বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম তেমনি একজন মৃত্যুঞ্জয়ী পাইলট। বাংলাদেশ বিমানের এ পাইলট দুই দুইবার যাত্রীদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। শেষবারে মৃত্যুর মুখে পতিত হলেন নিজেই। ভারতের মহারাষ্ট্রে নাগপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার নওশাদের মৃত্যু হয়। তার আগে শুক্রবার সকালে বিমানের একটি ফ্লাইটে ওমানের মাসকট থেকে ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন তিনি। ভারতের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় ৪৪ বছর বয়সী এই পাইলট হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন। এ সময় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি নাগপুরের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। মাঝ আকাশে পাইলটের এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ অবতরণে রক্ষা যান যাত্রীরাও। একটি ফ্লাইটের সব ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া-নেওয়ার এখতিয়ার ও দায়ভার থাকে ক্যাপ্টেনের ওপর। ফলে নিরাপদ অবতরণের জন্য কো-পাইলটের ওপর বড় ভূমিকা থাকলেও ক্যাপ্টেন নওশাদের সাহসিকতাই প্রাধান্য পাচ্ছে।

নেপালের বিমান দুর্ঘটনার কথা আমাদের ভোলার নয়। মাত্র কয়েক বছর আগের ঘটনা। কাঠমান্ডু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস বাংলার একটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয়ে ওই ঘটনায় ৫১ জন যাত্রী ও ক্রু প্রাণ হারিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন ছিলেন আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশিদও। স্বামী হারানোর ধাক্কা সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে দুই সপ্তাহ পর মারা যান পাইলট আবিদের স্ত্রীও। সেই ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কান্না আমাদের এখনো স্তব্ধ করে দেয়। কে বলেছেন সেটি মনে নেই, তাঁর অফিসের কলিগ সেই দুর্ঘটনার প্রাণ হারিয়েছিলেন। অফিসে তাঁর ডেস্কের এক জায়গায় লাগানো ছিল একটি টিপ। সেই টিপটিই সেই অফিসে শোকের প্রতীক হয়ে ছিল অনেক দিন।

কাঠমান্ডুর সেই ঘটনার দুই বছর আগে ২০১৬ সালে বিমানের একটি ফ্লাইট বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ক্যাপ্টেন নওশাদই ছিলেন সেই ফ্লাইটের পাইলট। তার সাহসিকতায় প্রাণ রক্ষা পেয়েছিলেন ১৪৯ জন যাত্রী। সেই দুঃসাহসী অভিযাত্রার স্বীকৃতিও মিলে নওশাদের। বৈমানিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশন সম্মাননা দেয় তাঁকে। সেই ফ্লাইটটিও ছিল মাসকটের, তবে গন্তব্য ছিল চট্টগ্রাম। উড়োজাহাজও ছিল বোয়িং ৭৩৭-৮০০। ওমান থেকে গভীর রাতে মাসকট বিমানবন্দরে রানওয়ে থেকে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটির টায়ারে বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু তখন পেছনে ফেরার সুযোগ ছিল না। যাত্রীরাও বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁরাও ভয়ে চিৎকার করছিলেন তখন। মাইক্রোফোনে যাত্রীদের আতঙ্কিত না হতেও বলেন নওশাদ।

ঘটনার পরের মাসে প্রথম আলোকে চরম উত্তেজনাকর সেই অবতরণের কথা শুনিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। টায়ার ফেটে গেলে জরুরি অবতরণের সময় উড়োজাহাজে আগুন ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু অবতরণের জন্য শাহজালাল বিমানবন্দরে জরুরি বার্তা পাঠানোও সম্ভব ছিল না। সেই বোয়িং-এ স্যাটেলাইট ফোনের ব্যবস্থা ছিল না। তবে আকাশপথে এক উড়োজাহাজ থেকে আরেক উড়োজাহাজের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করা যায়। ভাগ্য ভালো, একই সময়ে দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের আরেকটি উড়োজাহাজ চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করেছিল। ওই উড়োজাহাজটি ছিল অত্যাধুনিক, যাতে ছিল স্যাটেলাইট ফোন সিস্টেম। আকাশপথে দুই উড়োজাহাজের মধ্যে তিন ঘণ্টা অসংখ্য মেসেজ আদান-প্রদান হয়। যার ফলে ঢাকার কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু আগুন ধরে যাওয়ার ভয়ে জ্বালানি কমাতেও হচ্ছিল, আবার জ্বালানি শেষ হওয়ার আগেই অবতরণ করতে হবে। এর মধ্যে ঢাকার আকাশে এসে দেখা গেল প্রচণ্ড কুয়াশা ও তীব্র বাতাস। বিমানবন্দরে নামতে গিয়েও এমন বড় বাধা। ঢাকার আকাশেই উড়ছিলেন নওশাদ। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তা ও চরম সাহসিকতাপূর্ণ অবতরণ করতে সক্ষম হন তিনি। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিস্ফোরিত হতো উড়োজাহাজটি। প্রাণ যেতে পারত সব আরোহীর। কিন্তু সেটি হতে দেননি নওশাদ।

বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজ চালাতেন নওশাদ। সেই উড়োজাহাজেই গত বৃহস্পতিবার তিনি দেশে ফিরলেন। তবে উড়োজাহাজ চালিয়ে নয়, ফিরলেন লাশ হয়ে। জীবনের শেষ বিমানযাত্রায় তিনি পাইলটের সিটে ছিলেন না, ছিলেন যাত্রীদের আসনে কফিনবন্দী অবস্থায়।

ক্যাপ্টেন নওশাদের মৃত্যু ও তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় অনেককে দেখছি হলিউডের ‘সালি’ সিনেমার উদাহরণ টানছেন। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাডসন নদীতে উড়োজাহাজের অবতরণের কথা অনেকের মনে আছে নিশ্চয়ই। নদীতে ভাসমান উড়োজাহাজ আর এর বিশাল দুই ডানায় আশ্রয় নিয়েছিলেন মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত যাত্রীরা। এমন রোমহর্ষক ছবি সেসময় পত্রিকার পাতায় আমরা দেখেছি। মূলত কানাডিয়ান হাঁসের ঝাঁকের কবলে পড়েছিল উড়োজাহাজটি। হাঁসগুলো প্লেনের দু’পাশের ইঞ্জিনে ঢুকে যায়, যাতে ইঞ্জিনের ব্লেডগুলো ভেঙে আগুন ধরে যায়।

বিস্ফোরণ থেকে বাঁচতে ওই মুহূর্তে উড়োজাহাজ নদীতে নামিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না মার্কিন পাইলট চেসলি সালেনবার্গারের, যার রুদ্ধশ্বাস ভূমিকার কারণে বেঁচে যান যাত্রীরা। তাঁর ডাক নাম ছিল সালি। সেই নামেই মার্কিন পরিচালক ক্লিন্ট ইস্টউড ২০১৬ সালে নির্মাণ করেছিলেন ‘সালি’, যেখানে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন টম হ্যাঙ্কস। আমাদের নওশাদের বীরত্ব নিয়ে কখনো সিনেমা হবে কী না জানি। কয়দিন পর হয়তো আমরা তাঁকে ভুলেও যাব। জাতি হিসেবে এই-তো আমাদের চরিত্র!
যাত্রীদের নিরাপদে পৌঁছে দিয়ে ক্যাপ্টেন নওশাদের শুধু পেশাগত দায়িত্বই পালন করেননি, নিজের মৃত্যুকেও সঙ্গী করেছেন। যার কারণে পেশাদারি মনোভাবের আকালের এই দেশে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা হয়েই থাকবেন।

ক্যাপ্টেন নওশাদ দেশের সেরা একজন চৌকস ও দক্ষ পাইলট ছিলেন। দেশে বেসরকারি পরিবহনে বিমানের চাকরিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সেখানে পাইলট হিসেবে ঢুকতে তুমুল প্রতিযোগিতা করতে হয়। সেরা ও মেধাবী পাইলটরাই সেখানে সুযোগ পান। তেমনি একজন ক্যাপ্টেন নওশাদের মৃত্যু দেশের জন্য অবশ্যই ক্ষতি।

বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজ চালাতেন নওশাদ। সেই উড়োজাহাজেই গত বৃহস্পতিবার তিনি দেশে ফিরলেন। তবে উড়োজাহাজ চালিয়ে নয়, ফিরলেন লাশ হয়ে। জীবনের শেষ বিমানযাত্রায় তিনি পাইলটের সিটে ছিলেন না, ছিলেন যাত্রী হিসেবে কফিনবন্দী অবস্থায়। তাঁর জন্য বিমানবন্দরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন সহকর্মীরা। বিমান অবতরণের পর সহকর্মীরা তাঁর কফিনটি কাঁধে করে নামান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাইলটরা নিজেদের টুপি খুলে নওশাদকে শ্রদ্ধা জানান। অশ্রুসিক্ত সে মুহূর্ত যে কাউকেই আবেগপ্রবণ করে তুলবে। নওশাদ এ দেশের সাহসী সন্তানদের একজন। তার প্রতি আমরাও শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই— স্যালুট, ক্যাপ্টেন।

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন