আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধেও হারল ইসরায়েল!

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুফাইল ছবি

শুরুতে আমি একটা বিষয় বলে দিতে চাই, যা আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হতে পারে। ইরানে যে যুদ্ধকে ‘ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের’ বলা হচ্ছে, এটি মূলত একটি জায়নবাদী প্রোপাগান্ডা। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থানকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টায় এমন নামকরণ করা হয়েছে।

আসলে এটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই একটি ইসরায়েলি যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র বলতে আমি এখানে সেই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানদের বোঝাচ্ছি, যাঁরা এই যুদ্ধের বিরোধী, যাঁরা নিজ দেশের ভেতরে এই ইসরায়েলি আক্রমণের শিকার।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থাকা ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষাকারী গোষ্ঠী মনে করে তারা এই যুদ্ধকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলি-মার্কিন’ জোটের যুদ্ধ হিসেবে বিশ্বের কাছে বিক্রি করতে পারবে, কিন্তু তারা তাতে সফল হবে না।

সতর্কভাবে লক্ষ করুন কীভাবে নিউইয়র্ক টাইমস ও তাদের অনুসারী মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো যুদ্ধবিরোধী সমালোচনাগুলোকে প্রকৃত অপরাধী ইসরায়েল ও এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর না ফেলে বরং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে কেন্দ্রীভূত করে মার্কিন নাগরিকদের বিভ্রান্ত করছে। এর মাধ্যমে তারা এই যুদ্ধ শুরু করা গণহত্যাকারী জায়নবাদীদের দিক থেকে মানুষের ক্ষোভের দৃষ্টি বিকারগ্রস্ত প্রেসিডেন্টির দিকে ফেলতে উৎসাহিত করেছে। এই যুদ্ধ ইসরায়েল ও নেতানিয়াহু শুরু করেছেন—ট্রাম্প নন, অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরাও নন।

এটি এমন এক যুদ্ধ যা ইসরায়েল একই সঙ্গে ইরান এবং এ যুদ্ধবিরোধী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালনা করেছে। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক তাঁদের দেশকে ইসরায়েলের শ্বাসরুদ্ধকর কবজা থেকে মুক্ত দেখতে চান। এই সেটেলার কলোনি বা বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশের কল্যাণে অর্থায়ন করতে নিজেদের অধিক মূল্য দিতে হচ্ছে এসব মার্কিন নাগরিককে।

গণহত্যাকারী জায়নবাদ থেকে সরে আসার যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন মার্কিন রাজনীতিতে ঘটছে, তার বিরুদ্ধে ইসরায়েলপন্থী লবি গ্রুপগুলোর যুদ্ধের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ইরানের ওপর এই ইসরায়েলি যুদ্ধ।

ইসরায়েল আমেরিকান ফ্রন্টেও হেরেছে। একের পর এক জরিপ ও একের পর এক প্রতিবাদ দেখাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েল যা করেছে, এর জন্য ইহুদি রাষ্ট্রটিকে ঘৃণা করে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। রাজনৈতিক প্রার্থীরা আজ প্লেগ থেকে দূরে থাকার মতো ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক এড়িয়ে চলছেন।

নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে এই যুদ্ধের স্বপ্ন দেখে আসছেন এবং অবশেষে তিনি ট্রাম্পকে ইরানের ওপর আক্রমণে যোগ দিতে প্ররোচিত করতে সফল হয়েছেন। ওভাল অফিসের সেই স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিকে তিনি নিপুণভাবে প্ররোচিত করতে সক্ষম হন। ট্রাম্প স্পষ্টতই এই বোকামি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিলেন, কিন্তু তিনি এতটাই নির্বোধ ও অহংকারী যে কীভাবে তা করতে হবে তা স্বীকার করতে চাইছিলেন না।

ইসরায়েলের কথামতো কাজ করে ট্রাম্প কার্যত মার্কিন বাহিনীকে একটি ‘প্রক্সি ফোর্স’ বা ছায়া বাহিনীতে পরিণত করেছেন তথা কাপুরুষ সেটলার কলোনির একটি ব্যক্তিগত সেনাবাহিনীতে পরিণত করেছেন। লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক এই ঐতিহাসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। তাঁরা তাঁদের দেশ ফেরত চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ সম্প্রতি বলেছেন, তিনি ইসরায়েলকে সব ধরনের সামরিক সহায়তা—এমনকি রক্ষণাত্মক সহায়তাও—দেওয়ার বিরোধিতা করবেন।

আরও পড়ুন

এই প্রবণতা রিপাবলিকান পার্টির মাগা আন্দোলনের মধ্যেও বিস্তৃত হচ্ছে; টাকার কার্লসন, নিক ফুয়েন্তেস ও ক্যান্ডেস ওয়েন্সের মতো জনপ্রিয় ভাষ্যকারদের শুনলেই তা বোঝা যায়। ইসরায়েলি ও মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা, সেতু এবং একটি সার্বভৌম জাতির অন্যান্য অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে লাখ লাখ মার্কিনকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে।

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই যুদ্ধ কেন? উত্তরগুলো সহজ ও স্বতঃসিদ্ধ: প্রথমত, এর মাধ্যমে গাজায় তাদের গণহত্যা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি দখল ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধ থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া। কিন্তু সর্বোপরি ফিলিস্তিনি, লেবানিজ, সিরিয়ান ও ইরানিদের বিরুদ্ধে—এবং প্রকৃতপক্ষে পুরো অঞ্চলের বিরুদ্ধে—এই নৃশংস যুদ্ধগুলো তাদের ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েল তৈরির বিভ্রান্তিকর পরিকল্পনার অংশ।

অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, কিন্তু অধিকাংশ ইসরায়েলি এই যুদ্ধের সমর্থনকারী। এর মানে মূলত এটি একটি ইসরায়েলি যুদ্ধ—কোনো ‘মার্কিন–ইসরায়েলি’ যুদ্ধ নয়।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প ও তাঁর জায়নবাদী কুশীলবেরা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠস্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক—বাম, ডান ও মধ্যপন্থী—এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। ফক্স নিউজ ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও প্রকাশ করেছেন—তাঁরা তাঁদের সন্তানদের ইসরায়েলের হয়ে যুদ্ধ করতে পাঠাতে ক্লান্ত।

ইরানের ওপর ইসরায়েলি যুদ্ধ মূলত মার্কিনদের ওপর তাদের বৃহত্তর যুদ্ধেরই অংশ। ইসরায়েল নীতিমান ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ একটি পুরো মার্কিন প্রজন্মকে হারিয়েছে। যে সংবাদমাধ্যম এবং লবি গ্রুপগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন করে যাচ্ছে, তারাও ইসরায়েলের সঙ্গে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা ভেবেছিল ইসরায়েলের সমালোচক নিরপরাধ শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘ইহুদিবিদ্বেষ’–এর জঘন্য অপবাদ ছুড়ে দিয়ে ভিন্নমতের নৈতিক কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে পারবে। কিন্তু মার্কিন এই প্রজন্ম আর কখনোই প্রতারিত হবে না।

ইসরায়েল এই উভয় যুদ্ধেই হারছে। হ্যাঁ, নেতানিয়াহু একটি পরাশক্তিকে প্ররোচিত করে গাজায় গণহত্যার মডেলে এই যুদ্ধে যোগ দিতে ও গাজার গণহত্যার মডেলে ইরানি শিশুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাতে বাধ্য করেছেন, যা প্রমাণ করে যে পুরো জায়নবাদী প্রকল্পটি ইউরোপীয় বর্বরতার একটি নিদর্শন। কিন্তু ইরান এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং কঠিন আঘাতের পর ঘুরে দাঁড়ানো ও অটল প্রতিরোধের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

ইসরায়েল আমেরিকান ফ্রন্টেও হেরেছে। একের পর এক জরিপ ও একের পর এক প্রতিবাদ দেখাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েল যা করেছে, এর জন্য ইহুদি রাষ্ট্রটিকে ঘৃণা করে আমেরিকার জনগণ। প্লেগ থেকে দূরে থাকার মতো রাজনৈতিক প্রার্থীরা আজ ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক এড়িয়ে চলছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিনরা এই গ্রীষ্মে কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকেই নয়, বরং ফিলিস্তিনের মাঝখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃক সৃষ্ট ইসরায়েল থেকেও তাদের মুক্তির উৎসব উদ্‌যাপন করবে।

  • হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক
    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত ও ঈষৎ সম্পাদিত অনুবাদ: রাফসান গালিব