সড়কে চাঁদাবাজিকে সমঝোতার লেনদেন হিসেবে আখ্যায়িত করে নতুন সরকারের পরিবহনমন্ত্রী একটি ঘোরতর অনৈতিক কাজকে বৈধতা দেওয়ার যে অজুহাত খুঁজেছেন তার পর্যাপ্ত নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য।
চাঁদাবাজিকে সমঝোতার লেনদেন বা অন্য যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, বাস্তবে পরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ীই এটি দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি ও বহুমাত্রিক অবৈধতাকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করার অপপ্রয়াস ছাড়া কিছুই বলা যাবে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, সড়কে চাঁদাবাজিকে সমঝোতার নামে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়া হলে বিআরটিএ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, বিচার, পাসপোর্ট, ভূমি, প্রশাসন ইত্যাদি সেবার পাশাপাশি সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংক, বিদ্যুৎসহ অন্য সব খাতেও একই তত্ত্বের ধারাবাহিক প্রয়োগ ও প্রসার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে?
বর্তমান সরকারের ভুলে যাওয়ার কথা নয় যে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে পতিত কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের পরিবহনমন্ত্রী কর্তৃকও সড়কে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে যে কারণে আত্মঘাতী বিবেচনায় জোরালো প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছিলাম, সেই একই শঙ্কায় আবারও হতাশ।
গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী সড়কে চাঁদাবাজিতে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবপুষ্ট পরিবহনমালিক ও পরিবহনশ্রমিক সমিতির সঙ্গে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশের ছত্রচ্ছায়ায় বিকশিত পেশাদার দলবাজ ও দখলবাজদের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের হাতে জিম্মিদশার ফলে শুধু চাঁদাবাজি নয়, সড়ক-মহাসড়কে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাসহ সব অনাচারও বিচারহীনতা পেয়েছে।
যার প্রতিবাদে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব আন্দোলনের ওপর কর্তৃত্ববাদী সরকারের সহিংস বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়ন পর্যায়ক্রমে বীভৎসতায় পরিণত হয় জুলাই অভ্যুত্থানে। একই বিভীষিকার পথে দেশ আবারও ধাবিত হবে, এমনটি যেমন দেশবাসী কোনো অবস্থাতেই আর চায় না, তেমনি রক্তরঞ্জিত বিশাল জনপ্রত্যাশার ধারক হিসেবে নিরঙ্কুশ ভোটাধিক্য নিয়ে নির্বাচিত সরকারও তা হওয়ার মতো সুযোগ সৃষ্টি হতে দেবে না বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই।
সরকার দলের ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখার ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচনী ইশতেহার, এবং জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণে যেভাবে দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা যেন ফাঁকা বুলিতে পরিণত না হয় সে লক্ষ্যে সরকারের উচিত অবিলম্বে পরিবহনমন্ত্রীর অবস্থান সুদৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা এবং মন্ত্রীর দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, কর্তৃত্ববাদ পতনের পর দেশব্যাপী যেভাবে বহুমাত্রিক চাঁদাবাজি, দলবাজি, দখলবাজির হাতবদলের মহোৎসব হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মন্ত্রীর এ অবস্থান কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষভাবে আবেদন, তাঁর প্রতি ইতিমধ্যে দেশবাসীর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে তার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা নিশ্চিত করার জন্য তাঁর যে পরিকল্পনা আছে মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর দলের নির্বাচনী ইশতেহার এবং জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে যে সুস্পষ্ট দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তার বিপরীতে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের আত্মঘাতী পথ রোধকল্পে তিনি যেন নিজ দলীয় শুদ্ধতা ও সংস্কারকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেন।
অন্যথায় কোনো অঙ্গীকারই কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না, দেশবাসী হতাশ হবেন। যার ফলে বিকল্পের খোলসে এমন শক্তি লাভবান হবে যাদের ভাবাদর্শ, দীক্ষা ও অভীষ্ট বায়ান্ন থেকে একাত্তর হয়ে চব্বিশ পর্যন্ত রক্তের বিনিময়ে লালিত বাংলাদেশের মৌলিক চেতনা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ভয়াবহ মাত্রায় সাংঘর্ষিক। যার তিক্ত অভিজ্ঞতা অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এবং এবারের নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশবাসীর হয়েছে। সরকারের প্রতিটি ভুল পদক্ষেপ এ অপশক্তির অধিকতর বিকাশে সহায়ক হবে। সরকারের ও সরকার দলের প্রধানের সঠিক সর্বোচ্চ প্রাধান্য নির্ধারণের এখনই সময়।
ইফতেখারুজ্জামান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক
*মতামত লেখকের নিজস্ব