৫০ বছরে বতসোয়ানা যা পারল, আমরা পারলাম না কেন?

১৯৬৬ সালে বতসোয়ানা যখন স্বাধীন হয়, তখন পুরো দেশে মাত্র ১২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ছিল। এখন তারা আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী দেশ
ছবি: রয়টার্স

রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ ৫০ বছর উদ্‌যাপন করছে। এটি অবশ্যই উদ্‌যাপন করার মতোই বিষয়। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অর্জন কতটুকু? প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাত্রাই–বা কেমন?

বাংলাদেশ যে সময়টায় স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এর ঠিক কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানাও স্বাধীন হয়। দেশটি ১৯৬৬ সালে যখন ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীন হয়, তখন পুরো দেশে মাত্র ১২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ছিল। সব মিলিয়ে গুনে গুনে শ’খানেক মানুষ হাইস্কুল পাস করা ছিল। এর মানে তখনকার সময়ে এক মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশে আর কেউ ছিল না, যাঁরা শিক্ষিত। পুরো পৃথিবীতে এই দেশটি ছিল দ্বিতীয় দরিদ্রতম রাষ্ট্র। মানুষজন খেতে পারত না। নানান রকম রোগে আক্রান্ত ছিল। শিশুমৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। যে দেশটি কিনা স্বাধীনতার সময় পৃথিবীর দ্বিতীয় দরিদ্রতম রাষ্ট্র ছিল, সেই দেশটিই মাত্র পাঁচ দশকে, অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আফ্রিকার ধনী রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে, সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশে পরিণত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্র থেকে কি করে তারা মাত্র ৫০ বছরে এতটা এগোতে পারল?

রাষ্ট্র পরিচালনা করার মতো কোনো জনবলও তাদের ছিল না। মোটে শ’খানেক মানুষ ছিল, যারা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছে। এর মাঝে মাত্র ২২ জন ছিল, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে। অন্যরা কেউ পড়াশোনাই জানে না! তাহলে কি করে সম্ভব হলো? কারণ, দেশটির তখনকার প্রেসিডেন্টের একটি সঠিক পরিকল্পনা ছিল। তিনি প্রথমেই চিন্তা করেছেন, তাঁদের সম্পদগুলো কী কী? তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন, বতসোয়ানায় হীরার খনি রয়েছে এবং পশু পালনের জন্য বতসোয়ানা বেশ ভালো। কিন্তু খনি থেকে হীরা উত্তোলন কী করে সম্ভব? দেশটির তো কোনো জনবলই নেই। কেউ যে পড়াশোনাই জানে না, নেই কোনো প্রযুক্তি!

তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুললেন। লোন নিয়ে নিজ দেশেই হীরা উত্তোলনের জন্য যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করলেন। এরপর শুরু হলো ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে হীরা এবং খনি বাণিজ্য। অবস্থা আরেকটু ভালো হওয়ার পর তিনি পশু সম্পদ এবং পশু পালনে মনোযোগী হলেন। এই খাতেও দেশটি ভালো করা শুরু করল। একই সঙ্গে তিনি দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজালেন। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে স্কুলে যেতে হবে। পড়াশোনা বিনা বেতনে। যে দেশে স্বাধীনতার সময় মাত্র শ’খানেক স্কুল পাস মানুষ ছিল; সে দেশে বর্তমানে ৯৫ ভাগ মানুষ শিক্ষিত। স্কুল পাস করে এরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খনি নিয়ে পড়াশোনা করে কিংবা পশু পালন নিয়ে। অর্থাৎ যে খাতে সহজে অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখা যায়। তাদের প্রেসিডেন্ট শুধু এসব করেই বসে থাকেননি। সঠিক রাজনৈতিকচর্চাও শুরু করেন। দেশটি পুরো মাত্রায় গণতান্ত্রিক। প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হয় সেখানে। দেশটিতে আজ পর্যন্ত কখনো কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা হয়নি। কখনোই কোনো সামরিক শাসক দেশটি দখল করেনি।

দেশটি যখন খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন আশপাশের দেশগুলো যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে চেষ্টা করেছে তাদের এগিয়ে যাওয়াকে রুখে দিতে। এখানে বলে রাখা ভালো, দেশটি কিন্তু ল্যান্ডলক বা ভূমিবেষ্টিত, অর্থাৎ কোনো সমুদ্রসীমা নেই।

একসময় দেশটির প্রেসিডেন্টকে নিয়ে নানান গল্প বানানো হয়েছিল আশপাশের দেশগুলো থেকে। কারণ, ওই সময়টায় বর্ণবাদ একটি বড় বিষয় ছিল। বতসোয়ানার তখনকার প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ছিলেন একজন সাদা চামড়ার ইংরেজ! এই নিয়ে বলা হতো, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ কী করে সাদা চামড়ার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র চালাচ্ছে। সে নিশ্চয় ইউরোপীয়দের দালাল!

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বতসোয়ানা আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ। আফ্রিকার সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ। পড়াশোনার মান খুবই ভালো। দেশটি জনগণ এখন জনসম্পদে পরিণত হয়েছে। এরপরও যে দেশটিতে সমস্যা নেই, এমন নয়। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশটিকে ঠিকই এগিয়ে নেবে।

এতেও তিনি থেমে যাননি। তিনি তাঁর মতো কাজ করে গেছেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন প্রতিবার। তাঁর মৃত্যুর পরও ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। কারণ, তাঁর গড়া দলটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে সঠিক পথে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বতসোয়ানা আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ। আফ্রিকার সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ। পড়াশোনার মান খুবই ভালো। দেশটি জনগণ এখন জনসম্পদে পরিণত হয়েছে। এরপরও যে দেশটিতে সমস্যা নেই, এমন নয়। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশটিকে ঠিকই এগিয়ে নেবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমি যখন বাংলাদেশের কথা ভাবি; তখন মনে হয় ঢাকা শহরের বস্তিতে থাকা শিশুটি কি স্কুলে যেতে পারবে? পারলে কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়তে পারবে? রিকশা চালায় যে, সে কি তাঁর পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছিল? কিংবা গ্রামে থাকা ছোট্ট মেয়েটি, সে কি তার মতো কোনো স্বপ্ন দেখতে পারে? আমাদের শিক্ষার মানই–বা কেমন? আমরা কি সঠিক শিক্ষা দিতে পারছি আমাদের জনগণকে? আমি আমার নিজের কথাই বলতে পারি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় আমাদের বলা হতো—অমুক প্রশ্নগুলো আগের বছর এসেছে, কিংবা তমুক অধ্যায় থেকে আগের বছর থেকে প্রশ্ন এসেছে, তাই সেগুলো বাদ দিয়ে পড়লেই চলবে এবং আমরা সেভাবেই পড়েছি। পরীক্ষায় প্রশ্নও এসেছে সেভাবে! অর্থাৎ অনেক কিছু না পড়েই আমরা স্কুল-কলেজ পাস করে ফেলেছি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরই–বা অবস্থা কেমন?

আমি ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করছি। কিছুদিন আগে দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে ই-মেইল করে লিখেছিলাম, পরের বার দেশে গেলে আমার ইচ্ছা আছে অতিথি বক্তা হিসেবে গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে একটি ক্লাস নেওয়ার। আপনি কি আপনার ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এমন একটি লেকচার কিংবা সেমিনারের আয়োজন করতে পারবেন? সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীরা জানতে পারবে আমরা ইউরোপে গবেষণাপদ্ধতি কীভাবে পড়াই।

আমি ই-মেইলের কোনো উত্তর পাইনি। শেষ পর্যন্ত ফোন করতে হয়েছে। অন্য পাশ থেকে অধ্যাপক মশাই বললেন, ‘আপনি তো এখনো অধ্যাপক হননি। আগে অধ্যাপক হোন। এখনো তো বয়স কম। এরপর দেখা যাবে!’ শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি। জগৎসেরা বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজে অতিথি বক্তা হিসেবে লেকচার বা সেমিনার দিতে গেলেও কখনো কেউ জিজ্ঞেস করেনি, আপনি কি অধ্যাপক নাকি প্রভাষক? তারা জানতে চায়, আমার গবেষণার বিষয় কি কিংবা কোন বিষয়ে পড়াতে চাইছি। আর বাংলাদেশে? পদ বা পদবিই হচ্ছে সব কথা! কারণ, আমাদের শিক্ষকেরা দিনরাত ব্যস্ত পদ-পদবি নিয়ে। শিক্ষা কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে, কিংবা শিক্ষা কীভাবে বাস্তবসম্মত গবেষণা উপযোগী হবে এ নিয়ে তাঁদের কোনো ভাবনা নেই। ওনারা স্রেফ নিজেদের পদ-পদবি নিয়ে আছেন।

বতসোয়ানার মতো একটি দেশ। যে দেশটি কিনা স্বাধীনতার সময় পৃথিবীর দুই নম্বর দরিদ্র দেশ ছিল। সেই দেশ ৫০ বছরে এসে শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনীতিতে এখন আফ্রিকা মহাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর আমরা স্রেফ উৎসব করছি, উদ্‌যাপন করছি। কিন্তু সত্যিকারে আমরা কতটুকু এগিয়েছি? এই প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে।
বতসোয়ানা কেন পেরেছে?

একজন লেকচারার কিংবা প্রভাষক অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতে পারবেন কিন্তু বাংলাদেশে গেলে তাঁকে হয়তো শুনতে হবে, আপনি তো এখনো অধ্যাপকই হননি! এসব ‘দেশি অধ্যাপকদের’ অনেকের আবার পিএইচডি ডিগ্রিও নেই। তাঁদের অনেকে আবার ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন লেকচারার কিংবা প্রভাষকের অধীন পিএইচডিও করতে আসেন! আর দেশে গিয়ে নিজেদের বিশাল অধ্যাপক মনে করেন! এই যখন আমাদের শিক্ষকদের মানসিকতা, তাহলে আমরা এগোব কী করে? যে দেশে শিক্ষকদের এই হাল, সেই দেশের শিক্ষার অবস্থা কী, সেটা তো খুব সহজেই অনুমান করা যায়। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এখন বোধ করি আমাদের প্রশ্ন করার সময় এসেছে—আমাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি কতটুকু।

বতসোয়ানার মতো একটি দেশ। যে দেশটি কিনা স্বাধীনতার সময় পৃথিবীর দুই নম্বর দরিদ্র দেশ ছিল। সেই দেশ ৫০ বছরে এসে শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনীতিতে এখন আফ্রিকা মহাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর আমরা স্রেফ উৎসব করছি, উদ্‌যাপন করছি। কিন্তু সত্যিকারে আমরা কতটুকু এগিয়েছি? এই প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে।
বতসোয়ানা কেন পেরেছে?

খুব সোজা— প্রথমত, তারা নিজেদের সম্পদগুলোকে সৃজনশীল উপায়ে কাজে লাগিয়েছে। দ্বিতীয়ত, তারা আইডিওলজিকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে প্র্যাকটিক্যালি কীভাবে কাজ করা যায়, সেটাকে গুরুত্ব দিয়েছে। তৃতীয়ত, তারা সাধারণ মানুষের অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সব শেষে নিজেদের জনগণকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছে। যারা নিজেরাই এখন দেশটাকে এগিয়ে নিচ্ছে।

এর ফলাফল কি হয়েছে জানেন? দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্টের দল স্বাধীনতার ৫০ বছরের এসেও কোনো নির্বাচনে হারেনি। সেই দলটিই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে এবং দেশটিতে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় প্রতিবারই। অর্থাৎ দেশের জনগণ সেই দলটিকেই বার বার বেছে নিচ্ছে; যারা তাদের অর্থাৎ জনগণের কথা চিন্তা করে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা ব্যস্ত পদ এবং পদবি নিয়ে! আমরা মানুষকে বিচার করি পদ-পদবি দিয়ে। তাদের মেধা কিংবা অভিজ্ঞতা দিয়ে নয়!

ড. আমিনুল ইসলাম সিনিয়র লেকচারার, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড ইনোভেশন বিভাগ, এস্তোনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি