
এবারের বইমেলায় গিয়ে দেখি আনন্দময় এক দৃশ্য। সেই দৃশ্য কেন আনন্দময়, তা বলতে হলে পেছনের কথা বলতে হবে। নব্বই দশকের শুরুর দিকের বইমেলার কথা স্মরণ করতে হবে। বইমেলায় আমার নিয়মিত যাত্রার শুরু সে সময়েই। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় চাকরি করি তখন। বিচিত্রার ঈদসংখ্যার উপন্যাসগুলোই সে সময়ে বইমেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠত। বিচিত্রাতেই তখন সবচেয়ে বিশদভাবে বইমেলার সংবাদ থাকত। কাজেই বইমেলায় না গেলে কি চলে!
বইমেলায় যাই আর দেখি, কোনো না কোনো স্টলের সামনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের ভিড়। কারণ বুঝতে সেই ভিড় ঠেলে এগোতে হয় না। স্টলের সামনে জটলার একটাই কারণ—হুমায়ূন আহমেদ। তিনি ছিলেন হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালার মতো একজন মানুষ। তাঁর বাঁশি ছিল না, কিন্তু ছিল বাঁশির সুরের চেয়েও সুন্দর সব উপন্যাস।
তখনকার সময়ে উল্লেখযোগ্য আরও অনেক লেখক ছিলেন। তাঁরাও বইমেলায় আসতেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের তুলনায় তাঁদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল খুবই নগণ্য। তাঁর প্রতি ঈর্ষাকাতর ও তাঁর কট্টর সমালোচক লেখকেরও অভাব ছিল না। কিন্তু বইমেলায় তখনই হুমায়ূন আহমেদের যেকোনো উপন্যাস বিক্রি হতো ১৫ থেকে ২০ হাজার কপি, (পরে একসময় তা ৪০ থেকে ৫০ হাজারে দাঁড়ায়) নিকটতমদের বড়জোর তিন-চার হাজার।
সেই হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন প্রায় চার বছর আগে। তবু তাঁর বই কেনার জন্য এখনো মানুষ ভিড় করে অন্যপ্রকাশ বা অন্য কোনো স্টলের সামনে। বইমেলায় এখন আর কারও স্টলের সামনে ভিড় হয় কি?
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে দুই যুগ সংসার করেছিলেন গুলতেকিন খান। তাঁকে মানুষ তখন চিনত গুলতেকিন আহমেদ নামে। হুমায়ূন আহমেদের লেখকজীবনের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল সময়ে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। এবারের বইমেলায় তাঁর নিজেরই বই বেরিয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি আমি আর আমার স্ত্রী শীলা আহমেদ বইমেলায় গিয়ে দেখি, একটি স্টলের সামনে মানুষ আর ক্যামেরার ভিড়। সেই ভিড় আড়াল করে সমানে অটোগ্রাফ দিয়ে চলেছেন একজন। তিনি সেই গুলতেকিন খান! তাম্রলিপির প্রকাশক জানালেন, দারুণ বিক্রি হচ্ছে। কবিতার বই, সেও প্রথম কবিতার বই, এ হিসেবে এটি অকল্পনীয়!
শীলাকে বললাম, সারা জীবন তো বাবার জনপ্রিয়তা দেখেছ। মায়ের জনপ্রিয়তা কেমন লাগছে, কবিকন্যা! সে মধুরভাবে হাসে। শীলা নিজে একসময় জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিল। অভিনয়জীবন বহু বছর আগে স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেওয়ার পর সে আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায়নি কখনো। নাছোড়বান্দা টেলিভিশন সাংবাদিকের সামনে শুধু মায়ের বইয়ের পাঠকপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে অবশেষে ক্যামেরার সামনে কথা বলে সে এত দিনে।
২.
মেলায় ঘুরে ঘুরে দেখা গেল বই কেনার আরও ছোট ছোট জটলা। আমি নিজে নব্বই দশকের শুরুতে উপন্যাস লিখতাম। বিনয়ের সঙ্গেই বলি, এর মধ্যে নিষিদ্ধ কয়েকজন, ছোঁয়া, ক্যাম্পাসের যুবক-এর মতো কিছু বইয়ের একাধিক সংস্করণ বইমেলার মধ্যেই শেষ হয়েছিল। এবার সেই ধরনের কিছু জনপ্রিয় উপন্যাসের সংকলন বের করেছে প্রকাশনী সংস্থা অনন্যা। অনন্যার বিশাল স্টলে গিয়ে দেখা গেল স্টলের বাইরে পাঠক আর ভেতরে লেখকের ভিড়। অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক খুবই খুশি। বইমেলায় বই বিক্রির অবস্থা ভালো।
মনিরুল হকসহ আরও কয়েকজন প্রকাশক আমার বহুদিনের পরিচিত। তাঁরা আশঙ্কা করতেন, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর একটি খুবই খারাপ প্রভাব পড়বে বাংলা সাহিত্যের বাজারে, এমনকি বইমেলার ওপর। কিন্তু তা পড়েনি। এরও একটি বড় কারণ প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদই। এখনো তাঁর পুরোনো বই কেনার জন্য ভিড় জমে যায় কিছু স্টলে। প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে যে আগ্রহ তিনি সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন পাঠকের মনে, এর জোরে আর ভাষার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সহজাত ভালোবাসার কারণে বইমেলার আবেদন কোনো দিনও ম্লান হবে না বাংলাদেশে।
আমার আশঙ্কা ছিল ফেসবুকের প্রভাব নিয়েও। ফেসবুকে কিছু লিখতে সম্পাদক লাগে না, প্রকাশক লাগে না, টাকাপয়সাও খরচ হয় না। সেখানে দুই লাইনের একটি মন্তব্য লিখলে পাওয়া যায় হাজার হাজার লাইক। বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য লিখলেও দেখা যায় মানুষের ব্যাপক আগ্রহ। ফেসবুক প্রজন্মের অনেকে আবার চার-পাঁচ লাইনের বেশি পড়তে অভ্যস্ত নয়। এই প্রজন্মের কাছে বই পড়া আর বই লেখার আবেদন থাকবে কি সেভাবে?
বইমেলায় ঘুরে ঘুরে মনে হলো, এই আশঙ্কাও সম্পূর্ণ ভুল। বই কেনার মতো বই লেখাতেও মানুষের (বিশেষ করে তরুণদের) আগ্রহ এতটুকুও কমেনি। এর মধ্যে কোনগুলো মানসম্মত, কোনগুলো ‘আগাছা’—এই বিচার অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু আমি মনে করি, যত সাধারণ মানেরই হোক না কেন, প্রতিটি বই প্রকাশই অত্যন্ত মূল্যবান ও আনন্দজনক ঘটনা। প্রতিটি বই সামান্য হলেও সমৃদ্ধ করে আমাদের, আনন্দিত করে সামান্য হলেও কিছু মানুষকে।
৩.
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গ। আমরা জানি, একুশের বইমেলার কলেবর দিনে দিনে আরও বড় হয়েছে। বাংলা একাডেমি থেকে এখন তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকা আর টিভিতে বইমেলা প্রধান সংবাদ হচ্ছে, প্রতিদিন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হচ্ছে, বইয়ের বিজ্ঞাপন ও রঙে ঢেকে যাচ্ছে অসুস্থ খবরের বিষাদ। বাংলা ভাষা আর সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এর অবদান অতুলনীয়। মধ্যবিত্ত আর নব্য ধনিকশ্রেণির ওপর সারাটা বছর ধরে আকাশ সংস্কৃতি আর ভিনদেশি ভাষার আধিপত্য নিয়ে আমাদের দুর্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বইমেলার সময় এলে, বইমেলা এলে সেই দুর্ভাবনা ফিকে হয়ে আসে সাময়িকভাবে হলেও।
তবে তাই বলে এই দুর্ভাবনা অমূলক নয়, অপ্রাসঙ্গিকও নয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার রাজনীতি সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র পাণ্ডিত্য নেই। তবু এটুকু তো আমরা সবাই বুঝি যে বইমেলা শুধু বাংলা ভাষায় বই প্রকাশের অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলাকে প্রাণের ভাষা হিসেবে উদ্যাপন, বাংলাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় ধারণ ও প্রকাশ করার এক স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজনও। ফেব্রুয়ারির বইমেলা আমাদের অনিবার্যভাবে নিয়ে যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় স্মৃতিচারণায়। বাংলাকে তখন শুধু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিতই করা হয়নি, ধর্মসর্বস্ব এক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ থেকে মুক্ত করা হয়েছিল এই অঞ্চলের মানুষের মনোজগৎকে।
আমরা তাই জানি যে নিজ ভাষা মানে শুধু স্বাতন্ত্র্য নয়, এর মানে স্বাধীনতা, জাতিসত্তা, আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মপরিচয়। নিজ ভাষাকে জীবনযাপনে, আচার-অনুষ্ঠানে আর সব সামাজিকতায় তাই আত্মস্থ করতে হয়। কিন্তু আমরা কি আসলেই তা পারছি আর? বইমেলার এক মাস আমাদের নিজ ভাষার সবচেয়ে শৈল্পিক প্রকাশ আর সৃজনশীল আত্মপরিচয়ের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু ভাষাভিত্তিক এই সংস্কৃতিবোধ বারো মাসের আকাশ সংস্কৃতির দাপটে কি কিছুটা হলেও হুমকিতে পড়েনি? আমাদের একদল শিশু কি বাংলার শেখার আগে কিংবা বাংলার চেয়ে ভালো করে বলতে শিখছে না হিন্দি কিংবা ইংরেজি? পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে লড়াই করে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার সময় আমরা কি এমন একটি সময়ের প্রত্যাশা করেছিলাম?
এটি অবশ্যই মানি যে নিজের প্রয়োজনে বা শখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্য ভাষা শেখা কোনো আপত্তির বিষয় নয়। কিন্তু তা যদি হয় আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাধ্য হয়ে বা নিজের অজান্তে, তাহলে তা স্বস্তিকর হতে পারে না। উন্নত বিশ্বে বা আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় অন্য ভাষা শিক্ষা হয় মূলত জ্ঞানচর্চা বা জীবিকার প্রয়োজনে। ঠিক সে ধরনের সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে আমরা যেকোনো ভাষা শিখতে পারি। কিন্তু আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে কি তা হচ্ছে?
অন্য ভাষা যখন প্রাত্যহিক জীবনযাপন আর সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের রিংটোনে প্রবেশ করে, তখন নিজস্ব সংস্কৃতি, স্বাতন্ত্র্যবোধ আর আত্মমর্যাদাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়ে গেলে ভিনদেশি ভাষা-সংস্কৃতির হাত ধরে আসে ভিনদেশি পণ্য, এমনকি ভিনদেশি রাজনীতির আধিপত্য। বইমেলার এক মাসের আয়োজনে বা এর পরে কোনো সময়েও কি আমরা কখনো ভেবে দেখছি তা?
বইমেলা শেষ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মুক্তি আর স্বাধীনতার লড়াইয়ের চেতনার তো কোনো শেষ নেই। এই চেতনা শুদ্ধ থাকলে শুধু বইমেলার এক মাস না, সারা বছরই থাকার কথা নিজ ভাষা, সংস্কৃতি আর স্বাধীন সত্তার জয়গান। তা-ই যেন থাকে সর্বক্ষেত্রে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।