বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তিন, সরাসরি হিজাব-বিতর্কের জেরে নয়, কিন্তু ভারতে ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী আস্ফালনের কারণে সম্প্রতি মুর্শিদাবাদে প্রকাশ্যে কুচকাওয়াজ করেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশের মদদপুষ্ট একটি রাজনৈতিক দল পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া (পিএফআই)। রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে কেরালাসহ একাধিক রাজ্যের সরকার পিএফআইয়ের বিরুদ্ধে অতীতে অভিযোগ দায়ের করেছে। পিএফআই সব সময়ই যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

স্বাভাবিকভাবেই, বিষয়টিকে ইস্যু হিসেবে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সহসভাপতি রথীন্দ্র বোস মুর্শিদাবাদের মিছিল নিয়ে বেশ কয়েকটি টুইট করেছেন। রাজ্যে বিজেপি একেবারেই দিশাহীন হয়ে পড়ায় তাঁর বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। এটাই পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।

গত বছরের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে কোনো ইস্যু নেই। সব নির্বাচনেই তৃণমূল ৮০-৯০ শতাংশের বেশি আসন পাচ্ছে। তৃণমূল বরং বেশি সময় দিচ্ছে দলীয় কোন্দল মেটাতে। কে দলের নেতা—দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) না ভাইপো (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়)? কারা বেশি শক্তিশালী—তৃণমূল ‘মাদার’ (পুরোনো তৃণমূল) নাকি তৃণমূল ‘যুব’ (অভিষেকের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল)? দলের ভেতরেই বা নেতারা কে কোন দিকে আছেন—মাদার না যুবতে? নির্বাচন কৌশলী প্রশান্ত কিশোরই–বা কার দিকে ঝুঁকে রয়েছেন? এসবই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বর্তমানে প্রশ্ন। বিজেপি বা সিপিএম কী করছে, সেদিকে তাকানোর সময় কারও নেই।

দুর্নীতির কারণে রোজ মানুষ ভুগছে। এ অবস্থায় শুরু হলো হিজাব-বিতর্ক। পাশাপাশি দ্রুত আইনশৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে মধ্য কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আনিস খান দুষ্কৃতীদের হাতে নিহত হয়েছেন এবং দক্ষিণ কলকাতায় একটি নামকরা ক্যাফেতে ক্যাফের মালকিনকে টাকা চেয়ে হুমকি দিয়েছে তৃণমূলের ওই অঞ্চলের নেতৃত্ব। এ ধরনের ঘটনা প্রায় রোজই ঘটছে, ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের।

এর একটা কারণও আছে। পশ্চিমবঙ্গে একটা বিরাট জনগোষ্ঠীর কোনো কাজকর্ম নেই। এর ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। সে কারণের মধ্যে আপাতত না ঢুকে বলা যেতে পারে, এই ছেলেমেয়েরা, বিশেষ করে যাঁরা নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন, তাঁরা একটা বিষয় বুঝে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গে কাজকর্ম যদি কিছু থাকে, তবে তা রয়েছে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে। এটা আগে সিপিআইএমের হাতে ছিল, এখন তৃণমূলের হাতে। কোনো শিক্ষিত বেকার অটোরিকশা চালাতে গেলে বা চিকেন-মাটন রোলের দোকান দিতে গেলে তৃণমূলের স্থানীয় নেতার অনুমতি লাগবে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় কাজের জায়গা বহুতল ভবন নির্মাণে বালু-সিমেন্ট-সুরকির জোগান দিতে গেলে তৃণমূলের নেতার সুপারিশ প্রয়োজন। সরকারি যে চাকরি, যেমন স্কুলশিক্ষক বা কনস্টেবলের চাকরি, তা পেতে কত অর্থ কোথায় দিতে হয়, সেই হিসাব পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুও জানে।

এসব দুর্নীতি মানুষ রোজ দেখছেন, ভুগছেন। বিরোধী দলের শক্তি ক্রমে কমার কারণে দুর্নীতি ইস্যু হচ্ছে না। কিন্তু বিরোধীরা শক্তিশালী হলেই স্থানীয় দুর্নীতি ইস্যু হবে। এ অবস্থায় শুরু হলো হিজাব-বিতর্ক। পাশাপাশি দ্রুত আইনশৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে মধ্য কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আনিস খান দুষ্কৃতীদের হাতে নিহত হয়েছেন এবং দক্ষিণ কলকাতায় একটি নামকরা ক্যাফেতে ক্যাফের মালকিনকে টাকা চেয়ে হুমকি দিয়েছে তৃণমূলের ওই অঞ্চলের নেতৃত্ব। এ ধরনের ঘটনা প্রায় রোজই ঘটছে, ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের।

অবস্থাটা কল্পনা করুন। একদিকে রোজ করোনা-জীর্ণ মানুষের সহ্যশক্তির সীমা পরীক্ষা করছেন তৃণমূলের নেতা–নেত্রীরা, আর অন্যদিকে পিএফআইয়ের মতো একটি সংগঠন রাস্তায় কুচকাওয়াজ করছে। আব্বাস সিদ্দিকি নতুন করে বক্তব্য দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, শেষ বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী দল ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

একটু গুছিয়ে নিতে পারলে মানুষের এই দৈনন্দিন ক্ষোভকে, বিজেপি যে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অনায়াসে চালিত করতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন, সেখানে কী অবস্থা হবে, তা অনুমেয়। আর বিজেপি যে মাসখানেকের মধ্যেই তাদের ঘর গুছিয়ে নেবে, তা নিয়ে সন্দেহ না রাখাই ভালো। বিজেপির অবস্থার অনেকটাই উন্নতি হবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশে নির্বাচনের ফলাফলের পর। এখন পর্যন্ত সেখানে বিজেপির জেতার সম্ভাবনাই বেশি। সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে নতুন উদ্যমে মাঠে নামবে বিজেপি, শুরু করবে সংখ্যালঘুবিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি।

গত বছরের নির্বাচনের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সময়কে কাজে লাগাতে পারতেন ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে প্রচার করে—পাল্টা রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে। তিনি করলেন না, ভবিষ্যতে হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে। বর্তমানের বিতর্ক সীমাবদ্ধ রইল অন্তর্দলীয় লড়াইয়ের মধ্যে। তবে শুধু মমতাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কোনো বামপন্থী দলও এই বিষয়ে বিশেষ কথা বলেনি।

তবে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের একটা কৃতিত্ব মমতাকে দিতেই হবে। কিছু কাজ তিনি করেছেন। যেমন ছাত্রছাত্রীদের কিছু বৃত্তি দেওয়া, মূলত ব্যক্তিগত অনুদানে চলা ‘মিশন’গুলোকে নানাভাবে উৎসাহিত করা, ছাত্রীদের কিছু সুবিধা পাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি। কলকাতা শহর সম্পর্কে গ্রামের মুসলমান সমাজের ভয় কিছুটা কেটেছে। তারা কিছু বেসরকারি ক্ষেত্রে যেমন ‘ফুড ডেলিভারি’ বা বৃহৎ বিপণিতে চাকরি পেয়েছেন। সরকারি চাকরিতেও মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকেই আজ মুসলমান সম্প্রদায়ের। এটাকে মমতার বিরোধীরা মুসলমান তোষণের রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বস্তুত হিন্দুত্ববাদীদের পাশাপাশি বামপন্থী এবং সুশীল সমাজের বড় অংশও একে ‘তোষণবাদের রাজনীতি’ বলেই চিহ্নিত করেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই প্রচার উদ্বিগ্ন করেছে। তাই তিনি চট করে মুসলমান সমাজের অনুষ্ঠানে আর যান না এবং দক্ষিণ কলকাতার ঘোর বিজেপিবিরোধী এলাকাতেও হিন্দুত্ববাদের প্রতীক বিশালকায় ভারতমাতা মন্দির গড়তে স্থানীয় নেতৃত্বকে অনুমতি দেন।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তিনটি ভোটের মধ্যে একটি মুসলমানের। এই সময়ে লোকসভা নির্বাচনের দুই বছর আগে শুরু হলো হিজাব-বিতর্ক। দুই বছর পর মুসলমান সমাজের ভোট চাই, ভোট চাই হিন্দুদেরও। পাশাপাশি আগামী মাস থেকে ২০২৪-এর লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গে ঘর গোছাতে শুরু করবে বিজেপি, আক্রমণ করবে পিএফআইয়ের মতো মুসলমান সমাজের রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিকে। কারণ, উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি লোকসভা আসন (৪২) রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।

জাতীয় স্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনেকটাই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের আসনসংখ্যার ওপর। এ অবস্থায় ভারতমাতা এবং হিজাব—এই দুয়ের মধ্যে সাম্য বজায় রেখে কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এগোন, সেটাই দেখার।

  • শুভজিৎ বাগচী প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন