাখা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মাউশি ও স্থানীয় সরকারের পরিপত্র তাঁর হাত-পা বেঁধে রেখেছে।

এদিকে জামালপুরে কয়েক অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, লটারিতে ভর্তির জন্য আবেদনের সময় কোনো ধরনের বয়সসীমার কথা উল্লেখ ছিল না। অথচ লটারিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এক মাস বা কয়েক দিন কম থাকার কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ ভর্তি নিচ্ছে না। অনেক শিক্ষার্থী আগের স্কুল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে চলে এসেছে। এখন যদি ভর্তি করা না হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবে। এ ধরনের কোনো নীতিমালা যদি থাকত, তাহলে আবেদনের সময়ই তাদের বাতিল করে দিত। তাহলে তো কোনো সমস্যা হতো না। এখন সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, ভর্তির সময় বয়সসংক্রান্ত জটিলতার কথা বলে ভর্তি নিচ্ছে না। নিরুপায় শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় কমিশনারের যাওয়ার রাস্তায় শুয়ে পড়ে। পরে বিভাগীয় কমিশনার বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা পথ ছেড়ে দেয়। সর্বশেষ আমরা জানতে পারছি, মাউশির হস্তক্ষেপে জামালপুরের সমস্যার সমাধান ঘটেছে।

তবে এটা শুধু পাবনা বা জামালপুরে নয়, সারা দেশের সমস্যা। হাজার হাজার শিক্ষার্থী আছে, যারা পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেছে ১০ বছরের বেশি বয়স, কিন্তু ১১ হতে কারও ১-৩ মাস বা ১৫ দিন বাকি। ১-২ মাস কিংবা ১৫ দিনের জন্য কেন তাঁদের ১ বছর অপেক্ষা করতে হবে? কেন তাদের রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে?

আশার কথা শিশুরা শুয়ে পড়ায় মাউশি জেগে উঠেছে । তাদের ঘুমটা আগে ভাঙ্গলে এতো জল ঘোলা হতো না । মাউশি পরিচালক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন , ‘গত বছর ভর্তির সময় বয়স নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে আদালতের নির্দেশে- তা সংশোধন করা হয়েছিল। এখন স্কুলে ভর্তির বয়সের বিষয়ে আবার সংশোধনী দেওয়া হয়েছে। শুধু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে বয়স ৬ বছর হতে হবে। আর কোনো শ্রেণিতে ভর্তি হতে বয়স বাধা হবে না। যে সব স্কুলে বয়স নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তাদের প্রধান শিক্ষকরা হয়ত সংশোধিত নীতিমালা লক্ষ্য করেন নাই।’

রাষ্ট্রের শিক্ষাবান্ধব নীতি মেধা সৃজন নীতি আরো প্রসারিত হোক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালাগুলি ওয়েবসাইটে পাশাপাশি অন্যান্য গণমাধ্যম বিশেষ করে বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া উচিত।

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন