default-image

‘তুমি গাড়ি সারাতে জানো, তুমি খুব ভালো খেলাধুলা পারো এবং তুমি জানো মুখ বন্ধ রাখতে।’

‘মুখ বন্ধ রাখা! এটা তো কোনো যোগ্যতা নয়।’

‘প্রিয়তম। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। এটা একটা যোগ্যতা।’...সিমোন এলকেলিস। ‘রুলস অব অ্যাট্রাকশন।’

এত শব্দদূষণ চারদিকে! বাংলাদেশের মতো শব্দবহুল দেশ, ঢাকার মতো শব্দবহুল শহর পৃথিবীতে আর একটাও আছে কি না, জানি না। গাড়ির হর্ন যে বাজাতে হয় না, এটা আমরা কেউ জানি না। আমাদের কেউ বলে দেয়নি। বরং উল্টো বলে, হর্ন দেন নাই ক্যান! বিদেশে কেউ গাড়িতে হর্ন বাজালে লোকে সেটাকে চপেটাঘাত বলে জ্ঞান করে, কেন লোকটা হর্ন বাজাল। আর যে লোকটা কোনো কারণে বিরক্ত হয়ে (যেমন সামনের গাড়ি গ্রিন সিগন্যাল পড়ার পরও মোবাইলে টেক্সট করছে বলে নড়ছে না) হর্নটা বাজায়, সেও কিন্তু খুব ছোট্ট করে, আলতো করে হর্নে চাপ দেয়। যাতে মিনিমাম সাউন্ড হয়। আর আমাদের কাজ হলো হর্ন বাজানো। আমরা কারণে হর্ন বাজাই, অকারণে হর্ন বাজাই। আমাদের হাত আপনা–আপনি হর্নে চলে যায়। থামতেই পারি না।

আমার গাড়ির চালককে যত বলি হর্ন বাজাবে না, ততই সে হর্ন বাজাতে প্রলুব্ধ হয়। সে মনে করে, হর্ন বাজানো তার অধিকার, সাহেব তাকে তার মৌলিক মানবাধিকার কিংবা ন্যায্য পাওনা বঞ্চিত করছে। প্রতি ছয় মাস পরপর হর্ন পাল্টাতে হয়। কারণ, জাপানিরা এই গাড়িতে একটা হর্ন দেয় বটে, কিন্তু সেটা যে কেউ সত্যি সত্যি বাজাবে, তা তো তাদের জানা নেই। ফলে বাংলাদেশে আসার ছয় মাসের মধ্যে প্রতিটা গাড়ির হর্ন পাল্টাতে হয়।

১৮ মার্চের প্রথম আলোয় বেরিয়েছে একটা খবর। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন এবং স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় জরিপ করেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল শহরে। বিষয় শব্দদূষণের মাত্রা নির্ধারণ। ফল পূর্বানুমিত। ঢাকায় তো বটেই, ঢাকার বাইরেও শব্দদূষণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ প্রাণ গোপাল দত্ত বলেছেন, ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ কানে গেলে যেকোনো মানুষই নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত এবং মানসিক সমস্যায় ভুগবে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের শহরগুলোতে ১১২ থেকে ১৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ পাওয়া গেছে। বুঝতেই পারছেন, আমরা সবাই স্বাস্থ্যগত এবং মানসিক সমস্যায় ভুগছি।

তবে মানুষের শরীর কিন্তু পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য বিবর্তিত হয়। যেহেতু চারদিকে ব্যাপক শব্দদূষণ, আমাদের কান শোনা বন্ধ করে দেবে, এটাই স্বাভাবিক। দেখবেন, আমরা প্রায় সবাই কানে কম শুনি এবং সে কারণেই নিজেরা চিৎকার করে কথা বলি। যে নিজে কানে কম শোনে, সে গলা চড়াবেই, কারণ নিজের কান পর্যন্ত তো কথাটা পৌঁছাতে হবে, আর যার উদ্দেশে সে বলছে, সেও তো এই দেশেরই মানুষ, শব্দদূষণ তার কানকেও বধির করে তুলেছে। ফলে তার জন্যও উচ্চ স্বরই শ্রবণযোগ্য।

এ ব্যাপারে জ্ঞানী–গুণীরা চিরকাল বলে এসেছেন, নীরবতা হিরণ্ময়। মার্ক টোয়েন যা বলেননি বলে প্রমাণিত (ও প্রচারিত) হয়েছে, ‘চুপ করে থাকায় লোকে সন্দেহ করতে পারে তুমি বোকা, কিন্তু তুমি মুখ খোলার পর সবাই যে নিঃসন্দেহ হয়ে যাবে যে তুমি বোকা, তার চেয়ে কি সেটা ভালো নয়?’ একই উক্তি আব্রাহাম লিংকনের নামেও প্রচলিত আছে। কোট ইনভেস্টিগেটর নামের একটা সাইট জানাচ্ছে, আব্রাহাম লিংকনও এটা বলেননি। তাঁরা যে বলেননি, তা তাঁরা ভালোই করেছেন। বলে নিজেকে মূর্খ প্রমাণ করার চেয়ে না বলে মূর্খ হিসেবে সন্দেহভাজন থাকা ভালো।

শব্দদূষণ হচ্ছে মাইকে, শব্দদূষণ হচ্ছে টেলিভিশনে, শব্দদূষণ হচ্ছে ফেসবুক লাইভে, শব্দদূষণ হচ্ছে ইউটিউবে। শব্দদূষণ হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শব্দদূষণ করছি পোস্ট লিখে, ব্লগ লিখে, স্ট্যাটাস লিখে। এবং শব্দদূষণ করছি সংবাদপত্রে কলাম লিখে।

এইবার থামি। কারণ, জ্ঞানীরা বলেছেন, আপনি যা বলেছেন, তার চেয়েও আপনি যা বলেননি তা দামি।

আমেরিকায় একটা আইন আছে, মিরান্ডা আইন বলে। তাতে পুলিশ যখন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, তখন শুরুতেই পুলিশকে বলে নিতে হবে: আপনার নীরব থাকার অধিকার আছে। আপনি যা বলবেন, তা আপনার বিরুদ্ধে আদালতে ব্যবহার করা হতে পারে, ব্যবহার করা হবে।

আমিও বলি: আমাদের অধিকার আছে কথা না বলার। আমরা যা বলছি, তা আমাদের বিরুদ্ধে আদালতে ব্যবহার করা হতে পারে এবং ব্যবহার করা হবে।

তোতা পাখির কৌতুকটা মনে পড়ছে, বলেই নিই। একটা তোতা পাখি একটা কমার্শিয়াল হেলিকপ্টারে চড়েছে। হেলিকপ্টারে উঠেই সে বকাঝকা করতে লাগল। এই, সারমেয়শাবক, খাবার দে। এই বরাহছানা, শরাব দে।

তাকে ক্রুরা খাবার দিচ্ছে, পানীয় দিচ্ছে।

তা দেখে এক লোকও গালিগালাজ শুরু করল।

একটু পরে দুজনকেই হেলিকপ্টার থেকে ছুড়ে মারা হলো।

তোতা পাখি উড়তে উড়তে পাশের লোকটাকে বলল, তোমার যদি পাখা নেই, তাহলে তুমি বকাবকি করছিলে কেন?

পাখা থাকুক আর না থাকুক, কথা কম বলতে হবে। ও মানুষ, কান তো দুটো, মুখ তো একটা (এবং সে মুখেরও আরও অনেক কাজ আছে, খেতে হয়, শ্বাস নিতে হয়, থুতু ফেলতে হয়), শুনবা বেশি, বলবা কম।


আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন