আজ শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিওসি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১০টি স্টেশন বন্যা পর্যায়ে এবং ৯টি স্টেশন সতর্কতা পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বান্দরবানের মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদ, নোয়াখালীর ডাকাতিয়া নদী, হবিগঞ্জের খোয়াই নদ, মৌলভীবাজারের মনু নদ এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের কুশিয়ারা, সুরমা ও মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী এবং তিস্তা নদীর নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
অর্থাৎ দেশের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক প্রধান নদী অববাহিকায় একই সময়ে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করছে অথবা বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা বর্ষা মৌসুমের জন্য একটি ব্যতিক্রমী ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ফেনী-কুমিল্লা অঞ্চলে সংঘটিত বন্যার তুলনায় অধিক বিস্তৃত এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন সরকারি ও গণমাধ্যমের তথ্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।
চট্টগ্রামে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার কারণ
গত সপ্তাহে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়ে পরবর্তী সময়ে নিম্নচাপে পরিণত হয়। ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়া এই নিম্নচাপের প্রভাবে এক সপ্তাহ ধরে বঙ্গোপসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্পসমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর প্রবাহিত হচ্ছে।
এই আর্দ্র বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) পর্বতমালায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর ফলে একই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ওরোগ্রাফিক প্রভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
এফএফডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার থেকে আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনে চট্টগ্রাম জেলায় ১১৩২ মিলিমিটার, বান্দরবান জেলায় ৭০৯ মিলিমিটার এবং বান্দরবানের লামা উপজেলায় ৮৬০.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। তুলনামূলকভাবে জুলাই মাসে ৩০ বছরের গড় বৃষ্টিপাত চট্টগ্রামে ৮১১ মিলিমিটার, বান্দরবানে ৫৯৫.৫ মিলিমিটার এবং লামায় ৭৬৯ মিলিমিটার। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই চট্টগ্রামে পুরো জুলাই মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃষ্টি হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম শহরে টানা চার দিন ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এই ব্যতিক্রমী বৃষ্টিপাতের ফলেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় রেকর্ড মাত্রার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
ভারী থেকে অতি ভারী আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা
বৈশ্বিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেলগুলোর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চলমান ভারী বৃষ্টিপাত ১৪ জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে নতুন একটি মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও বেশি জলীয়বাষ্প প্রবেশ করতে পারে এবং ১০ থেকে ১৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগ, সিলেট বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে
যদি পূর্বাভাস অনুযায়ী অতিবৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী শনিবার থেকে পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানির উচ্চতা আবারও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত কয়েকদিনে কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রীও তা জানিয়েছেন। আগামী ৭২ ঘণ্টায় এই তিন জেলার পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকতে পারে।
তাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল, টিলা এবং পাহাড় কেটে নির্মিত বসতিতে বসবাসকারী মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখা প্রয়োজন।
যদি আগামী ৪৮ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে বন্যা আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের খরস্রোতা নদীগুলোতে সাধারণ নৌকা দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই উপযুক্ত উদ্ধার সরঞ্জাম, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী বাহিনীর সমন্বিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এসব এলাকায় স্থলপথে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ধরনের এলাকায় নৌ ও বিমান সহায়তায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা সময়োপযোগী হবে।
আবহাওয়া ও বন্যা তথ্যের ২৪ ঘণ্টা হালনাগাদ নিশ্চিত করার পরামর্শ
বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি আবহাওয়া রাডারের মধ্যে চারটি বিভিন্ন কারণে কার্যকর নেই। এই পরিস্থিতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে আগামী এক সপ্তাহ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নদীর পানি পর্যবেক্ষণ তথ্য প্রতি ঘণ্টায় নিয়মিত হালনাগাদ রাখা এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের আবহাওয়া স্টেশনগুলোর বৃষ্টিপাতের তথ্যও প্রতি ঘণ্টায় প্রকাশ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
নদীর পানির উচ্চতা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে এবং সময়োপযোগী তথ্য স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন, উদ্ধারকারী সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
মোস্তফা কামাল পলাশ আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক, সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা এবং প্রতিষ্ঠাতা, আবহাওয়া ডটকম ও আবহাওয়াবিদ
ই-মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব