নিম্ন মজুরি ও খারাপ কর্মপরিবেশের জন্য ঘরে-বাইরে অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান উপেক্ষা করার বিষয় নয়। আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সফলতা অনেকাংশে এ খাতের ওপর নির্ভর করবে। সম্প্রতি এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতের মোট রপ্তানি আয়কে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এ লক্ষ্য খুব বেশি অভিলাষী না হলেও এর অর্জন নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর। 
গত অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। সুতরাং ২০২১ সালের মধ্যে, অর্থাৎ সাত বছরের মধ্যে, এ আয়কে দ্বিগুণ করতে হলে অঙ্কের হিসাবে প্রতিবছর এই আয় প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। এর ফলে বর্তমানের ২৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। কিন্তু এ সাধারণ অঙ্কের পেছনে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল অঙ্কের হিসাব আছে। সেই অঙ্কগুলো মিললেই কেবল বিজিএমইএর আশাবাদ অনুযায়ী তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ২৫ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।
গোড়াতেই আলোকপাত করা যাক তৈরি পোশাক খাত থেকে অর্জিত আয়ের প্রবৃদ্ধির উৎস কী কী এবং সেগুলোর তুলনামূলক সক্ষমতা। শুধু তৈরি পোশাক নয়, যেকোনো রপ্তানিমুখী খাতের প্রবৃদ্ধির উৎস চারটি। যথা: ১. বিদ্যমান বাজারে বিদ্যমান পণ্যের বর্ধিত হারে রপ্তানি, ২. বিদ্যমান বাজারে নতুন ধরনের পণ্যের রপ্তানি, ৩. নতুন বাজারে বিদ্যমান পণ্যের রপ্তানি ও ৪. নতুন বাজারে নতুন পণ্যের রপ্তানি। অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য তৈরি পোশাক খাতের সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো ও মানবসম্পদের আলোকে এ চারটি উৎসের তুলনামূলক ক্ষমতা ও সম্ভাবনা সম্পের্ক একটি ধারণা থাকা দরকার।
তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাজার হচ্ছে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশ। যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, স্পেন, ইতালি ইত্যাদি। এসব বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশ কতটা বেশি হারে বর্তমানে রপ্তানি করা পণ্য রপ্তানি করতে পারবে, সেটা মূলত নির্ভর করে ওসব দেশে কী হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কী হারে ওই সব দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি করা তৈরি পোশাকশিল্পের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতির পরিভাষায়, আমেরিকা বা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ কতটা অধিক হারে বর্তমানে রপ্তানি করা পোশাক রপ্তানি করতে পারবে, সেটা নির্ভর করে ওই সব দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশি পণ্যের আয়-স্থিতিস্থাপকতার ওপর।
পুরো ইউরোপ ও আমেরিকায় জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেশ কিছু উত্থান-পতন লক্ষ করা গেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। তার পরেও প্রতি দশকের গড় হিসাবে আমেরিকা ও ইউরোপের প্রবৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ২ শতাংশ। এসব দেশে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কী হারে আমাদের দেশে উৎপাদিত পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, সে বিষয়ে খুব বেশি গবেষণা বাংলাদেশে হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা যায়, ইউরোপের প্রধান প্রধান দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদার আয়-স্থিতিস্থাপকতা ২ শতাংশের মতো। এর অর্থ হলো ওসব দেশে আয় ১ শতাংশ বাড়ার ফলে সেখানে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাড়ে ২ শতাংশের মতো। তার মানে দাঁড়ায়, বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয় রেখে ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানি ৪-৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো দুরূহ হবে। অবশ্য এসব দেশে বিশ্বের এক নম্বর তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক চীনের রপ্তানি কমার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আরেকটু বেশি হারেও বাড়তে পারে। কিন্তু এভাবে অন্য দেশের অনিচ্ছাকৃত বদান্যতার ওপর নির্ভর করে আরেকটি দেশের জাতীয় লক্ষ্য পূরণ হতে পারে না।
যদিও আমেরিকায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদার আয়-স্থিতিস্থাপকতা কত, সে বিষয়ে কোনো গবেষণালব্ধ তথ্য নেই, তা ইউরোপের চেয়ে বেশি না হয়ে বরং কম হওয়াটাই যৌক্তিক। কারণ, আমেরিকা বাংলাদেশি পোশাকশিল্পের ওপর আরোপিত শুল্ক অক্ষুণ্ন রাখলেও তারা ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিযোগী দেশসমূহের ওপর থেকে তা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের একটি অসম ও প্রতিকূল প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এককথায় আমেরিকায় বর্তমানে রপ্তানি করা তৈরি পোশাকের রপ্তানি সামনের দিনগুলোতে খুব বেশি উচ্চহারে বাড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি একটা নেই।
তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয়কে দ্বিগুণ করার জন্য প্রয়োজনীর প্রবৃদ্ধি অনিবার্যভাবেই পণ্য এবং বাজারের বহুমুখীকরণের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, তা মূলত খুব সাদাসিধে ধরনের, যা তৈরির জন্য খুব বেশি মাত্রার দক্ষতা লাগে না। বিশেষজ্ঞরা কারিগরি দক্ষতার ভিত্তিতে বিভিন্ন তৈরি পোশাককে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেন, যা ‘ফ্যাশন পিরামিড’ নামে পরিচিত। এই ফ্যাশনের প্রথম ধাপ হলো ‘বেসিক গার্মেন্টস’। পরবর্তী ধাপসমূহ হচ্ছে মিড-ভ্যালু গার্মেন্টস, ফ্যাশন বেসিকস, বেটার ফ্যাশন ও সবশেষে ডিজাইনার ফ্যাশন। বাংলাদেশ মূলত বেসিক গার্মেন্টস উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। এ ধরনের পণ্যের চাহিদা ও মূল্য বাড়ে খুব ধীরগতিতে। তাই এ ধরনের পণ্যের রপ্তানি আয় বাড়াতে হয় রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে। কিন্তু শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে সাত বছর ধরে ক্রমাগত সাড়ে ১০ শতাংশ হারে রপ্তানি আয় বাড়ানো খুবই কঠিন একটি কাজ।
বাংলাদেশকে অবশ্যই ফ্যাশন পিরামিডের পরবর্তী ধাপ, তথা মিড-ভ্যালু গার্মেন্টস ও ফ্যাশন বেসিকস পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে হবে। তাহলেই এ খাতের মোট রপ্তানি আয় ২০২১ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। কিন্তু বেসিক গার্মেন্টস থেকে মিড-ভ্যালু বা ফ্যাশন বেসিকস উৎপাদনের কাজটি মোটেও সহজ নয়। এ নতুন ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য যে ধরনের দক্ষ শ্রমিক দরকার, বর্তমানে বাংলাদেশে তার বড় অভাব। এমনকি সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বেসিক গার্মেন্টস তৈরির ক্ষেত্রেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শ্রমিকের ঘাটতির মোকাবিলা করছে। এ ঘাটতিকে জিইয়ে রাখলে একসময় বেসিক গার্মেন্টস উৎপাদনই হুমকির মুখে পড়বে আর নতুন ধরনের পণ্য উৎপাদন তো অনেক দূরের কথা। দক্ষ শ্রমিকের সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত কোনোভাবেই মিড-ভ্যালু ও ফ্যাশন বেসিকস উৎপাদন করতে পারবে না। শুধু দক্ষ শ্রমিকের অভাবই নয়, পোশাকশিল্পে নিয়োজিত ফ্যাক্টরিসমূহের বর্তমান ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের সামগ্রিক দুরবস্থা তৈরি পোশাক খাতে পণ্যের বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দেখা দিতে পারে। আর এর ফলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন তৈরি পোশাক রপ্তানির অভীষ্ট লক্ষ্যও পূরণ হবে না।
তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির আরেকটি সম্ভাব্য উৎস হচ্ছে বাজারের বহুমুখীকরণ। বাংলাদেশের পোশাক খাত খুব বেশি মাত্রায় উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিমের পাশাপাশি পূর্বেও পোশাকশিল্পের একটি বাজার রয়েছে, যা বাংলাদেশ তেমন কাজে লাগায়নি। জিডিপির হিসাবে বিশ্বের প্রধান তিনটি অর্থনীতির দুটি চীন ও জাপান পূর্বে অবস্থিত। জাপানে রয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকের বাজার, যা বছর তিনেক আগেও চীনের একক দখলে ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর জাপান চীনের ওপর তার নির্ভরতা কমানোর নীতি গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জন্য এক সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহারের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে বাংলাদেশ তার পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে পারবে কি না। জাপানের পাশাপাশি চীন ও ভারতেও তৈরি পোশাক রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে আছে পোশাকশিল্পের উদীয়মান বাজার। সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি আছে মুসলিম ফ্যাশনের এক বিশেষায়িত বাজার, যা অনেকটাই ভারতীয়দের দখলে। এসব নতুন বাজারে প্রবেশ করা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে শুধু বর্তমানে উৎপাদিত পণ্য আর বাজারের ওপর নির্ভর করলে ২০২১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ বিলিয়ন করা বেশ কঠিন হবে।
আবুল বাসার: গবেষক বিআইডিএস, সাবেক অর্থনীতিবিদ বিশ্বব্যাংক, সাবেক শিক্ষক উইলামেট বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকা।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন