বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনতিক সংকট নিয়ে আমরা যত কথা বলি, প্রবীণদের জীবন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ততটা বলি না। অথচ দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৫০ সালে প্রায় প্রতি পাঁচজন নাগরিকের একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। এখনো প্রবীণদের যত্নের বড় অংশ বহন করেন পরিবারের অবৈতনিক পরিচর্যাকারীরা।
পরিবার ছোট হওয়া, অভিবাসন ও নগরায়ণের মধ্যে এই ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
এই পরিবর্তনের একটি নিভৃত দিক হলো আমাদের বয়স্ক মায়েদের প্রতিদিনের জীবন। দেশের মোট বিবাহিত নারীদের প্রায় ৯.৫% হলেন বিধবা, যার সংখ্যা ৫২ লক্ষেরও বেশি। স্বামীকে হারানোর পর কিংবা চলাফেরা সীমিত হয়ে এলে তাঁদের পাশে কে থাকবেন?
প্রয়োজনের কথা কাকে বলবেন? ওষুধ ও খাবারের ব্যবস্থা হলেও নিজের পছন্দের কিছু চাওয়ার স্বস্তি কি থাকবে? প্রবীণদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় এসব ছোট প্রশ্ন সহজে জায়গা পায় না।
নিজের মায়ের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতে গিয়ে প্রশ্নগুলো নতুনভাবে বুঝছি। তাঁর পাশে থাকতে পারায় দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো সরাসরি জানতে পারি।
কোনো ইচ্ছা হলে তিনি আমাকে ডেকে বলতে পারেন। তাঁর কথায় দিনের আয়োজন বদলাতে পারে। অনেক প্রবীণ মানুষের জীবনে নিয়মিত সহায়তার এমন মানুষও থাকেন না।
এক সকালে আম্মা ডেকে বললেন, তাঁর হাড়ের স্যুপ খেতে ইচ্ছা করছে।
শুনেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। তখন তিনিই আমাদের জন্য পায়া রান্না করতেন। ঝোলের স্বাদ আর হাড়ের গায়ে লেগে থাকা নরম মাংস নিয়ে আমাদের কত আনন্দ ছিল। এবার তাঁর জন্য সেই খাবারের ব্যবস্থা করার পালা আমার।
কিন্তু এক বাটি পায়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে অন্য অনেক বয়স্ক ও নিঃসঙ্গ বিধবা মায়ের কথাও মনে পড়লো । পাশে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নেই, ছোট কোনো ইচ্ছার কথা বলার বা তা পূরণের অনুরোধ জানানোর মানুষও হয়তো নেই।
বার্ধক্যের এই অনিশ্চয়তায় রাষ্ট্রের আর্থিক ভাতা প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়। তবে তাঁদের ভালো থাকা ও মানসিক স্বস্তির জন্য সঙ্গ, মনোযোগ এবং নিজের ইচ্ছার গুরুত্ব পাওয়ার যে প্রয়োজন, তা শুধু ভাতায় মেটে না।
খাবারের সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্ক
চলাফেরার সীমাবদ্ধতায় আম্মার বাইরের জগৎ এখন অনেক ছোট। নিয়মিত বাইরে যাওয়া বলতে থেরাপির জন্য হাসপাতালে যাওয়া।
ফলে বাড়ির দিনগুলোতে বৈচিত্র্য আনার একটি উপায় খাবার। সকালে কোন বাজারে গেলাম, কী পাওয়া গেল, দাম কত, কী কিনে আনলাম—এসব নিয়ে কথা হয়। আমার কাছে নিত্যদিনের বাজারসদাই; তাঁর কাছে ঘরের বাইরের পৃথিবীর খবর।
একসময় এসব সিদ্ধান্তে তাঁরই কর্তৃত্ব ছিল। এখনো তিনি জানতে চান, মত দেন।সেদিন অবশ্য বাজারে যাওয়ার আগেই খাবারের নির্দেশ এসে গেল।
কেন হাড়ের স্যুপ খেতে চান, জানতে চাইলাম। আম্মা বললেন, এতে ক্যালসিয়াম আছে, হাড় শক্ত হবে। উত্তরটি শুনে মনে হলো, নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে তাঁর ভাবনা কতটা জীবন্ত। আমাদের শৈশবের প্রিয় খাবারটি তাঁর কাছে এখন কিছুটা শক্তি ফিরে পাওয়ার আশাও বহন করছে।
হাড়ের ঝোলকে অবশ্য হাড় মজবুত করার নিশ্চিত উপায় ভাবা ঠিক হবে না। কিন্তু আম্মার অনুরোধে পরিচিত একটি খাবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিল।
বয়সের সঙ্গে খাবারের অর্থও বদলায়। যে পদ একসময় আম্মা সন্তানদের আনন্দ দিতে নিজের হাতে রান্না করতেন, আজ সেটিই তাঁর নিজের আনন্দ ও আশার অংশ।
আগে যখন বাড়িতে প্রায় একা থাকতেন, তখনো মাঝেমধ্যে আমার এক আত্মীয়ার কাছে পায়া খাওয়ার আবদার করতেন। কয়েক মাস আগে ধানমন্ডির স্টার কাবাব থেকেও এনে তাঁকে খাইয়েছি।
পছন্দটি বহু দিন ধরে টিকে আছে। সেটি পূরণ হওয়ার জন্য খাবারের ব্যবস্থার পাশাপাশি আবদারটি শোনার মতো কাউকেও প্রয়োজন।
এবার বাড়িতে রান্না হলো। আম্মাকে দুই বাটি ঝোল শেষ করতে দেখলাম। ধীরে, যত্ন করে হাড় থেকে মাংস ছাড়িয়ে নিচ্ছিলেন। কয়েক মাস আগেও তাঁকে হাতে তুলে খাওয়াতে হতো। এখন বসে খেতে পারেন, ক্ষুধাও ফিরে এসেছে।
নিজের পছন্দের খাবারটি তাঁকে এভাবে উপভোগ করতে দেখার আনন্দ ছিল আলাদা।
খাওয়া শেষে জিজ্ঞেস করলাম, খুশি হয়েছেন কি না।
হয়েছেন। তবে রাঁধুনি তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করলে রান্নাটা আরও ভালো হতে পারত। তিনি হলে মাংস একটু বেশি দিতেন।
আমার প্রশ্ন ছিল তৃপ্তি নিয়ে; তাঁর উত্তর এলো রান্নার মান নিয়ে। আমি এতক্ষণ তাঁকে খাবার উপভোগ করতে দেখছিলাম। তিনি একই সঙ্গে রান্নার বিচারও করছিলেন।
জানতে চাইলাম, তিনি কীভাবে পায়া রান্না করতেন। কোনো রহস্যময় পারিবারিক রেসিপি ছিল না। হাড়ের সঙ্গে আদা, রসুন, গরমমসলা ও থেঁতলানো জিরা দিয়ে ধীরে রান্না করতে হবে। শেষে ভাজা পেঁয়াজ ছড়িয়ে দিতে হবে।
কত চামচ কোন মসলা, তার নিখুঁত হিসাব দিলেন না। বহুবার রান্না করা মানুষের পরিচিত ভঙ্গিতে বললেন।
ছোটবেলায় তাঁর রান্না খেয়েছি, কিন্তু পদ্ধতি জানতে কতবার পাশে বসেছি? এত বছর পরে রান্নার কথা শুনতে গিয়ে বুঝলাম, তাঁর স্মৃতিতে আমাদের বেড়ে ওঠার কতখানি জমা আছে। সেদিন আমার কাজ ছিল মন দিয়ে শোনা।
ওষুধ, চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা হলেই দিনটি আনন্দে কাটে কি না, জানা যায় না। আজ তাঁর অপেক্ষা করার মতো কিছু ছিল? অসুস্থতার বাইরে কোনো বিষয়ে কথা হয়েছে? কোনো সিদ্ধান্তে তাঁর পরামর্শ নেওয়া হয়েছে?
একটি আবদার করার নিশ্চয়তা
পরে ভাবলাম, আম্মার অনুরোধে আমার এত ভালো লাগল কেন?
মনে হলো, এমন একটি আবদার করতে পারা এবং তার উত্তর পাওয়ার মধ্যেও নিশ্চয়তার একটি জায়গা আছে। তিনি কিছু চাইতে পারেন। তাঁর ইচ্ছার গুরুত্ব আছে। খাবারটি কেমন হলো, সে বিষয়ে তাঁর মন্তব্যও শোনা হবে।
শারীরিক নির্ভরশীলতা বাড়লে এই নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। প্রয়োজন জানাতে বারবার অন্যকে ডাকতে হয়।
তখন পছন্দের একটি খাবারের কথা বলাও হয়তো বাড়তি আবদার মনে হতে পারে। পরিবারের ব্যস্ততায় সেই ইচ্ছা বারবার উপেক্ষিত হলে মানুষ একসময় বলা কমিয়েও দিতে পারেন।
আম্মা এমন অনুভব করেছিলেন কি না, জানি না। তবে কথোপকথনটি আমাকে নিজের আচরণ নিয়ে ভাবিয়েছে। আমরা যাঁর যত্ন নিচ্ছি, তাঁর প্রয়োজনের তালিকা তৈরি করি। তিনি কী চান, তার জন্য কতটা জায়গা রাখি?
ওষুধ, চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা হলেই দিনটি আনন্দে কাটে কি না, জানা যায় না। আজ তাঁর অপেক্ষা করার মতো কিছু ছিল? অসুস্থতার বাইরে কোনো বিষয়ে কথা হয়েছে? কোনো সিদ্ধান্তে তাঁর পরামর্শ নেওয়া হয়েছে?
২০২১ সালে এক সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশবিষয়ক একটি গবেষণায় প্রবীণ পুরুষদের তুলনায় প্রবীণ নারীদের মধ্যে একাকিত্ব ও বিষণ্নতা বেশি পাওয়া যায়। একা থাকা, নিঃসঙ্গ বোধ করা ও বিষণ্নতায় ভোগা অবশ্য আলাদা বিষয়। পরিবারের সঙ্গে থেকেও কারও মনে হতে পারে, তাঁর কথা শোনার মানুষ নেই।
সারা জীবন সংসারের জন্য কাজ করার পর বার্ধক্যে এসে কাউকে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে হওয়ার কথা নয়। আয় নেই, বাইরে যাতায়াত নেই কিংবা অন্যের সাহায্য প্রয়োজন—এসব কারণে তাঁর পছন্দের মূল্য কমে যেতে পারে না।
যত্নের মধ্যে আনন্দের জায়গা
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগের কথাও বলেছেন। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ঘরে থাকা প্রবীণ নারীদের প্রয়োজন যেন আড়ালে না পড়ে।
তাঁদের কষ্ট শনাক্ত করা ও প্রয়োজনমতো চিকিৎসা পাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। পরিবারের বাইরেও নিয়মিত যোগাযোগ ও সহায়তার সুযোগ প্রয়োজন।
স্থানীয়ভাবে বাড়িতে খোঁজ নেওয়া, পরিচর্যায় সহায়তা এবং প্রবীণদের মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। প্রতিদিন সন্তান পাশে থাকার সুযোগ সবার নেই; যত্নের নিশ্চয়তা শুধু সেই সুযোগের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
পরিবারেও তাঁদের কথা শোনা ও দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার জায়গা রাখতে হবে। সঙ্গ চিকিৎসার বিকল্প নয়; আবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেই সম্পর্কের দায়িত্ব শেষ হয় না।
আম্মার দুই বাটি পায়া তাঁর জীবনের সীমাবদ্ধতা দূর করেনি। কিন্তু সেদিন তিনি একটি খাবার বেছে নিয়েছেন, উপভোগ করেছেন এবং কীভাবে আরও ভালো করা যায় বলেছেন। আমি খাবারের ব্যবস্থা করেছি; তিনি আমাকে রান্না শিখিয়েছেন। এই আদান–প্রদানটুকু আমাদের দুজনের দিনেই আনন্দ যোগ করেছে।
আমার মতো যেসব ছেলের প্রবীণ মা–বাবার পাশে থাকার সুযোগ বেছে নিয়েছে, তাঁদের বলব, এই সঙ্গের আনন্দটুকু খুঁজে নিন।
শরীরের সীমাবদ্ধতায় তাঁদের বাইরের জগৎ ছোট হয়ে আসতে পারে; নিজের কথা বলার, পছন্দ জানানোর ও জীবন উপভোগ করার ইচ্ছা তাতে ফুরিয়ে যায় না।
আয় করার সামর্থ্য কিংবা সংসার ও সমাজে আগের ভূমিকা হারালেও তাঁদের ইচ্ছার মূল্য কমে না। যত্নের মধ্যে সেই মর্যাদার জায়গাটুকু থাকুক—যেন ছোট কোনো আবদার জানানোর আগে তাঁদের ভাবতে না হয়, কেউ শুনবে কি না।
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক।ই-মেইল: [email protected]
