বিজ্ঞাপনটি বেশি দিন আগের নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বেশ কয়েকটি বড় ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানে ধস নামার পর প্রথাগত বৈশ্বিক আর্থিক মডেলের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এ খাতের অস্তিত্ব এখন প্রশ্নের মুখে। গত বছরের মে মাসে ‍দুই ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা টেরাইউএসডি ও লুনার ব্যাপক অবনমন হয়।

প্রায় সব দর হারায় মুদ্রা দুটি। এর মধ্য দিয়ে রাতারাতি ক্রিপ্টোমার্কেট থেকে উধাও হয়ে যায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। কাছাকাছি সময়ে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রিপ্টো হেজ ফান্ড ‘থ্রি অ্যারোজ ক্যাপিটাল’। এর পরপরই দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার আবেদন করে ‘ভয়েজার ডিজিটাল’ ও ‘সেলসিয়াস নেটওয়ার্ক’। দুটি প্রতিষ্ঠানই অর্থ ধার দিয়েছিল থ্রি অ্যারোজ ক্যাপিটালকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের ফাইনালে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া জনপ্রিয় ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম এফটিএক্স ‘সুপার বোল’ হিসেবে পরিচিত। এর আকস্মিক বিশাল পতন হয় নভেম্বরে। পরের মাসে উত্তর আমেরিকার দ্বীপরাষ্ট্র বাহামাসে গ্রেপ্তার হন এর প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইড, যাঁর বিরুদ্ধে আনা হয় প্রতারণার অভিযোগ। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনের দর তুঙ্গে উঠেছিল ২০২১ সালের অক্টোবরে। মুদ্রাটি সে সময়ের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ দর হারিয়েছে।

টিম লিউংয়ের ভাষ্য, অনেক সম্ভাব্য গ্রাহকই এখন সন্দিহান। ফলে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলোয় লেনদেন আপাতত কম হওয়ারই কথা। বিপুল বিদ্যুৎ খরচ করে চালানো সুপার কম্পিউটার দিয়ে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বানানো কোম্পানিগুলোও ধুঁকবে। তিনি আরও বলেন, কম লেনদেনের কারণে মুদ্রার ক্রমহ্রাসমান চাহিদা এবং বিদ্যুতের উচ্চমূল্য কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেলের টিকে থাকার সম্ভাবনা সংকুচিত করবে।

ন্যাশনাল ফুটবল লিগের ফাইনালে এফটিএক্সের বিজ্ঞাপনটি শেষ হয়েছিল ‘ল্যারির মতো হইও না’ বাক্য দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগ করা আনুমানিক ৪২ কোটি মানুষের বেশির ভাগ হয়তো ল্যারির মতো হতে চাইবেন। এমন বাস্তবতায় ক্রিপ্টো প্রায় বিলুপ্তির পথে কি না, সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

বিনিয়োগের সুফল দ্রুত মিলবে, এমন আশ্বাসে ক্রেতা টেনেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি বেচাকেনার প্ল্যাটফর্মগুলো। তথাকথিত ক্রিপ্টো ওয়ালেটকে ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের মতো করে তৈরি করা হয় এবং এতে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা রাখলে উচ্চ হারে (কখনো কখনো দুই অঙ্কে) সুদের অফার দেওয়া হয়। প্রচলিত মুদ্রার ওপর যাঁদের আস্থা নেই, তাঁদের কাছে ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগের বাড়তি সুবিধা হলো, মধ্যবর্তী কোনো নিয়ন্ত্রক নিয়ে চিন্তা ছাড়াই লেনদেনের সুযোগ।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভসহ বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ২০২২ সালজুড়ে সুদহারের চড়া বৃদ্ধিতে সে প্রলোভন অকেজো হয়ে যায়। সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের প্রচলিত মাধ্যমগুলো বেশি আকর্ষণীয় হয়। শুধু ২০২২ সালে ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার।

টেরাইউএসডি ও লুনার চরম পতনের পর নিরাপদ বেশ কিছু বিকল্প সামনে আসার পাশাপাশি ক্রিপ্টো নিয়ে আস্থাহীনতা যে সংকটের সৃষ্টি করেছে, তা শেষ হওয়ার নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের কম্পিউটারকেন্দ্রিক অর্থ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক টিম লিউং বলেন, ‘আমি মনে করি, এ খাতে পরিস্থিতির দৃশ্যত উন্নতির আগে অনেক দুঃসংবাদ দেখতে হবে।’

টিম লিউংয়ের ভাষ্য, অনেক সম্ভাব্য গ্রাহকই এখন সন্দিহান। ফলে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলোয় লেনদেন আপাতত কম হওয়ারই কথা। বিপুল বিদ্যুৎ খরচ করে চালানো সুপার কম্পিউটার দিয়ে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা বানানো কোম্পানিগুলোও ধুঁকবে। তিনি আরও বলেন, কম লেনদেনের কারণে মুদ্রার ক্রমহ্রাসমান চাহিদা এবং বিদ্যুতের উচ্চমূল্য কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেলের টিকে থাকার সম্ভাবনা সংকুচিত করবে।

‘আমার মনে হচ্ছে, পর্যায়টা ২০২৩ সালজুড়ে অব্যাহত থাকবে। ক্রিপ্টো শীতের বদলে ক্রিপ্টো বরফ যুগ আসার শঙ্কাই বেশি’, বলেন টিম লিউং।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • চারু সুদান কস্তুরি মার্কিন অনুসন্ধানী লেখক এবং সম্পাদক