হরমুজ সংকটের মধ্যেই কেন উত্তপ্ত হচ্ছে বাব–এল-মান্দেব

বাব আল–মান্দেব প্রণালিছবি: মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত ছবির স্ক্রিনশট

বাব–এল-মান্দেব প্রণালির নামের একটি অশুভ অর্থ রয়েছে। তা হলো ‘কান্নার দুয়ার’। বর্তমানে এই নাম অত্যন্ত নির্মমভাবে সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোহিত সাগর ও অ্যাডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের ১০ শতাংশের বেশি সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্য, হর্ন অব আফ্রিকা এবং দিন দিন ভেঙে পড়া বিশ্বব্যবস্থার পুঞ্জীভূত উত্তেজনার ভারও বহন করছে।

গাজায় যা ঘটছে, তা কেবল গাজার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। তেল আবিবের সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে মোগাদিসুতে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতাকে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতিকে প্রথম দেখায় একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ মনে হতে পারে। তবে এটি বিশ্বের অন্যতম নাজুক এক অঞ্চলে রণকৌশলগত উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে।

প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েল সরাসরি সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যা মোগাদিসুর সরকারকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে।

সোমালিয়ার সাধারণ মানুষ এ ঘটনাকে কেবল মানচিত্র নিয়ে বিরোধ হিসেবে দেখছেন না, তাঁরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। সোমালিয়ার কাছে এটি একটি পুরোনো ও অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি, যেখানে আফ্রিকার অনুমতি ছাড়াই বিদেশি শক্তিগুলো আফ্রিকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।

সোমালিয়ার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তৎক্ষণাৎ কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে। তাঁরা ‘গুরুতর পরিণাম’ হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে ইসরায়েল–সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও মোগাদিসুর কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনী নেই। তবু ভূরাজনীতিতে প্রতীকী গুরুত্ব অনেক সময় যুদ্ধজাহাজের চেয়েও দ্রুত কাজ করে।

এ ক্ষেত্রে আগে থেকে একটি উদাহরণ রয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে কীভাবে স্বল্পমূল্যের আধুনিক যুদ্ধের কৌশলে বিশ্বের একটি প্রধান সমুদ্রপথের গতি রুদ্ধ করা যায়। গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালানোর ফলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়। ফলে জাহাজগুলোকে উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন

পশ্চিমা বিশ্ব সোমালিয়ার এ হুমকিকে হয়তো গালভরা বুলি বলে উড়িয়ে দিতে পারে। বাস্তববাদীদের যুক্তি হলো, মোগাদিসুর এমন শক্তি নেই যে তারা বাব–এল-মান্দেব বন্ধ করে দেবে। কিন্তু তারা গভীর সমস্যাটি বুঝতে পারছে না। সংকীর্ণ এই জলপথগুলো আসলে শক্তির উৎস। এগুলো কম শক্তিশালী পক্ষকেও বড় শক্তিগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। এর কারণ কেবল সামরিক সামর্থ্য নয়; বরং নৈতিক বৈধতাও এখানে জড়িত।

আফ্রিকা ও দক্ষিণ গোলার্ধের অনেক দেশে গাজা যুদ্ধ পশ্চিমা কূটনীতির ওপর অনাস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যেসব সরকার নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কথা বলে, তারাই ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন কিংবা ইসরায়েলের সীমানা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে দ্বিমুখী আচরণ করে। সোমালিয়ায় জনমত কোনো কৌশলগত তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং তারা ফিলিস্তিনের সঙ্গে ধর্মীয় সংহতি ও উপনিবেশবাদের স্মৃতির দ্বারা পরিচালিত হয়।

ইসরায়েল হয়তো সোমালিল্যান্ডকে অ্যাডেন উপসাগরের কাছে একটি কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করছে। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম সমুদ্রপথের ওপর নজর রাখতে পারবে। তেল আবিবের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীরা জানেন যে বাব–এল-মান্দেব কেবল পণ্য পরিবহনের পথ নয়, এটি বড় রাজনৈতিক দর–কষাকষির মাধ্যমও।

বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের জন্য সহজ পাঠ হলো আফ্রিকার সার্বভৌমত্বের বিতর্ক আর স্থানীয় কোনো বিষয় নেই, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের সীমানার মর্যাদা রক্ষা করা যেমন জরুরি, সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে। না হলে বৈষম্যমূলক নীতি রণকৌশলগত অসন্তোষ তৈরি করবে।

আফ্রিকাও ভৌগোলিক রাজনীতি ও পুরোনো ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন। সোমালিল্যান্ডের মানুষের প্রত্যাশা থাকাটা স্বাভাবিক এবং তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু নিজস্ব স্বার্থের প্রয়োজনে কোনো বিদেশি শক্তির এমন একপক্ষীয় স্বীকৃতিকে ভালো চোখে দেখা হচ্ছে না। এতে সোমালিল্যান্ডের মানুষের অধিকারের লড়াইটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রতিপক্ষের খেলার ঘুঁটিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বের মধ্যম শক্তিগুলোকে তাদের গণ্ডির বাইরে তাকাতে হবে এবং এটি বুঝতে হবে যে ভারত মহাসাগর ও হর্ন অব আফ্রিকা এখন আর কোনো প্রান্তিক অঞ্চল নয়, এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক স্পর্শকাতর কেন্দ্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে পারস্য উপসাগর কিংবা আফ্রিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত কোনো দেশের অর্থনীতিই এ পরিস্থিতির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। বাব–এল-মান্দেব এখন আর শুধু সমুদ্রপথ নয়, এটি সার্বভৌমত্বের লড়াই ও গাজা যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর এক বিস্ফোরক কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

ইয়েমেনের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে নাইরোবিতে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, বার্লিনে জ্বালানিনিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটতে পারে কিংবা মুম্বাইয়ে চিকিৎসার সরঞ্জাম আসা দেরি হতে পারে। এটি কেবল নৌ চলাচলের সমস্যা নয়; বরং সমুদ্রে সৃষ্ট এক গভীর আস্থার সংকট। যখন দুর্বল দেশগুলো মনে করে, তাদের কথা শোনা হচ্ছে না কিংবা আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না, তখন তার ফল শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমান যুগের মধ্যম শক্তিগুলোর জন্য শিক্ষাটি স্পষ্ট এবং তা হলো হর্ন অব আফ্রিকাকে অবজ্ঞা করা একটি মারাত্মক রণকৌশলগত ভুল। সোমালিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি কিংবা ড্রোন সরবরাহ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে শক্তির শূন্যস্থান খুব দ্রুতই পূর্ণ হয়। ইরান, মিসর, ইসরায়েল ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোর এখানে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। একটি ভুল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত সমুদ্রে অস্থিতিশীলতা ও জলদস্যুতা আবার বাড়িয়ে তুলতে পারে।

পাউন্টল্যান্ড অঞ্চলে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে যে এখানকার সমুদ্রপথ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি সোমালি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবরোধ ঘোষণা না–ও করে, তবু ঝুঁকির ধারণা থাকলেই বিমা ও জাহাজ কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের জন্য সহজ পাঠ হলো আফ্রিকার সার্বভৌমত্বের বিতর্ক আর স্থানীয় কোনো বিষয় নেই, এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের সীমানার মর্যাদা রক্ষা করা যেমন জরুরি, সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে। না হলে বৈষম্যমূলক নীতি রণকৌশলগত অসন্তোষ তৈরি করবে।

সোমালিল্যান্ড নিয়ে আফ্রিকান ইউনিয়নের সংলাপের আহ্বানে সবার সমর্থন দেওয়া উচিত। স্বীকৃতির নাটক না করে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে গাজা পরিস্থিতির মানবিক দিকটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হর্ন অব আফ্রিকার অনেক দেশ তাদের অবস্থানকে ইসরায়েলবিরোধী হিসেবে দেখে না; বরং তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মনে করে।

যদি স্বীকৃতির রাজনীতি চলতে থাকে এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো অন্যদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তবে এ ‘কান্নার দ্বার’ দিয়ে আন্তর্জাতিক মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে। পৃথিবী হয়তো তখন আবিষ্কার করবে যে ক্ষুদ্র এক একটি জলপথও ইতিহাসের ভয়াবহতম পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

  • কুর্নিওয়ান আরিফ মাসপুল ইসলামি কূটনীতি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাজনীতি গবেষক

মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত