পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের ম্যান্ডেট ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়

গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানছবি: বাসস

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিশাল বিজয় কেবল সংখ্যাগত অর্জন নয়। এটি আপামর জনগণের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি পরিমাপযোগ্য সংকেত।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক হতাশার ভেতর দিয়ে জমে থাকা প্রত্যাশারই প্রতিফলন এই রায়। গণ-অভ্যুত্থানের আগে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা ছিল গভীর সংকটাপন্ন।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর রাজনীতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় স্বজনতোষী ও অযৌক্তিক সুবিধা প্রদানের ফলে অর্থনৈতিক অপরাধ বেড়ে গিয়েছিল, যা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছিল।

বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, দারিদ্র্য ও আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির ফলে জনমনে অসন্তোষ জমতে থাকে। এই পরিস্থিতিরই পরিণতিতে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে এবং তৎকালীন সরকার পতনের দিকে ধাবিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ সেই অসন্তোষেরই প্রকাশ।

জনগণের একটি অংশ বিশ্বাস করে যে বিএনপি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম। এই আস্থার পেছনে রয়েছে অতীত অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যুদ্ধ–উত্তর অর্থনীতি পুনর্গঠনে শ্রম রপ্তানি ও তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তি গড়ে দেন। বর্তমানে দেশের রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাক থেকে আসে। এদিকে প্রবাসী আয়ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ মডেল

বিএনপি এবার একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। সেখানে বৈষম্য হ্রাস, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর-জাতীয় উৎপাদন অনুপাত ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে মধ্য মেয়াদে কর-জাতীয় উৎপাদন ১০ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। নতুন কর আরোপ ছাড়াই প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও অপচয় কমিয়ে স্বল্প সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ মডেল কেবল বিনিয়োগ বৃদ্ধির কৌশল নয়, বরং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য বাস্তব সুযোগ সৃষ্টির এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রসারণের একটি কাঠামোগত পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে এবং উন্নয়নের সুফল বিস্তৃত হবে।

বর্তমানে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্য স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কৃষক, খামারি ও মৎস্যজীবীদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কিস্তি সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া সুদের হার যৌক্তিক করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি মজুরি ও দ্রব্যমূল্যের সামঞ্জস্য, বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু করা এবং ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কর্মসংস্থান, যুবসমাজ ও নারীর অংশগ্রহণ

প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার গঠনের প্রথম ১৮ মাসেই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরাসরি দুই লাখ এবং পরোক্ষভাবে আট লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এই পরিকল্পনার মূল উপাদান, যা শিল্প খাতের পুনরুত্থান, এসএমই খাত সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়ন যুবসমাজকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করতে সহায়ক হবে।

নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বর্তমানে প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা উন্নয়নশীল দেশের গড়ের দিক থেকে নিচের দিকে আছে। নারীর কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বাড়ানোর মাধ্যমে গৃহস্থালি আয় ও জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নারীকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে গৃহস্থালি আয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

জনগণের একটি অংশ বিশ্বাস করে যে বিএনপি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম। এই আস্থার পেছনে রয়েছে অতীত অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যুদ্ধ–উত্তর অর্থনীতি পুনর্গঠনে শ্রম রপ্তানি ও তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তি গড়ে দেন। বর্তমানে দেশের রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাক থেকে আসে। এদিকে প্রবাসী আয়ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে দারিদ্র্য হ্রাস এবং নারীর শ্রম অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই আস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে এই আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিএনপির নীতিতে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং কাঠামোগত সংস্কারকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়িয়ে রপ্তানি ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি, এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশে উন্নীত করা, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, বছরে ১৫ লাখ মানুষের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে দুই লাখ উদ্যোগ গড়ে তোলা। পাশাপাশি ৪০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার

এই নির্বাচনী রায় কেবল সরকার পরিবর্তনের রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জবাবদিহিমূলক, পরিমাপযোগ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কারের একটি স্পষ্ট ম্যান্ডেট। দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা ও বৈষম্যের ফলে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, এই রায় তা পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে।

জনগণ উন্নয়ন, সম্পদ বণ্টন ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো পুনর্নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে। সঠিক বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে। বাজারে আস্থা ফিরে আসবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই ম্যান্ডেট একটি নৈতিক দায় তৈরি করেছে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, সময়সীমা ও কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা অপরিহার্য। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করলে স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব।

এই বিজয় তাই কেবল একটি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ নয়। এটি একটি নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা, যেখানে রাষ্ট্র ও নাগরিক একসঙ্গে উন্নয়ন, ন্যায় এবং সমতার ভিত্তিতে অগ্রসর হবে। সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক সূচকে উন্নত হবে না, বরং একটি শক্তিশালী, টেকসই ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করবে। এখন সময় প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার, সময় আস্থাকে অর্জনে রূপান্তর করার এবং উন্নয়নকে সবার অধিকারে পরিণত করার।

  • ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অধ্যাপক উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়ন অন্বেষণ সংস্থার চেয়ারপারসন

* মতামত লেখকের নিজস্ব