default-image

প্রতিটি শিশুর কাছে বাবা বটবৃক্ষের মতো। শিশু যখন মায়ের শাসন–বারণে মনের সুপ্ত ইচ্ছাটা প্রকাশ করতে পারে না, অনেক সময় বাবার অপার স্নেহ সেই রুদ্ধ মনের দ্বার খুলে দেয়। বাবা পূরণ করেন তার নানা আবদার–বায়না। এতে শিশুর মুখে যে হাসিটি ফোটে, তা দেখে রাশি রাশি শুভ্র ফুল ফোটে বাবার বুকের ভেতর। সন্তানের কষ্ট মানেই বাবার বুকে নীল জখম। সন্তানের সুখে বাবার মনে অনাবিল আনন্দ। বাবার সঙ্গে সন্তানের এটাই তো চিরন্তন বন্ধন। কিন্তু বাস্তবতা অতি নির্মম। চারপাশে একের পর এক ঘটে যাচ্ছে মর্মবিদারী ঘটনা।

প্রথম আলোর টাটকা শিরোনাম—‘১৯ দিনের ছেলেকে চুবিয়ে হত্যার অভিযোগে বাবা আটক’। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ভাংনাহাটি গ্রামের খবর এটি। শনিবার রাতে শিশুটিকে নানার বাড়িতে বালতি থেকে মৃত উদ্ধার করা হয়। অভিযোগের তির বাবা বিজয়ের দিকে। বলা হচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত যৌতুক না পেয়ে যুবক বয়সী এই বাবা তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছেন। পুলিশের হাতে আটক বাবা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তদন্ত ও বিচারে বেরিয়ে আসবে আসল সত্য। তবু একজন বাবার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ কেমন লাগে?

নবজাতক শিশুপুত্রের প্রতি একজন যুবক বাবার থাকবে উথলে ওঠা আবেগ। হত্যার খবর নয়, শিশুর প্রতি বাবার অপত্য স্নেহ নিয়ে কাব্য লেখা হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিশোর কবি সুকান্ত তাঁর বিখ্যাত ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় লিখেছেন, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’। সে অঙ্গীকার কি তবে মিছে? কবিতায় লেখা—‘আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ’। সুনামগঞ্জেও এমন অভিযোগ উঠেছে আরেক বাবার বিরুদ্ধে। আশা করি, এসব যেন মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

চট্টগ্রামের রাউজানে সম্প্রতি আরেক বাবা তাঁর সাত বছরের শিশুপুত্র রাব্বিকে ৫২ হাজার টাকায় এক প্রবাসীর স্ত্রীর কাছে বিক্রি করে দেন। তিন মাস পর পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে। রাব্বি ফিরে যায় তার মায়ের বুকে। এখানে বাবা হাসান উল্লাহ যে অপকর্মটি করেছেন, তা হত্যার চেয়ে কম কী? আর কিছু না হলেও তিনি তাঁর পিতৃত্ব আর মানবতাকে হত্যা করেছেন।

জীবজগতে প্রতিটা প্রাণীরই নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। কিছু প্রাণী বাবা হিসেবে অতুলনীয়। যেমন রাজপেঙ্গুইন। অ্যান্টার্কটিকার বাসিন্দা এই পাখির বেলায় দেখা যায়, স্ত্রী পেঙ্গুইন একটি মাত্র ডিম পাড়ে। ওই ডিম পেড়েই সে খালাস। ডিম ফোটানো থেকে শুরু করে ছানা লালন-পালনের পুরো কাজ করে থাকে পুরুষটি। ডিমটাকে বাবা রাজপেঙ্গুইন দুই পায়ের পাতার ওপর তুলে পেটের পালক দিয়ে ঢেকে ওম দিতে থাকে। কষ্ট যতই হোক, পায়ের পাতা থেকে মুহূর্তের জন্য ডিম পড়তে দেয় না সে। কারণ, বরফের পরশ পাওয়ামাত্র ডিম জমে যাবে। ছানা আর ফুটবে না। রাজপেঙ্গুইন বাবা এভাবে টানা চার মাস এক ঠায় ডিম আগলে রেখে তা দেয়। এ সময় এক-আধটু বরফ ছাড়া আর কিছু খায় না সে। ছানা না ফোটা পর্যন্ত থাকে এভাবেই।

পাখির মধ্যে বাবা কিউইও দায়িত্ব পালনে বেশ সচেতন। ১০-১২টি ডিম পাড়ে মা কিউই। বাবা বসে যায় তা দিতে। ডিম ফুটতে মাস দুয়েক লাগে। এই দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকে বাবাটি। ডিমে শুধু চুপচাপ বসেই থাকে না বাবা। দিনে বেশ কয়েকবার প্রতিটা ডিম উল্টেপাল্টে দেয়, যাতে সবদিকে সমান তাপ লাগে। ডিম ফুটে ছানা বের হওয়ার পর বাবা কিউইয়ের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কমপক্ষে আরও ছয় মাস ছানাগুলোকে লালন-পালন করে সে।

আরেক দায়িত্বশীল বাবা সিহর্স। যাকে আমরা ঘোড়া মাছ বলি। স্ত্রী সিহর্স পুরুষ সিহর্সের বিশেষ থলেতে ডিম পেড়ে দায়মুক্ত হয়। তারপর সে ডিম ফোটানো আর পোনা লালন–পালন সবই পুরুষটির দায়িত্ব।

প্রাণীজগৎ হাতড়ালে এমন আরও অনেক বাবা পাওয়া যাবে, যাদের সর্বসেরা প্রাণী মানুষের মতো বিচার-বিবেচনা নেই, কিন্তু সহজাত বৈশিষ্ট্য দিয়ে ছানাপোনা লালন-পালনে জীবনটাকে তামা করে দেয়। শুধু এই মানবকুলে ব্যতিক্রম। বিশেষ করে সম্প্রতি চারপাশে যা ঘটতে শুরু করেছে, তা কল্পলোকের দেওদানোর কাণ্ডকারখানাকেও হার মানায়।

কয়েক দিন আগের ঘটনা। কক্সবাজার সদর উপজেলায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে মোজাম্মেল হক নামের এক ব্যক্তিকে। এই লোক সম্পর্কে ওই শিশুর চাচা। একটা শিশু যদি বাবা বা চাচার মতো পরম নির্ভরতার স্থান হারায়, তাহলে সে যাবে কোথায়? চলতি মাসেরই ঘটনা। ঢাকার ধামরাইয়ে চার শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে আফসার উদ্দিন নামের এক বয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন ঘটনা চারপাশে ভূরি ভূরি।

নতুন শিশুর ভবিষ্যতের পথ সুগম করতে বড়রা যদি জঞ্জাল না সরিয়ে নিজেরাই উটকো ঝঞ্ঝাট হয়ে বসেন, তাহলে তাদের বাসযোগ্য পৃথিবী হবে কী করে?

সম্প্রতি ‘পরিচিতদের হাতেই শিশু ধর্ষণ বেশি’ শীর্ষক একটা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতে। এতে দেশের ১১টি সরকারি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, পরিচিতদের দ্বারাই মূলত শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তুলনামূলকভাবে কম বয়সী শিশুরা প্রতিবেশীদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়।

এই যদি হয় পরিস্থিতি, তবে শিশুরা কার ছায়াতলে বড় হবে। কাকে আপন ভেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর পথ করে নেবে?

বিশ্বের অনেক দেশেই আবেগ-অনুভূতি, মানবতাবোধকে ঝালাই করতে আত্মোন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ডেনমার্কে সম্প্রতি স্কুলগুলোতে পাঠ্যসূচির মধ্যে সহমর্মিতা শেখানোর বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটিকে শিক্ষা কার্যক্রমের একটি মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনকার শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতাবোধ বাড়ানোর বিষয়টি জরুরি। তাই এ কার্যক্রম।

আমাদের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় মনে হচ্ছে, সহমর্মিতাবোধের বিষয়টি ছোটদের আগে বড়দের বাড়ানো দরকার। বাড়ানো বোধ হয় ভুল বলা হলো, বলা উচিত রীতিমতো জাগিয়ে তোলা আবশ্যক। কোনো কোনো ঘটনায় সহমর্মিতাবোধ তো বটেই, মানবতাবোধ ও মনুষ্যত্ব পর্যন্ত লুপ্ত। আর প্রশিক্ষণ বা তালিম দিয়ে কি মমত্ববোধ, সহমর্মিতাবোধ, মানবতাবোধ—এসব মানবিক গুণ শেখানো যায়? এসব তো অন্তরের বিষয়। এগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসারিত হয়। আর শিখতেই যদি হয়, তাহলে প্রশিক্ষণ কেন, এক কাকের কাছেই তো শেখা যায়। গাছের ডালে বাঁধা বাসা থেকে কখনো একটি কাকের ছানা নিচে পড়ে গেলে এলাকার তাবৎ কাক এসে কা কা করে যে মাতম তোলে, সহমর্মিতার উদাহরণ কি এর চেয়ে বড় হতে পারে?

ছোটবেলায় ইতিহাস বইয়ে পড়েছি অসুস্থ ছেলে হুমায়ুনের জন্য বাবা সম্রাট বাবরের ব্যাকুলতা। সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনে নিজের আয়ুর বিনিময়ে সন্তানের সুস্থতা কামনা করেছেন তিনি। আর কী আশ্চর্য, অসুস্থ হুমায়ুন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন, আর বাবা বাবর ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একসময় পৃথিবী থেকেই বিদায় নিলেন তিনি। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি। সন্তানের জন্য কল্যাণময় একজন বাবার এই শাশ্বত রূপটিই অটুট দেখতে চাই। চাই না একজন বাবার মধ্যে হিংস্র বাঘের রূপ, যে ক্ষুধা নিবারণে প্রয়োজনে শাবককে সাবাড় করতেও দ্বিধা করে না।

শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক ও সাহিত্যিক
shariful.bhuiyan@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0