উল্লেখ্য, জাতীয় সরকার নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে নেই। এর কোনো একক সংজ্ঞা বা ধারণাও নেই। বিচ্ছিন্ন কিছু ধারণা আমরা বিভিন্ন দেশে দেখতে পাই। মূলত যুদ্ধ, অশান্তি, গৃহযুদ্ধ, বিভাজন থেকে দেশকে মুক্ত করতে বিবদমান দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির উদ্দেশ্যে ক্রান্তিকালীন সমাধান হিসেবে জাতীয় সরকার গঠন করা হয়। ১৭৮৭ সালের যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম জাতীয় সরকার গঠন করা হয়। পঞ্চম প্রজাতন্ত্র (ফিফথ রিপাবলিক) গঠনের পূর্ববর্তী ফ্রান্সে চার্লস দ্য গলের সরকারকেও জাতীয় সরকার বলা হয়। সব দলের অংশগ্রহণে গঠিত জাতীয় সরকার ব্রিটেনে দেখা যায় ১৯৩১ সালে। গত শতকের শেষ দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে, এই দেশগুলোয় বিশেষ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছিল। এ ধরনের জাতীয় সরকারের বাইরেও বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারকে জাতীয় সরকার বলা হয় অনেক সময়।

বড় বড় রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা না থাকলে ছোট দলগুলো একজোট হয়ে সম্মিলিত বিরোধী গঠন করতে পারে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দলগুলো বাস্তবভিত্তিক গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি নিয়ে জনসাধারণ সামনে উপস্থিত হতে পারে। এসব না করে এসব দল আজকে এই জোট, কাল সেই জোট করে নিজেদের খেলো করে ফেলেছে। এখান থেকে তাদের বেরিয়ে আসা দুষ্কর। এ কারণেই তারা নির্বাচনকে পাশ কাটিয়ে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতার ভাগীদার হতে চায়।

আমাদের এখানে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য দুই ধরনের প্রস্তাব প্রকাশ্যে এসেছে। প্রথমত, ক্ষুদ্র কয়েকটি রাজনৈতিক দল বছর দুয়েকের জন্য একটি জাতীয় সরকার গঠনের মত ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব হচ্ছে নির্বাচনে যারাই জিতুক, সব পক্ষকে নিয়েই একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে কেন? বরং একটি গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের জন্য সব জায়গা থেকে চাপ দিতে হবে সরকারকে। নির্বাচনকালীন স্বল্পমেয়াদি সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদের জাতীয় সরকার কখনোই নির্বাচিত সরকারের বিকল্প হতে পারে না। তাই বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় সরকার নিয়ে দুই পক্ষের প্রস্তাবই গ্রহণযোগ্য নয়।

মোদ্দাকথা হচ্ছে, নির্বাচনের আগেও যেমন জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজন নেই, নির্বাচনের পরেও জাতীয় সরকার গঠনের কোনো সুযোগ নেই। এতে অহেতুক জটিলতা বাড়বে। আর এসব যদি রাজনীতির হালকা কথাবার্তা হয়ে থাকে, তাহলে জাতীয় সরকারের ধারণা সযত্নে দলগুলোর পরিহার করা প্রয়োজন। রাজনীতিবিদদের হালকা ও চটুল কথাবার্তা শুনতে শুনতে মানুষ এখন ক্লান্ত। মানুষ স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা চায়। প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হাতের নাগালে দেখতে চায়। প্রীতিরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায়। নাগরিকদের সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনের পরিকল্পনা ও নিশ্চয়তা নিয়ে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে শুনতে চায়। ভোটের অধিকার ফিরে পেতে চায়। রাজনীতিবিদদের মন্ত্রী, এমপি হওয়ার পরিকল্পনার কথা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির কথা শুনতে চায় না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, মূলত গত শতকে বিশ্বের বিভিন্ন সামরিক অভ্যুত্থানের বিকল্প হিসেবে বর্তমানে জাতীয় সরকারের ধারণা প্রয়োগ করা হচ্ছে। গত শতকে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লৌহমানবদের আগমন ঘটে। এসব লৌহমানবের অনেকেই পশ্চিমাদের সমর্থন পেয়েছিলেন। যেমন চিলির অগাস্তো পিনোশে বা নাইজেরিয়ার সানি আবাচা। তবে জাতিসংঘের শান্তি মিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে সামরিক অভ্যুত্থান কমে গেছে। কিন্তু অপছন্দের সরকার ফেলে দেওয়ার পথ থেকে তো ইউরোপ আমেরিকার সরকারগুলো সরে আসেনি। হালে সরকার বদলের নতুন ধারণা হচ্ছে জাতীয় সরকার।

এটা আধা সামরিক, আধা সুশীল ও আধা রাজনৈতিক সরকার। এ সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট চরিত্র থাকে না। দেশকে সুপথে নিয়ে আসার জন্য এ-জাতীয় সরকার গঠন করা হলেও এদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব ও জনসমর্থন না থাকার কারণে বরং দেশকে আরও সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে ইরাক ও লিবিয়া। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর একধরনের জাতীয় সরকার গঠন করা হয়েছিল। বিশেষ করে লিবিয়ার সরকারের নামই ছিল জাতীয় সরকার। অদ্ভুত ধরনের এ সরকার লিবিয়াকে এ সুতোয় গাঁথতে পারেনি; বরং নানা ধারায় বিভক্ত করেছে। দীর্ঘ মেয়াদে অনির্বাচিত সরকার কোনো সমাধান হতে পারে না। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জাতীয় সরকার কাজ করতে পারেনি ঠিকমতো। এসব জাতীয় সরকার বরং পশ্চিমের স্বার্থই রক্ষা করে বেশি।

আমাদের দেশেও জাতীয় সরকার খুব বেশি কার্যকর হবে বলে মনে হয় না। সংবিধানে জাতীয় সরকারের কোনো বিধান নেই। জাতীয় সরকার গঠন করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। গণভোটের মাধ্যমেও জাতীয় সরকার গঠনের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধান থেকে গণভোটের বিধান তুলে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সরকারের প্রস্তাবকদের মতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও গণ্যমান্যদের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। এ সরকার বিগত সময়ে ক্ষয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাকে নতুন জীবন দান করবে বলে জাতীয় সরকারের পক্ষের লোকেরা প্রচারণা করছেন। জাতীয় সরকার নির্বাচিত না হওয়ার কারণে নতুন আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকবে না। জাতীয় সরকারকে নির্বাহী আদেশে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে এবং এ সরকারের যাবতীয় কাজকর্ম পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে অনুমোদন করতে হবে। যেমন ২০০৮ সালের নির্বাচিত সরকার ফখরুদ্দীনের সরকারের সব কাজের অনুমোদন দিয়েছিল।

সংবিধান সংশোধন করেই যদি জাতীয় সরকারের বিধান আনতে হয়, তবে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনের জন্য তিন বা চার মাসের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে না কেন? বর্তমান সরকারের অধীন নির্বাচন করতে না চাইলে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের জন্য আলাপ-আলোচনা করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন নির্বাচনের পর নতুন সরকার দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনবে। এ জন্য রাজনৈতিকগুলোকে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই দীর্ঘ মেয়াদে অনির্বাচিত সরকার গ্রহণযোগ্য নয়।

জাতীয় সরকারের সমর্থকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আমাদের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। এগুলোর সংস্কার করার জন্য সময় প্রয়োজন। জাতীয় সরকার সময় নিয়ে এসব বিষয়ে কাজ করবে। প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে না হয় জাতীয় সরকার ঠিক করে ফেলবে; কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে। রাজনৈতিক দলগুলো আকণ্ঠ দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত। দলগুলোর নিজেদের মধ্যেই গণতন্ত্র নেই। এ কারণে দক্ষ, স্বপ্নচারী নেতৃত্ব বের হচ্ছে না। এখন রাজনীতির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে লুটপাট করা। রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো ভিশন বা পরিকল্পনা নেই। আগামী ২০ বছর পর দেশকে বা নিজেদের দলকে কোথায় দেখতে চায়, তার কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। বিভিন্ন দল নানা লক্ষ্যমাত্রার কথা বলে বটে, কিন্তু এসবই চটকদার কথাবার্তা।

ঠিক এ জায়গা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বের করে আনতে হবে। জাতীয় সরকারের অবান্তর চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে নির্বাচনের আগে নিজের যথাসম্ভব গণতান্ত্রিক দলে পরিণত করা।

বড় বড় রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা না থাকলে ছোট দলগুলো একজোট হয়ে সম্মিলিত বিরোধী গঠন করতে পারে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র দলগুলো বাস্তবভিত্তিক গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি নিয়ে জনসাধারণ সামনে উপস্থিত হতে পারে। এসব না করে এসব দল আজকে এই জোট, কাল সেই জোট করে নিজেদের খেলো করে ফেলেছে। এখান থেকে তাদের বেরিয়ে আসা দুষ্কর। এ কারণেই তারা নির্বাচনকে পাশ কাটিয়ে যেনতেন প্রকারে ক্ষমতার ভাগীদার হতে চায়। কিন্তু নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে জাতীয় সরকারের নামে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার চিন্তা অনভিপ্রেত।

ড. মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন