বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর কয়েক মাস পর, ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফুলার রোডের বাসায় ফেরার পথে হুমায়ুন আজাদ জঙ্গি হামলার শিকার হন। বাংলাদেশে ভিন্নমতের কোনো লেখক কিংবা ব্যক্তিকে হত্যার উদ্দেশ্যে এ ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা হুমায়ুন আজাদকে দিয়েই শুরু। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, সেখান থেকে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা শেষে কয়েক মাস পর ফিরেছিলেন তাঁর প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, যে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সত্যিকারের মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাইতেন তিনি। তাঁর আক্রান্ত হওয়ার পর ‘মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও অগণতান্ত্রিক শক্তিবিরোধী হুমায়ুন আজাদ মঞ্চ’ গড়ে উঠেছিল। তাতে শিক্ষক, ছাত্র, ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীসহ বহু মত ও পথের লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের সবাই যে হুমায়ুন আজাদের মতের সঙ্গে একমত ছিলেন তেমনটা নয়, কিন্তু একজন লেখক, একজন অধ্যাপকের ওপর নৃশংস যে হামলা হয়েছে তার প্রতিবাদে সবাই একাট্টা হয়েছিলেন।

হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার যদি সময়মতো করার উদ্যোগ রাষ্ট্র নিত, তাহলে পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের যে বিস্তার হয়েছিল, সম্ভবত অনেকাংশেই তা রোধ করা সম্ভব হতো। একটা বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে দীর্ঘ মেয়াদে এর ফলাফল ভোগ করতে হয়েছে।

থাইল্যান্ড থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পর হুমায়ুন আজাদ অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এক সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে আন্দোলন, মিছিল, সভা, সমাবেশ করুক, সেটা তাঁর পছন্দনীয় ছিল না। কিন্তু তিনি আক্রান্ত হওয়ার পর যে অভূতপূর্ব প্রতিবাদ হয়েছিল, সেটাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে বাঁচে না, কিন্তু জীবনের প্রয়োজনেই আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়।’

আমাদের শিক্ষক হুমায়ুন আজাদকে আমরা জেদি, একরোখা ও দৃঢ়চেতা মানুষ হিসেবেই চিনতাম। জঙ্গিরা তাঁর ঘাড় ও মাথায় চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করেছিল। এই আঘাতের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তাঁর মুখ একদিকে বেঁকে গিয়েছিল। সেদিনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তাঁর কথাগুলোও জড়িয়ে আসছিল।

হয়তো দেশে থাকা আর নিরাপদ মনে করছিলেন না হুমায়ুন আজাদ। ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট স্কলারশিপ নিয়ে বার্লিন গেলেন। এর চার দিন পর তাঁর নিজের ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় তাঁকে পাওয়া যায়। জার্মানি থেকে পাঠানো হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুসনদ ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘অ্যানাটমিক্যালি মৃত্যুর যথেষ্ট কারণ পাওয়া না গেলেও টর্চারের (নির্যাতনের ফলে) কারণে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে, এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মারাত্মক জখমপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে এবং হাইপার টেনশনে তিনি মারা যান’ (হুমায়ুন আজাদ হত্যা: ৪ জঙ্গির ফাঁসির রায়, বিডিনিউজ ১৩ এপ্রিল ২০২২)।

১৮ বছর পর হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ অপেক্ষার রায়। হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হওয়ার পরদিনই তাঁর ভাই মঞ্জুর কবির হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। কিন্তু সেই মামলার তদন্ত ও বিচারে কেন এতগুলো বছর লেগে গেল?
প্রথমত, হুমায়ুন আজাদ যখন আক্রান্ত হয়েছিলেন, সে সময়ে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদের মতো জঙ্গিগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল (২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলার রায়ে বলা আছে)। হুমায়ুন আজাদ হত্যার মামলার রায়ে বলা হয়েছে, জঙ্গিসংগঠন জেএমবির দুই শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের নির্দেশে তাঁর ওপর হামলা হয়। ফলে এটা স্পষ্ট যে, হুমায়ুন আজাদের মামলার বিচারে সেই সময়ের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আন্তরিকতা দেখায়নি। দ্বিতীয়ত, হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার যে ধরন, সেটা যে জঙ্গি হামলা, তা খুব বেশি স্পষ্ট ছিল না। ২০১৩ সালের পর একের পর এক ভিন্নমতাবলম্বী লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, বাউল, বিদেশি নাগরিকদের একই কায়দায় হত্যা করার পর বিষয়টি সামনে আসে। তৃতীয়ত, হুমায়ুন আজাদ ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি, আমলাতন্ত্র কিংবা সামরিক শাসনের কঠোর সমালোচক। এ বিষয়ও তাঁর হত্যা মামলার বিচার শেষ হতে এত বছর লেগে যাওয়ার একটা কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার যদি সময়মতো করার উদ্যোগ রাষ্ট্র নিত, তাহলে পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের যে বিস্তার হয়েছিল, সম্ভবত অনেকাংশেই তা রোধ করা সম্ভব হতো। একটা বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে দীর্ঘ মেয়াদে এর ফলাফল ভোগ করতে হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সমালোচনা সাহিত্য, নারীবাদী সাহিত্য, কিশোরসাহিত্য লিখে গেছেন। ‘বুকপকেটে জোনাকি পোকা’, ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’, ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ বইগুলো বাংলা কিশোরসাহিত্যের অনবদ্য সৃষ্টি। তাঁর নারীবাদী ভাবনার বই ‘নারী’ নিষিদ্ধ হয়েছিল। ‘প্রবচনগুচ্ছ’-এর জন্য সব গোষ্ঠীর কাছেই বিরাগভাজন ছিলেন তিনি। প্রথাগত ধর্ম, গোঁড়ামি, যেকোনো ধরনের মৌলবাদ, পুরুষতন্ত্র ছিল তাঁর সমালোচনার ক্ষেত্র। তিনি লিখেই তাঁর চিন্তা প্রকাশ করে গেছেন। আরও অনেকের মতো তিনি সমাজে মুক্তচিন্তার ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এর সারসত্তা হচ্ছে প্রত্যেক মানুষকেই তার নিজের মত স্বাধীনভাবে চর্চার সুযোগ থাকতে হবে।

হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর তাঁর মেয়ে মেয়ে মৌলি আজাদ বলেছেন, অনেক বছর পর রায় হলো। আমরা চাই এ রায়ের বাস্তবায়ন হোক। উচ্চ আদালতে রায়টি যেন বহাল থাকে।

জঙ্গি হামলায় নিহত প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের হুমায়ুন আজাদের সহকর্মী ছিলেন তিনি। হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, ‘বিচারহীনতার দেশ বারবার করে বলার কারণে দেখা যাচ্ছে তিন থেকে চার বছর ধরে বিচার হচ্ছে, রায় হচ্ছে। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট হয়ে সেটা কার্যকর হতে অনেক সময় লেগে যায়। এই হলো বিচারের বাস্তবতা। হুমায়ুন আজাদের মতো কেউ সমর্থন করবে, কেউ বিরোধিতাও করতে পারে, সেগুলো লেখার মাধ্যমে করবে। হুমায়ুন আজাদ যেভাবে লিখেছেন, তার প্রতিবাদ কেউ করতে চাইলে একইভাবে করা উচিত। কিন্তু এর জন্য যারা মানুষকে হত্যা করে, তারা জঘন্য রকম অপরাধ করে। আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হওয়া ও বিচার করা কর্তব্য’ (তথ্যসূত্র: চ্যানেল ২৪)।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলছি, হুমায়ুন আজাদের চিন্তা কারও পছন্দ নাও হতে পারে। সে জন্য হাজার পৃষ্ঠা লেখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ভিন্নমতের হওয়ার কারণে লেখককে কেন হত্যার শিকার হতে হবে? আবার সেই মামলার বিচার হতেই কেন এত বছর লেগে যাবে? বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় যে ক্ষতি আমাদের হয়েছে, সেটার মূল্যায়ন কি আমরা করতে পারছি?

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন