নারী ধর্ষণ, সহিংসতা, নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের প্রতিবাদে কয়েক দিন ধরে যথার্থ কারণেই সারা দেশে আন্দোলন চলছে। নারীরা বছরের পর বছর এসব অপরাধের শিকার হয়ে এবং কোনো প্রতিকার বা বিচার না পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই ছিলেন ক্ষুব্ধ, রাগান্বিত, হতাশাগ্রস্ত ও আতঙ্কিত (ট্রমাটাইজড)। ফলে তাঁদের এবং তাঁদের সঙ্গে বহু পুরুষের দেশব্যাপী এই প্রতিবাদ ছিল প্রত্যাশিত।

প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়ে এর প্রতিকারের স্বাভাবিক দাবিই ছিল মৃত্যুদণ্ড। এই দাবির প্রতি আমাদের আছে সম্পূর্ণ সহানুভূতি। কিন্তু আমরা যারা আইন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি একটু করেছি, তারা জানি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭টি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে আরও একটি, অর্থাৎ ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যোগ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

বিচারের বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে শাস্তি যত কঠোর হয়, আসামি তত বেশি নির্দোষ প্রমাণিত হয়। বর্তমানে যাবজ্জীবনের পরিবর্তে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করলে ধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার ১ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। বিচারে কোনো আসামি দোষী প্রমাণিত হলে এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে এর বিরুদ্ধে আপিল যাবে হাইকোর্ট বিভাগে। হাইকোর্ট বিভাগ মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখলে আপিল যাবে আপিল বিভাগে। এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ফলে বিচার শেষ হতে কমপক্ষে ১২ বছর লাগবে। ফলে শাস্তির দৃষ্টান্তমূল্য ভীষণভাবে হ্রাস পাবে।

ইরান, সৌদি আরব, মিসর, ইরাক, বাহরাইন, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, এমনগুটিকয় দেশের কাতারে শামিল হবে বাংলাদেশ। সাতটি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারীর প্রতি সহিংসতা হ্রাস করা যাচ্ছে না। আরেকটা ধারায় মৃত্যুদণ্ড যোগ করে সমস্যার সমাধান হবে না। নারীদের নিরাপদ রাখার জন্য কী ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেটা খুঁজতে হবে অন্য জায়গায়। আইনের এই নতুন সংশোধনে সমাধানের জায়গা থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে দেবে। এতে দেশ পরিচালনাকারীদের উদ্দেশ্য হয়তো সফল হবে। অর্থাৎ প্রতিবাদের তীব্রতা সম্ভবত হ্রাস পাবে। কিন্তু নারীর নিরাপত্তাবোধ বা নিরাপদ থাকাটার ব্যাপারে কোনোই অগ্রগতি হবে না।

শাহদীন মালিক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন