default-image

পশ্চিমবঙ্গে সর্বশেষ যে নির্বাচন হয়েছে সেটা ছিল লোকসভা নির্বাচন। লোকসভার আসন এই রাজ্যে ৪২টি। এর মধ্যে ২০১৯-এর সাধারণ নির্বাচনে তৃণমূল পায় ২২টি, বিজেপি পায় ১৮টি, কংগ্রেস পায় ২টি আসন। এই দেখে সাধারণভাবে মনে হতে পারে তৃণমূল এগিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আগের লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে এই নির্বাচনে বিজেপি আসন বাড়িয়েছিল ১৬টি, তৃণমূলের আসন কমেছিল ১২টি। পাঁচ বছর আগের তুলনায় কংগ্রেস ও বামদেরও আসন কমেছে এই নির্বাচনে। ২০১৯-এর এই প্রবণতা এবারও বিজেপির আসন বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। যদিও এবার হচ্ছে বিধানসভার নির্বাচন।
যেকোনো স্থানে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে একই ভোটারদের পছন্দে রকমফের থাকতে পারে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি আগের নির্বাচনের চেয়ে ভালো করেছিল বলেই বিধানসভার ভোটেও তারা ভালো করবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় আসন ২৯৪টি। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে সর্বশেষ বিধানসভা ভোট হয়। তাতে তৃণমূল পায় ২১১টি আসন। বিজেপি পায় মাত্র ৩টি আসন। কংগ্রেস ও সিপিএম পেয়েছিল যথাক্রমে ৪৪ ও ২৬টি আসন। ২০১৬ সালে তৃণমূল পূর্বের বিধানসভার চেয়ে নিজের আসন ২৭টি বাড়াতে পেরেছিল। বিজেপি শূন্য থেকে ৩-এ পৌঁছায়।

ভোটের হিস্যায় অপ্রতিরোধ্য বিজেপি
ওপরে পশ্চিমবঙ্গের সর্বশেষ দুটি নির্বাচনের ফল পৃথকভাবে বিবেচনা করলে সেখানে কোনো একক বার্তা পাওয়া যায় না। তবে যৌথভাবে গত দশকের কয়েকটি নির্বাচনের ময়নাতদন্ত করলে অনেক স্পষ্ট দিকনির্দেশনা মেলে।
যেমন ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ভোট পায় ৪ শতাংশ, ২০১৬ সালের বিধানসভায় পায় ১০ শতাংশ, আর ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে পায় ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের ভোট হিস্যায় এই দলের তুমুল এক উল্লম্ফন ঘটে গেছে মাত্র এক দশকে।

অন্যদিকে তৃণমূল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পায় ৩৯ ভাগের মতো, ২০১৬ সালে ৪৫ ভাগের মতো এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ এই দলেরও ভোট কমছে না। বিজেপির ভোট প্রায় ১০ গুণ বাড়লেও তারা মমতার দলের ভোট কমাতে পারেনি। যদিও লোকসভা-আসন কমিয়েছে। বিজেপি ভোট পাচ্ছে কংগ্রেস ও বামদলগুলোর পুরোনো সমর্থকদের আর আসন পাচ্ছে (অন্তত লোকসভার হিসাবে) তৃণমূলের।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হলো, বিজেপির ভোট বাড়ার এই ধারা যদি আগামী বিধানসভা নির্বাচনেও বহাল থাকে তাহলে তৃণমূলের আসন কমবে কি না। অর্থাৎ তৃণমূল ক্ষমতা হারাতে পারে কি না। পরিসংখ্যান কী ইঙ্গিত দেয়?

ভারতীয় বার্তা সংস্থা এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে যে ফল করেছে সেই প্রবণতা চালু থাকলে বিধানসভায় তার আসন এবার প্রায় সোয়া শ দাঁড়াবে। আর ওই একই নির্বাচনে তৃণমূল যে হারে ভোট পেয়েছে সে ধারা বজায় থাকলে বিধানসভায় তাদের আসন প্রায় ৫০টি কমে ১৬০টির কাছাকাছি হওয়ার কথা। একই বিশ্লেষণে বাম-কংগ্রেস জোটের ফলাফলও অতীতের চেয়ে খারাপ হওয়ার লক্ষণ মেলে। অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে তৃণমূল-বিজেপি হাড্ডাহাড্ডি মোকাবিলার ইঙ্গিত দেয় ২০১৯-এর ফল।

এদিকে ওই নির্বাচনের পরও অনেক অঘটন ঘটে গেছে পশ্চিমবঙ্গে। বিশেষ করে তৃণমূলের অনেক নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন এবং জার্সি বদল থামছেই না। মনে হচ্ছে অমিত শাহ আরও চমক দেখাবেন। এসব নিশ্চিতভাবে বিজেপির শক্তি বাড়ার বার্তা দেয়। আমরা আবারও স্মরণ করতে পারি, ২০১৯-এ ভোটের হিস্যায় বিজেপি তৃণমূল থেকে মাত্র ৩ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। দল হিসেবে তার প্রতি এর আগের কয়েক বছর পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে সুনামির মতো জনসমর্থন বাড়ছিল, সেই প্রবণতা চালু থাকলে সর্বশেষ দুই বছরে তার ভোট আরও বাড়ার কথা। ঠিক এ কারণেই বিজেপির পক্ষে বাজি বাড়ছে।

মাত্র ২ ভাগ ভোট বাড়লেই বিজেপির স্বপ্ন পূরণ
আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, তৃণমূল গত এক দশকে তার ভোট-হিস্যা ধরে রেখেছে এবং বাম ও কংগ্রেসের ভোট-হিস্যা চরমভাবে কমে গেছে। খুব সহজেই বোঝা যায়, বিজেপির আজকের ভোট মূলত বাম ও কংগ্রেসের অতীত সমর্থকদের ভোট। পরিসংখ্যান চিত্রও এই মত সমর্থন করে। গত তিনটি নির্বাচনে প্রধান বামপন্থী দল সিপিএমের ভোট-হিস্যা দেখতে পারি আমরা। ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তারা পায় পপুলার ভোটের ৩০ ভাগ। ২০১৬ সালে পায় ২০ ভাগ। আর ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে পায় ৬ ভাগ। একইভাবে কংগ্রেস এই তিন নির্বাচনে ভোট পায় যথাক্রমে ৯, ১২ এবং ৬ ভাগ। সর্বশেষ দশকে এই দুই দলের সম্মিলিত ভোট-হিস্যা প্রায় ২৭ ভাগ কমেছে। ওই ভোটাররা মূলত বিজেপিকে ভোট দিচ্ছেন এখন।

সিপিএম এবং কংগ্রেসের সম্মিলিত ভোট-হিস্যা সর্বশেষ দাঁড়িয়ে আছে ১০-১২ ভাগের মতো। এই হিস্যা খুব বেশি কমার আর সুযোগ নেই। একদম পোড় খাওয়া সমর্থক ছাড়া বাড়তি কোনো ভোট আর তাদের হাতে নেই। সুতরাং এই দুই দল থেকে ছুটে গিয়ে বিজেপির আর ভোট বাড়ার অবকাশ নেই। বরং এই দুই শক্তি যদি শক্তভাবে নির্বাচন করে এবং পুরোনো ভোট ফিরিয়ে আনতে চায়, সেটা বিজেপির বাক্স থেকেই যেতে পারে। এই অবস্থায় বিজেপিকে বাড়তি ভোট পেতে হলে তৃণমূলের ভোটই পেতে হবে। অথচ বিগত তিনটি নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটের হিস্যায় বড় ধস দেখা যায় না। তবে শুভেন্দু অধিকারীর মতো বড় বড় তৃণমূল সংগঠক এই মুহূর্তে দল ছাড়ছেন এবং বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। তাতে তৃণমূলের কিছু ভোট বিজেপি নতুন করে পেতেও পারে।

বিজ্ঞাপন

আসনের হিসাবে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটার বিশ্লেষণে এনডিটিভির সংগৃহীত উপাত্তে দেখা যায়:

ক. যদি ২০১৯-এর লোকসভার ভোটের হিস্যা এবারও বহাল থাকে তাহলে বিজেপি পেতে পারে ১২১টি আসন এবং তৃণমূল ১৬৪;
খ. যদি ২০১৯-এর চেয়ে বিজেপির ভোট-হিস্যা ১ শতাংশ বাড়ে তাহলে তার আসন দাঁড়াতে পারে ১৩৫ এবং তৃণমূলের ১৫০;
গ. যদি ২০১৯-এর চেয়ে বিজেপির ভোট-হিস্যা ২ শতাংশ বাড়ে তাহলে তাদের আসন দাঁড়াতে পারে ১৫৫ এবং তৃণমূলের ১৩০;
ঘ. বিপরীতে, যদি ২০১৯-এর চেয়ে বিজেপির ভোট ১ শতাংশ কমে তাহলে তারা পেতে পারে ১১০টি আসন, তৃণমূল ১৭৫;
ঙ. বিজেপির ভোট ২০১৯ থেকে ২ শতাংশ কমলে তারা পেতে পারে ৯৪টি আসন এবং তৃণমূল ১৯১।

অর্থাৎ ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে ২০১৯-এর ফলাফলের চেয়ে অন্তত ২ শতাংশ বেশি ভোট পেতে হবে। টিম-বিজেপি মনে করছে লক্ষ্য হিসেবে এটা বেশি কঠিন কিছু নয়।

আদৌ বিজেপির ভোট বাড়বে কি?
যদিও তথ্য-উপাত্ত বলছে, মাত্র ২ শতাংশ বাড়তি ভোটে বিজেপি বাংলা দখল করতে পারে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির জন্য খারাপ বার্তাও আছে। ২০১৯-এর পর ভারতজুড়ে যত বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে, তার কোনোটিতে বিজেপির ভোট বাড়েনি। সর্বশেষ বিহারে এ রকম নির্বাচন হলো। সেখানে বিজেপি জোটের আসন বাড়লেও ভোট-হিস্যা ১০ ভাগ কমেছে। এরও আগে দিল্লি, ঝাড়খন্ড, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র কোথাও বিধানসভা নির্বাচনে তারা লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ভোট বাড়াতে পারেনি। বরং এসব রাজ্যের সাম্প্রতিক ভোটে বিজেপির ভোট হিস্যা সর্বত্র কমেছে। এই কমার হারও বেশ বড়সড়। সব জায়গায় ডাবল ডিজিট হারে কমেছে। জাতীয় এই প্রবণতা কী পশ্চিমবঙ্গে থেমে যাবে?

লোকসভা নির্বাচনের চেয়ে বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে বিজেপির কম ভোট পাওয়ার ব্যাখ্যা হিসেবে দুটি কারণের কথা বলা হয়। জাতীয় পর্যায়ের ভোটের সময় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী নেতার চেয়ে (যেমন রাহুল গান্ধী) প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভোটাররা বেশি পছন্দ করলেও স্থানীয় নির্বাচনে সেটা করছে না। দ্বিতীয় কারণ, বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে ভোটারদের মধ্যে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ কাজ করছে, যা পশ্চিমবঙ্গেও প্রবলভাবে কাজ করতে পারে আসন্ন নির্বাচনে। সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি নিয়ে মিছিল করেন মমতা।

লোকসভা নির্বাচনে যে ভোটার জাতীয় নেতাদের দিকে অধিক মনোযোগী থাকেন, ওই একই ভোটার বিধানসভা নির্বাচনের সময় হাতের কাছের স্থানীয় নেতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অমিত শাহের চেয়ে মমতা এখানে এগিয়ে।
তবে তৃণমূলের জন্য পরিসংখ্যানের হিসাবের বাইরে একটা মাইনাস পয়েন্টও আছে। ১০ বছর হলো তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায়। ভোটাররা সচরাচর নতুন মুখ খোঁজেন!

আলতাফ পারভেজ গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন