আবার সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়া কেবল জাতিসংঘের দুই সদস্যরাষ্ট্র, যারা ইউক্রেনে রাশিয়ার অধিকৃত অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে রিপাবলিকের স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর বদলা হিসেবে কিয়েভ পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তবে আগে থেকেই এ সম্পর্ক ভঙ্গুর ছিল। ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররাও উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে খুব একটা উদ্বিগ্ন নয়। কেননা, উত্তর কোরিয়াকে শাস্তি দেওয়া যায়, এ রকম নিষেধাজ্ঞা তাদের হাতে খুব একটা অবশেষ নেই।

উত্তর কোরিয়া আবার জাতিসংঘের একমাত্র সদস্যরাষ্ট্র, যেটি মস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় খেরসন, জাপোরিঝঝিয়া, দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের গণভোটকে সমর্থন দিয়েছে। কোনো সময়ক্ষেপণ না করেই গণভোটের সমর্থন দিয়ে পিয়ংইয়ং যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ‘বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য ভোট দিয়েছে।’ যদিও এসব সমর্থনের সব কটির শুধু প্রতীকী মূল্য রয়েছে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়, রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ইচ্ছা ও সামর্থ্য উত্তর কোরিয়ার আছে কি না।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক সহায়তার বিষয়টি জল্পনানির্ভর বলেই মনে হয়। দুই দেশের মধ্যে যখন স্থলসীমান্ত এবং অর্থনৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তখন বাণিজ্য বৃদ্ধিই বরং বেশি বাস্তবসম্মত হবে। কিন্তু কোভিড মহামারি শুরুর আগে যে কারণে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, এখনো সেই বাস্তবতার হেরফের হয়নি। রাশিয়ার প্রত্যাশামাফিক নগদ অর্থ ও উচ্চ প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়ার হাতে নেই।

একটি জল্পনা এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ মহল ও গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তা হলো উত্তর কোরিয়া ইউক্রেনে এক লাখ সেনা পাঠাচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। উত্তর কোরিয়া এর আগেও বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পাঠিয়েছে। কিন্তু সে সংখ্যা নগণ্য। ইউক্রেন যুদ্ধে পার্থক্য গড়তে হলে উত্তর কোরিয়াকে হাজার হাজার সৈন্য পাঠাতে হবে।

এটা ভাবা মানানসই হবে না যে উত্তর কোরিয়া সরকার নিজেদের সেনাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ানক যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঝুঁকি নেবে। সে ক্ষেত্রে ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছেই। আবার ভাষার বাধা ও যৌথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি—রুশ বাহিনীর সঙ্গে কোরীয় বাহিনীর কাজ করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন সৈন্য নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণা থেকেই প্রতীয়মান যে বিদেশি সেনার প্রয়োজন নেই রাশিয়ার।

উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে আরেকটি জল্পনা হলো, দেশটি রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করছে কি না। উত্তর কোরিয়ার গোলাবারুদের বিশাল মজুত রয়েছে। তাদের অস্ত্র কারখানাও অনেক। এসব অস্ত্র অনেকটাই সোভিয়েত ইউনিয়নের মানের। সে কারণে পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্রভান্ডার ও গোলাবারুদের সঙ্গে রাশিয়ার বাহিনীগুলোর অস্ত্র ও গোলাবারুদ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

কয়েকটি খবরে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তান ইউক্রেনকে গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া পোল্যান্ডকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে। এ খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে উত্তর কোরিয়াও রাশিয়ার কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে পারে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার কাছে অস্ত্রের সহায়তা চেয়েছে, কিন্তু পিয়ংইয়ং যে মস্কোকে অস্ত্র দিয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। জাতিসংঘে রাশিয়ার দূত পেন্টাগনের এ দাবিকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। আর পিয়ংইয়ং ওয়াশিংটনের এ দাবিকে ‘বেপরোয়া মন্তব্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সামরিক সহায়তার বিষয়টি জল্পনানির্ভর বলেই মনে হয়। দুই দেশের মধ্যে যখন স্থলসীমান্ত এবং অর্থনৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তখন বাণিজ্য বৃদ্ধিই বরং বেশি বাস্তবসম্মত হবে। কিন্তু কোভিড মহামারি শুরুর আগে যে কারণে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, এখনো সেই বাস্তবতার হেরফের হয়নি। রাশিয়ার প্রত্যাশামাফিক নগদ অর্থ ও উচ্চ প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়ার হাতে নেই।

এসব বাস্তবতায় সম্ভবত শ্রমিকই একমাত্র সম্পদ, যা রাশিয়ার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারে উত্তর কোরিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও এর ধারাবাহিকতায় রাশিয়াও উত্তর কোরিয়া থেকে প্রচুর শ্রমিক নিয়ে আসছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার কর্মকর্তারা উত্তর কোরিয়া থেকে শ্রমিক আনার চুক্তি নবায়ন করছেন।

রাশিয়ার অবকাঠামো খাত দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন সম্প্রতি বলেছেন, রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের নিয়োগ দিতে একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্তে পৌঁছাতে কাজ করছে। রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণের কাজে ২০-৫০ হাজার উত্তর কোরীয় শ্রমিক নিয়োগ করা হতে পারে।

একটা বিষয় হলো, কোভিড মহামারির কারণে পিয়ংইয়ং সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় ২০২০ সালের প্রথম থেকেই রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত হয়ে আছে। আশা করা হয়েছিল, এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে খাসান-রাজিন রেল রুট আবার চালু হবে। কিন্তু উত্তর কোরিয়া তাদের সীমান্ত এখনো বন্ধ রেখেছে।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি মস্কোর হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া পশ্চিমাদের কাছে অস্তিত্বগত সংকটে পড়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে বিরোধিতা করার জন্য মস্কোর বন্ধু দরকার। এ কারণে উত্তর কোরিয়ার গুরুত্ব মস্কোর কাছে বেড়েছে।

একই সময়ে রাশিয়ার কারণে কোরীয় উপদ্বীপে পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার গতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ধীর হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপ করা পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা এখন আর রাশিয়ার নীতি নয়। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

মস্কো ও পিয়ংইয়ং সম্ভবত সোভিয়েত আমলের শীতল যুদ্ধকালীন জোট পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সেটা আনুষ্ঠানিক জোট হওয়ার বদলে কৌশলগত জোট হবে। পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ায় নিজের প্রতিরক্ষার জন্য আলাদা করে মস্কোর শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই পিয়ংইয়ংয়ের।

তবে মস্কো-পিয়ংইয়ংয়ের আঁতাত কত দূর যাবে তা বেইজিংয়ের নেতৃত্বে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ত্রিপক্ষীয় চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এই ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়ার—এই জোট উত্তর পূর্ব এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলবে।

আর্টিয়ম লুকিন সহযোগী অধ্যাপক, অরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট স্কুল অব রিজওনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, ফার ইস্টার্ন ফেডারেল ইউনিভার্সিটি, ভ্লাদিভস্তক, রাশিয়া।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে