default-image

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূচনালগ্ন ১৯৫০ সাল থেকে প্রতিবছর ৭ এপ্রিল তারিখটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালন করা হয়। প্রতিবছর বিশ্ব স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২১ সালের প্রতিপাদ্য হলো, ‘লেটস বিল্ড আ ফেয়ারার, হেলদিয়ার ওয়ার্ল্ড ফর এভরিওয়ান’ (আসুন, সকলের জন্য অধিকতর ন্যায্য ও স্বাস্থ্যকর বিশ্ব গড়ে তুলি)। কথাটি খুব সহজ ও সাদামাটা শোনালেও এর মধ্যে অত্যন্ত গভীর ব্যঞ্জনা রয়েছে।

ন্যায্যতা কী? স্বাস্থ্যের সঙ্গে তার সম্পর্কই-বা কী। আসুন, জেনে নেওয়া যাক।

স্বাস্থ্য বলতে আমরা ওষুধ-পথ্য, চিকিৎসক-নার্স ইত্যাদির বদৌলতে প্রাপ্ত চিকিৎসা বা প্রতিকারকে বুঝি। আমাদের স্বাস্থ্য অধিকারের ধারণাটিও যেন কেবল অসুস্থ হলে প্রতিকার প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় থমকে আছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবিধানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাননির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সুস্বাস্থ্য উপভোগ করতে পারাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আপনি কেবল অসুস্থ হলেই চিকিৎসা পাবেন তা নয়, বরং সুস্থ অবস্থাতেও যেন আপনি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সুস্থতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করতে পারেন, সেটিই আপনার অধিকার।

কাজেই স্বাস্থ্যকে কেবল বায়োমেডিকেলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই, বরং একে দেখতে হবে জনগণের অধিকারের লেন্স দিয়ে। আর তা করতে গেলেই চলে আসে অধিকার দাবি করার প্রসঙ্গ, অধিকার আদায়ের প্রসঙ্গ, সর্বোপরি সমাজের ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাবঞ্চিতদের টানাপোড়েনের প্রসঙ্গ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসক ও চিন্তাবিদ রুডোল্ফ ভারসো বলেছিলেন, ‘মেডিসিন একটি সমাজবিজ্ঞান (সে সময়ের প্রেক্ষাপটে মেডিসিন বলতে তিনি মূলত স্বাস্থ্যকে বুঝিয়েছিলেন) এবং রাজনীতি বৃহত্তর পরিসরে মেডিসিন বৈ কিছুই নয়।’

বিজ্ঞাপন

মন্তব্যটিকে স্বাস্থ্যের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক নির্ণায়কগুলোর দিকে নির্দেশ করা প্রথম বাক্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আজ বিশ্বব্যাপী সামাজিক ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে জনগণের স্বাস্থ্যের অধিকারের বিষয়টি স্বীকৃত। ২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কমিশন অন সোশ্যাল ডিটারমিন্যান্টস অব হেলথ বা স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ণায়ক-সংক্রান্ত কমিশন সামাজিক প্রতিবেশে অবস্থিত স্বাস্থ্যের নির্ণায়কগুলো খুঁজে বের করতে গবেষণা শুরু করে এবং এ-সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ২০০৮ সালে বিশদ রিপোর্ট প্রণয়ন করে। স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ণায়কের মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান, আবাসন, সামাজিক অবলম্বন, শৈশব, আয়, অধিগম্যতা, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক অভিঘাত, শিক্ষা প্রভৃতি। মানুষ যেখানে জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে, দৈনন্দিন জীবন যাপন করে, কাজ করে এবং পরিশেষে বার্ধক্যে উপনীত হয়—এসব অবস্থার মধ্যেই এ নির্ণায়কগুলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর এ অবস্থাগুলো অনেকাংশেই স্থানীয়, জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ, ক্ষমতা (রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ইত্যাদি) এবং সম্পদের বিলিবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে রূপ পরিগ্রহ করে।

সহজভাবে বলতে গেলে, আপনি স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করতে পারবেন কি না, তা আপনার এলাকার চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে এ সমাজ, এ রাষ্ট্র কার জন্য কী বরাদ্দ রাখছে, কে কী পাচ্ছে, কার প্রাপ্যটিকে কার পাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে—এসব বিলিবণ্টন ব্যবস্থার ওপর। ফেয়ারনেস বা ন্যায্যতা হলো, জনগোষ্ঠীর কোনো অংশ অন্য অংশের চেয়ে অন্যায্যভাবে বৈষম্যের শিকার হবে না, বিশেষ করে এ ধরনের বৈষম্য যখন স্পষ্টত পরিহারযোগ্য। বাংলাদেশের সংবিধান তার সব নাগরিকের জন্য বৈষম্যহীন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ কি পেরেছে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে? আসুন, দেখে নেওয়া যাক উপাত্ত কী বলে।

স্বাস্থ্যকে কেবল বায়োমেডিকেলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ নেই, বরং একে দেখতে হবে জনগণের অধিকারের লেন্স দিয়ে। আর তা করতে গেলেই চলে আসে অধিকার দাবি করার প্রসঙ্গ, অধিকার আদায়ের প্রসঙ্গ, সর্বোপরি সমাজের ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাবঞ্চিতদের টানাপোড়েনের প্রসঙ্গ

বাংলাদেশ জনমিতিক ও স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৭-২০১৮-এর উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বেশির ভাগ স্বাস্থ্য সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি হলেও অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আবাসস্থল (নগর বনাম গ্রাম), ভৌগোলিক অবস্থান (বিভিন্ন বিভাগ) প্রভৃতির ভিত্তিতে সূচকগুলোতে এখনো ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ: সচ্ছল জনগোষ্ঠীতে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স যেখানে ১৭.৬ বছর, দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীতে তা মাত্র ১৫.৬ বছর। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে (মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব) সন্তানের কাঙ্ক্ষিত সংখ্যার গড় যেখানে ২.২, অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীতে তা ২.৬। রংপুর বিভাগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার যেখানে ৬৯.৮ শতাংশ, চট্টগ্রামে তা মাত্র ৫৩.৭ শতাংশ। সচ্ছল জনগোষ্ঠীতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার যেখানে প্রতি হাজারে ৩৬, দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীতে তা ৫৫। নগর এলাকায় দক্ষ সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে প্রসূতিসেবা গ্রহণকারী মায়েদের হার যেখানে ৬৭.৮ শতাংশ, গ্রাম এলাকায় তা মাত্র ৪৭.২ শতাংশ। শিশু খর্বকায় হওয়ার হার ধনীদের মধ্যে ১৭.১ শতাংশ হলেও একই দেশের, একই জলবায়ুর দরিদ্র ঘরের শিশুদের মধ্যে তা দ্বিগুণের বেশি, ৪০.২ শতাংশ। এভাবে প্রায় প্রতিটি সূচকেই বৈষম্যের এ অশুভ চিত্র প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। এমনটি তো ন্যায্য নয়।

বর্তমানে বিশ্ব কোভিড-১৯ অতিমারির মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। এখানেও আমরা দেখি দরিদ্রদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, ঘরের নিভৃত কোণে বসে ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা মধ্য ও উচ্চবিত্তের সাজলেও, দরিদ্রদের তা সাজে না। কাজ হারিয়ে সপরিবার স্বাস্থ্যহানি ও অপুষ্টির করাল গ্রাসে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাটিও তাদেরই বেশি। এদিকে আক্রান্ত হলে তার খরচ বহনের ক্ষমতাও তাদের কম। ধনী পরিবারের মানুষটি পাঁচতারকা হাসপাতালে শুয়ে যেখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণযন্ত্রের তেজ নিয়ে উষ্মা প্রকাশে ব্যস্ত, দরিদ্র পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি তখন সরকারি হাসপাতালের বেড নয়, মেঝেতে স্থান করে নিতেও হিমশিম খাচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সীমাবদ্ধতায় বাংলাদেশে বছরে ৯ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যজনিত ব্যয়-বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, ৫.৬ শতাংশ মানুষ নেমে যায় দারিদ্র্যসীমার নিচে, ৭ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

এদের কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। তাদের অপুষ্ট, ক্ষীণ কণ্ঠস্বর আমাদের নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত যদি না-ও পৌঁছায়, তাদের স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবিকে আমাদেরই তুলে ধরতে হবে। আর সে কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ বছরের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যটি।

ড. তৌফিক জোয়ার্দার পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন