default-image

করোনা যে কত কিছু শেখাল! করোনা এখনো বিদায় নেয়নি, কিন্তু বিদায় নিলে কী হবে, তা-ই নিয়ে নানা জ্ঞান বিতরণ হচ্ছে। জ্ঞানীজনেরা বলছেন, করোনামুক্ত পরিবেশে একটি ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে সবাইকে। কোনো কোনো জ্ঞানী এই ‘নিউ নরমাল’-এর হুবহু অনুবাদ করে বাজারজাত করলেন ‘নতুন স্বাভাবিক’। এ যেন ‘গরু চোর’-এর ইংরেজি ‘কাউ থিফ’-এর মতো। ধারণা করি, ‘নিউ নরমাল’ বলতে আসলে বোঝানো হয়েছে, করোনা-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় আমাদের কীভাবে জীবন যাপন করতে হবে, সেটাই। করোনার পরে ‘নতুন স্বাভাবিক’ আসুক। কিন্তু দেখছি স্বাভাবিক ঘটনাই নতুন ধরনের এক স্বাভাবিকতা তৈরি করছে, স্বাভাবিক হয়ে উঠছে অস্বাভাবিক।

১.
একটি নির্বাচনের সময় সব প্রার্থীই চান সহজে জয় পেতে। স্বাভাবিকভাবেই একজন প্রার্থী চান জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী কম থাকুক। এ জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রয়োজনে হাতে-পায়ে ধরে বসিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা, বিদ্রোহী হলে দলের হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ, সেটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু এক ‘নতুন স্বাভাবিক’ মাদারীপুরের কালকিনিতে। নিখোঁজ হওয়ার ১১ ঘণ্টা পরে এলাকায় ফিরে কালকিনি পৌরসভার স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী মসিউর রহমান (সবুজ) অভিযোগ করেছেন, পুলিশ সুপারের গাড়িতে উঠিয়ে তাঁকে ঢাকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলছেন, ‘এসপি আমাকে ঢাকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে নিয়ে যান। সেখানে ওবায়দুল কাদের আমাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান।’ ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদেরের নির্ধারিত কক্ষে তাঁর সঙ্গে প্রায় ৩৫ মিনিট তাঁদের মধ্যে কথা হয়। মসিউর রহমান বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের কোনো পদে নেই। আমি কালকিনি উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। আমি দলের কাছে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়নও চাইনি। আমি জনগণের হয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছি।’

বিজ্ঞাপন

জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান দাবি করেন, ‘সবুজ নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কাজে আমার অফিসে আসেন। পরে তিনি ঢাকায় যান তাঁর ব্যক্তিগত কাজে। আমরা তাঁকে ঢাকায় যাওয়ার সময় সহযোগিতা করেছি।’

‘নতুন স্বাভাবিকে’র শক্তি দেখুন। যে লোকের ঢাকায় যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই, সেই লোককে ঢাকায় যাওয়ার সহায়তা দিচ্ছেন এসপি সাহেব! সব স্বাভাবিক হলে এই পুলিশ কর্মকর্তার সাজা হতো। কিছুই হবে না এই অস্বাভাবিকই বুঝি ‘নতুন স্বাভাবিক’!

২.
স্বাভাবিক হচ্ছে: একজন রোগী ডাক্তারের কাছে যাবেন, তাঁর চিকিৎসা দেবেন ডাক্তার, নার্স।

কিন্তু না, নতুন এক স্বাভাবিক দেখলাম কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। সারা দেশে কোভিড-১৯–এর টিকাদান শুরুর দিনে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে নার্সকে সরিয়ে নিজেই টিকা দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছেন উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান খান। মান্নান খান কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীও নন কিংবা টিকা দেওয়ার কোনো প্রশিক্ষণও তাঁর নেই। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ‘অতি উৎসাহে’ টিকা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন মান্নান খান।
এই টিকা নিয়েই আরেক ঘটনা। ঘটেছে সরাইল উপজেলায়। সাংসদ উম্মে ফাতেমা নাজমা বেগমের টিকা নেওয়ার কথা ঢাকায়, কিন্তু তিনি টিকা নেওয়ার ফটোসেশনে বসেছেন সরাইলে।

করোনা টিকার মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে এই অস্বাভাবিক ঘটনাই ‘নতুন স্বাভাবিক’ হয়ে খবরের জন্ম দিয়েছে।

৩.
একজন সচিব তাঁর এলাকার উন্নয়নে কিছু একটা করতে চাইতেই পারেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কী হলো কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। স্বাস্থ্যসচিবের পরিবারের দেওয়া জায়গায় একটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হচ্ছে কিন্তু এলাকার এমপি সাহেব এর বিরুদ্ধে। স্বাস্থ্যসচিব এলাকায় গেলে তাঁর উপস্থিতিতেই বাড়িতে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালানো হয়। পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় উপজেলার এক কর্মকর্তাকে।
‘নতুন স্বাভাবিক’ এমনই যে উন্নয়নকাজ তো লাটে উঠেছেই, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।
৪.
বগুড়ায় কিশোরীকে ধর্ষণের পাশাপাশি তাকে ও তার মাকে মাথা ন্যাড়া করে দিয়েছে এক প্রভাবশালী দুর্বৃত্ত। সারা দেশে নিন্দা, ধিক্কার। আসামি গ্রেপ্তার। স্বাভাবিক প্রত্যাশায় সবাই অপেক্ষা করছেন দুর্বৃত্তের বিচার হবে।
কিন্তু ‘নতুন স্বাভাবিক’ খবর দিল ভিন্ন রকম। সেই দুর্বৃত্তকে আদালত নাকি জামিন দিয়েছেন।

২০১৭ সালের ২৮ জুলাই দুর্বৃত্ত তুফান সরকারসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী কিশোরীর মা। ‘নতুন স্বাভাবিকের’ এমনই শক্তি যে মাত্র ৪ বছরের মাথায় ২০২১ সালে এসে আদালতে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মা-মেয়ে দুজনই নাকি বলেন, ঘটনার স্থান, কাল কিছুই তাঁরা জানেন না। তুফান সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের কোনো অভিযোগও নেই। জোরজবরদস্তি করে মামলার এজাহারে তাঁদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এজাহারে কী লেখা আছে, সেটাও পড়ে দেখেননি। ভুল-বোঝাবুঝি থেকে এ মামলা হয়েছে। এ মামলার প্রধান আসামি জামিন পেলে কোনো আপত্তি নেই।
ভাবতেও অস্বাভাবিক লাগে, কিন্তু এই বুঝি ‘নতুন স্বাভাবিক’!

বিজ্ঞাপন

৫.
নির্বাচনে একটি এলাকায় যেদিন মনোনয়নপত্র দাখিল হয়, সেদিনের পরিবেশ থাকে উত্তেজনাময়, এটাই স্বাভাবিক। সেই উত্তেজনা যাতে সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে জন্য পুলিশ থাকে সদা প্রস্তুত। ‘নতুন স্বাভাবিকে’ মাদারীপুরের শিবচরে পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেন ওসিকে সঙ্গে নিয়ে। ওসি দাবি করেছেন, নিরাপত্তা রক্ষার জন্য তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হাতে কাগজপত্র কেন? ওসির জবাব, ‘ইউএনওর সঙ্গে কাগজপত্র রিসিভ করছিলাম।’ পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রার্থীর সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন না।

পুরোনো স্বাভাবিকে এই পুলিশকে লোকদেখানো হলেও ক্লোজড করা হতো, কিন্তু হায় ‘নতুন স্বাভাবিক’!

৬.
যতই আধুনিক হই, পুরোনো স্বাভাবিক বলছে মদ্যপান খারাপ। মাতাল, মদ্যপ কোনো স্বাভাবিক বিশেষণ নয়। কিন্তু ‘নতুন স্বাভাবিক’ যেন সব উদারতায় বরণ করে নিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী মদ মিলছে না, সে কারণে ভেজাল মদ খেয়ে মরছে হালিতে হালিতে। এটাও যেন জাতির বড় সংকট। মন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলছেন, ভেজাল মদ না খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ‘নতুন স্বাভাবিকে’ বুঝি এমনটাই স্বাভাবিক।

আমরা নিশ্চয়ই নতুনের বিরোধী নই। কিন্তু যে ‘নতুন স্বাভাবিক’ আমাদের স্বাভাবিক জীবনচর্চাকে অস্বাভাবিক জায়গায় নিয়ে যায়, সেটাকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা যায় না। স্বাভাবিক জীবন, পরিবার ও সমাজের স্বাভাবিক বন্ধন, সেটাই নির্মল। স্বাভাবিক বনভোজন আনন্দ দেয়, আউটিংয়ের নামে বল্গাহীন আনন্দে লাশ হওয়ার শিক্ষা দেয় না।

কী এক ‘নতুন স্বাভাবিক’ আমাদের জীবনে এল! নোট আনার নামে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, মা-বাবা জানতেও পারছেন না। পবিত্র বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিষ্ঠুর ‘নতুন স্বাভাবিকে’ হতভাগা মা-বাবার হাতে তুলে দেয় নেশায়-ধর্ষণে লাশ হওয়া সন্তান। কী নির্মম এই ‘নতুন স্বাভাবিক’, যে সন্তানহারা বাবা না উচ্চ স্বরে বিলাপ করতে পারেন, না সমাজ বা স্বজনকে বলতে পারেন, কীভাবে কী হয়েছে।

ভবিষ্যৎ নতুনের হাত ধরে পথ চলুক, কিন্তু অস্বাভাবিককে যেন স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা না হয়, তা যে নামেই হোক। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবারই এ বিষয়ে সতর্কতা জরুরি।

মনজুরুল আহসান বুলবুল সাংবাদিক

মন্তব্য করুন