default-image

তাহলে আমরা এমন দুনিয়ায় বসবাস করছি যে কী খাচ্ছি, কী পরছি, কী পড়ছি, কী ভালোবাসছি, কীভাবে ভালোবাসছি, কখন কোথায় যাচ্ছি, কার সঙ্গে যাচ্ছি, সবকিছুর ওপরে নজর রাখা হচ্ছে। কম্পিউটারে, মোবাইল ফোনে, ল্যাপটপে আমরা যা বলছি, লিখছি, করছি, দেখছি, তা তো মনিটর করা হয়ই। ফেসবুক, টুইটার, গুগল ম্যাপ, জিপিএস তো আমাদের অনুসরণ করেই, তথ্য-উপাত্ত ধারণ করে, সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করে, বিশ্লেষণ করে, বিক্রি করে, আবার আমাদের মনকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। গুগল ম্যাপে গেলে নিজের বাড়ির ছাদ দেখা যায়, স্যাটেলাইট থেকে তো দেখাই যায় কোন বাড়িতে কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে। আমাদের চারদিকে সিসিটিভি। বলা হয়ে থাকে, এমনও প্রযুক্তি আছে, আমার অফ থাকা ল্যাপটপ খুলে তার ক্যামেরা চালু করে আমার ঘরের সবকিছু আরেকজন দেখছে।

আমরা ফোনে যে কথা বলি, তা যে রেকর্ড হয়, তা আমরা সবাই জানি। কারটা হয়, কতজনেরটা করা হয়, কত দিন রাখা হয়, সেসব আমরা জানি না। এ-সংক্রান্ত আইন বাংলাদেশে পাস করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার স্বার্থে ফোনে আড়ি পাততে পারবে। কখন পারবে, কীভাবে পারবে, আইনে নিশ্চয়ই তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। তবে মাঝেমধ্যে ফোনের আলাপ যে ফাঁস হয়, তা না করার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশ আছে।

বিজ্ঞাপন
মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মায়, কিন্তু সবখানেই সে শিকলে বাঁধা। আমাদের দেহই তো একটা কারাগার। নারী–পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গ, বাঙালি–অবাঙালি, প্রতিবন্ধী–চৌকস, বুদ্ধিমান–বুদ্ধিকম, একালের–সেকালের কত রকমের শিকলে যে আমরা বাঁধা।

জনগণকে তাই হাল ছাড়লে চলবে না। আমরা ক্ষমতার সর্বগ্রাসিতা সম্পর্কিত দার্শনিক চিন্তাগুলো মোটাদাগে জানি। মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মায়, কিন্তু সবখানেই সে শিকলে বাঁধা। আমাদের দেহই তো একটা কারাগার। নারী–পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গ, বাঙালি–অবাঙালি, প্রতিবন্ধী–চৌকস, বুদ্ধিমান–বুদ্ধিকম, একালের–সেকালের কত রকমের শিকলে যে আমরা বাঁধা। তারপর পরিবার, পাড়া, হাউজিং সোসাইটি, স্কুল, অফিস, ক্লাব, শহর, দেশ, বিশ্ব—সবখানেই স্তরে স্তরে ক্ষমতার নিগড়। আমরা এই ক্ষমতাকাঠামো এবং মূল্যবোধের কাঠামোর বাইরে যেতে পারি না। কেউ যদি যায়, তাহলে তাকে মানসিক হাসপাতালে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, না হলে জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কাজেই মানুষের মুক্তি নেই।

কিন্তু মুক্তির স্বপ্ন, সংগ্রাম, চেষ্টা তো থেমে রাখা যাবে না। সেটাও আবার তৈরি করে সমস্যা। একেকজন আসেন, তাঁরা মনে করেন, তাঁর কথামতো চললেই আসবে মানুষের মুক্তি। অঞ্জন দত্তের গান আছে: সুদিন আসবে বলে ওরা আগুন জ্বালায়, আর হাজার হাজার মানুষ মরে যায়। স্তালিনের আমলে মানুষের মুক্তির নামে কত কোটি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার হিসাব আজও বের হচ্ছে। একটা হিসাবে বলা হচ্ছে, দুই কোটি মানুষকে স্তালিন হত্যা করেছিলেন। আর নোয়াম চমস্কি বলেন, যদি নুরেমবার্গ আইন প্রয়োগ করা হয়, তাহলে যুদ্ধের পরে আমেরিকার প্রতিটা প্রেসিডেন্টকে ফাঁসিতে ঝোলাতে হবে।

তো আমরা একটা চক্রে পড়ে গেছি। রাষ্ট্রগুলো, ব্যবস্থাগুলো আমাদের মুক্তি দেয় না, আমাদের ক্রমাগতভাবে বন্দী করে। আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার তো দেয়ই না, বরং আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে চলার অধিকার, আমাদের কথা বলার অধিকার ক্রমাগতভাবে সংকুচিত করাই রাষ্ট্রের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। (রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট রাইট: শহীদ কাদরী।) তার বিরুদ্ধে জনগণকে সব সময়ই প্রতিবাদ করে যেতে হবে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবশ্যই আছে গণমাধ্যমের। ওপিনিয়ন লিডারদের। বুদ্ধিজীবীদের।

আবার আমরা কোনো একজন আদর্শবাদীর কথায় উদ্বুদ্ধ হব, কোনো একজন তাত্ত্বিক আমাদের বোঝাবেন, এইভাবে এইভাবে মুক্তি আসবে, কোনো একজন বা একাধিক নেতার কথায় হাজার হাজার মানুষ আত্মদান করবে, তারপর বিপ্লব তার নিজের সন্তানদের মেরে ফেলবে। রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটা অন্য অর্থে বলা যায়: ‘হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয়! ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না, যুক্তি শাস্ত্রের বিধান বহু বিলম্বে মাথায় প্রবেশ করে, প্রবল প্রমাণকেও অবিশ্বাস করিয়া মিথ্যা আশাকে দুই বাহুপাশে বাঁধিয়া বুকের ভিতরে প্রাণপণে জড়াইয়া ধরা যায়, অবশেষে একদিন সমস্ত নাড়ী কাটিয়া হৃদয়ের রক্ত শুষিয়া সে পলায়ন করে, তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে।’

না। এত হতাশা নিয়ে জগৎটাকে দেখে নিষ্ক্রিয়তাকে বরণ করে নেওয়া যাবে না। বরং রবীন্দ্রনাথের প্রশ্ন কবিতাটাই স্মরণ করি:

‘আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে

বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে

কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।

কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,

অমাবস্যার কারা

লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,

তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে—

যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।’

বিজ্ঞাপন

প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতে দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ, দেখেছেন তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে পাথরে মাথা ঠুকে মরছে, দেখেছেন দুঃস্বপ্নের কারাগার তাকে ঘিরে ধরছে, দেখেছেন, তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে, তিনি হারিয়ে ফেলছেন সুর আর সংগীত! যারা বায়ুকে বিষিয়ে তোলে, যারা আলো নিভিয়ে দেয়, তাদের রবীন্দ্রনাথের মতো উদার মানবিক বিশ্বকল্যাণে-সদা-বিশ্বাসী মানুষও ক্ষমা না করার কথা বলেছেন।

কবীর সুমনের গান দিয়েই শেষ করি: হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমায় আমায় অন্য গানের ভোরে।


আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন