default-image

ষাটের দশকে ময়মনসিংহে আমাদের ঘোরাঘুরিটা ছিল প্রবল। নুরুল আনোয়ার, কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রসংগীতচর্চা, আলোকময় নাহা—এসব তো বটেই; তারপর ময়মনসিংহ থেকে শ্যামগঞ্জ, বারহাট্টা (নির্মলেন্দু গুযণের বাড়ি) পর্যন্ত বৃত্তটা বড় হয়। নিজের শহর টাঙ্গাইলের চেয়ে ময়মনসিংহে যাতায়াতটা ছিল বেশি। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র তখনো কলস্বরা, রেলস্টেশন জমজমাট, অটোমোবাইল তখনো গ্রাস করেনি বাতাস। সে সময় একটু একটু করে ইথারে ভেসে আসার মতো যতীন সরকারের নাম শুনতাম। নামটি প্রবল হলো মুক্তিযুদ্ধের পরে।
সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীটি তখন বেশ শক্তিধর—আমাদের সপ্তাহান্তের আধুনিক সাহিত্যের তাজা খবর। সেই সঙ্গে চমৎকার সব লেখা। দৈনিক বাংলাও তখন দুর্বল নয়। সেই থেকে আমাদের উৎসাহ যতীন সরকারের লেখা, ব্যাখ্যা, সাহিত্যের-সমাজের খবরাখবর। তাও আবার একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যে দৃষ্টিভঙ্গি আমি নিজেও অর্জন করার চেষ্টা করছি। মাটিতে নাক দিয়ে থাকার মতো, মাটি শুকেই আবিষ্কার করি, প্রিয় লেখকদের কাছে যেতে পারি না। কারণ, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের মধ্যে একটা বড় বিভেদের দেয়াল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কেমন করে আমি যেন পিকিংপন্থীদের দলে চিহ্নিত হয়ে গেলাম। তাতে আমার জন্য মস্কোপন্থীদের সব দরজা বন্ধ। আসলে আমি যে সমভাবেই দুই পন্থীদের সমালোচনামুখর ছিলাম, তা বোঝাতে পারিনি। মস্কোর সমাজতান্ত্রিক চরম বিপর্যয়ের আগেই চীনে ধস নামল। দেং শিয়াও পিং ক্ষমতা গ্রহণের পর শেষ সম্ভাবনাটুকুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তথাকথিত আধুনিকায়নই সমাজতন্ত্রের সব সম্ভাবনাকে শেষ করে দেয়।
চীন-রাশিয়া—দুই জায়গাতেই সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের সব অপসংস্কৃতি বিরাজমান। জীবনের সুদীর্ঘ সময় ধরেই একই আদর্শের মানুষ হিসেবে একটা ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছি আমরা। সে যুদ্ধটা আজ নেই। নেই বলেই যতীন সরকার আমার কাছে শ্রীজ্ঞান। হয়তো আমার বন্ধু নির্মলেন্দু গুহণের মতো নয়। খুবই আগ্রহভরে ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজে অধ্যাপনারত একজন শিল্পীর লেখা পড়ি। তাঁর নির্মোহ পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হই। বাংলার সমাজের ভেতরকার অসাম্প্রদায়িক শক্তিতে কেমন করে ঘুণ ধরছে, কেমন করে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যায় চিহ্নিত হন, সেসব বোঝার চেষ্টা করি।
তাঁর আত্মজৈবনিক-দার্শনিক ভাষা পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন একেবারে চোখ খুলে দেওয়ার বই। বইটি পড়ার সময় বারবার পাবলো নেরুদার কথা মনে পড়ছিল। পাবলো নেরুদার অনুস্মৃতি পড়ে এ রকম অনুভূতিই হচ্ছিল। অবশ্য তাঁর সামনে ছিল সারা জগৎ, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ছায়াও ছিল। এখানে যতীন সরকার আছেন কিন্তু দর্শক (দার্শনিক) হিসেবে। নিজেকে খুব টানেননি। টেনেছেন তখনই, যখন তাঁর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটেছে।
যতীন সরকার কী করে এতটা নৈর্ব্যক্তিক থাকেন? শ্রেণিবিভক্ত একটা সমাজে তিনি একটা শ্রেণির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েই আছেন, তবু কী করে সেখানেও নির্মোহ? আমরা নাটক লিখতে গিয়ে যখন কোনো পক্ষে যাই, তখন তার মধ্যে কেমন যেন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়ি, নাট্যকারের নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলি, লেখাটি পুনরায় বিবেচনা না করা পর্যন্ত তা হয়ে পড়ে একেবারেই অর্ডিনারি। এ ভুল আমাদের পূর্বপুরুষেরাও করে গেছেন। তাতে নাটক হয়ে ওঠে কতগুলো যান্ত্রিক মানুষের যান্ত্রিক সংলাপ প্রক্ষেপণমাত্র। এভাবেই গণনাটকের রচয়িতা আর নির্দেশকেরা একটি শক্তিশালী মাধ্যমকে ধ্বংস করেছেন।
আমাদের দেশেও নানা কিছুর জোরে, তদবিরে, অশুভ আশীর্বাদে কোনো কোনো অর্ধশিক্ষিত অর্বাচীন নাটক লিখে এবং থিসিস লিখে রাতারাতি খ্যাতি অর্জন করার চেষ্টা করেছেন। বাম বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে সেসব নাটকের সপক্ষে কথা বলিয়েছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। দর্শক আনুকূল্য তো পায়ইনি বরং এসব বুদ্ধিজীবী ও নাট্যপণ্ডিতের ভূমিকাও কোনো কাজে লাগেনি।
যতীন সরকার এ ক্ষেত্রে একেবারেই গ্রাম্য, এসবের কোনো প্রচেষ্টা, ভাবনা, পরিকল্পনা তাঁর মাথায়ই নেই। জীবনে যখন যা ভেবেছেন তাই লিখেছেন। তাঁর লেখা দিয়ে তিনি পাঠককে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কখনো পেরেছেন, কখনো পারেননি। আবার পার্টিরও একটা নাড়ির গণ্ডি আছে। সে গণ্ডি অতিক্রম করলেও বিপদ। নানা বিপত্তি সেখানে। সব সময় নেতারা তেমন শিক্ষিত হন না। তারা লাল বইয়ে সীমাবদ্ধ রাখেন তাঁদের জ্ঞান। মার্ক্সীয় দর্শনের ভেতর ঢোকেন না, বিশ্বসাহিত্যের খোঁজখবর রাখেন না, তাঁরা অতি সরলীকরণে অভ্যস্ত। সেসব ‘বস’দের মনোরঞ্জন সব সময় সম্ভব হয় না। কিন্তু কেমন করে যেন তাঁরা ক্ষমতাবান হয়ে যান। সোভিয়েত ইউনিয়নে, চীনেও তাই হয়েছে। শিক্ষিত লোকেরা কোণঠাসা হয়ে গেছে। বাংলাদেশে তো হবেই। এই লোকগুলো কম পুঁজিতে বেশি ব্যবসা করতে অভ্যস্ত। জনবিচ্ছিন্ন এই নেতারা ঘরে বসে ব্যবসা করতে চান। তাই বাম পার্টিগুলোও সংকুচিত হতে হতে একেবারে ছোট হয়ে এসেছে। বিপুল-বিশাল সম্ভাবনা থেকে একেবারে ছোট।
যতীন সরকারকেও এসব প্রতিকূলতা দেখতে হয়েছে। কিন্তু তিনি নীতিচ্যুত হননি—অসাধারণ দৃঢ়তায় তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনীতিতে, সংস্কৃতিচর্চায়, লেখালেখিতে, শিক্ষকতায় এমন আদর্শনিষ্ঠ মানুষ এখন তেমন চোখে পড়ে না। সমকালীন বাংলাদেশে তাঁর মতো পড়াশোনা করা পাণ্ডিত্যসম্পন্ন লোক বিরল। সমাজতন্ত্রের প্রতি গভীর আস্থাবান যতীন সরকার যথার্থই ‘শ্রীজ্ঞান’। সব সমাজতান্ত্রিক দলের উচিত তার দেশের শ্রীজ্ঞানদের সুযোগ করে দেওয়া। তাঁদের ভাবনাকে আরও সহজ করে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। হয়তো মস্কোপন্থীদের মধ্যে এ বিষয়টি ছিল, তা না হলে সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তরা কীভাবে সামনে এলেন? যতীন সরকার তাঁদেরই যথার্থ উত্তরসূরি। ‘শ্রীজ্ঞান’দের ভাবনাটা সামনে নিয়ে আসা খুব জরুরি। তাঁর ৮০তম জন্মজয়ন্তীতে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন