মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটে পাকিস্তান এমন একটি ভূমিকা নিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও অনেকের কাছে কল্পনাতীত মনে হতো। ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলো, তার পেছনে ইসলামাবাদের যোগাযোগ, বার্তা আদান-প্রদান এবং চাপ প্রয়োগের ভূমিকা এখন মোটামুটি পরিষ্কার।
পাকিস্তান এই যুদ্ধবিরতি একা আনেনি, কিন্তু এমন একটি সময়ে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে পেরেছে, যখন ওয়াশিংটন, তেহরান, রিয়াদ, এমনকি বেইজিংও পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। এই জায়গাই পাকিস্তানের বড় সাফল্য।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা দ্রুত বড় আকার নিতে থাকে। সংঘাত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয় যে এটি শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নয়, বরং গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এ প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ধীরে ধীরে নিজেকে একটি যোগাযোগের সেতু হিসেবে দাঁড় করায়। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও পাকিস্তানের প্রচেষ্টার কথা স্বীকার করেন। কূটনীতিতে এ ধরনের প্রকাশ্য স্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে বোঝা যায়, ইসলামাবাদকে দুই পক্ষই অন্তত ব্যবহারযোগ্য একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছে।
অনেকেই ভাবতে পারেন, পাকিস্তান কি কেবল বার্তা পৌঁছে দিয়েছে? বাস্তবতা তার চেয়ে বেশি জটিল। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াই প্রায় ভেঙে পড়েছিল। ইরানের একটি হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রিয়াদ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তখন পাকিস্তানি বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব একসঙ্গে নড়েচড়ে বসে।
তারা একদিকে ইরানকে কড়া বার্তা দেয়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এমন আশ্বাস আদায়ের চেষ্টা করে, যাতে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রেখে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ না করে দেয়। অর্থাৎ পাকিস্তান একই সঙ্গে চাপও দিয়েছে, আবার সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম আস্থাও তৈরির চেষ্টা করেছে। এটাই ছিল তাদের আসল ভূমিকা।
প্রশ্ন হলো, এই সংকটে পাকিস্তান কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? এর উত্তর শক্তির আকারে নয়, অবস্থানের আকারে খুঁজতে হবে। পাকিস্তান হয়তো বিশ্বশক্তি নয়, কিন্তু এমন কিছু সম্পর্ক তার আছে, যা এই মুহূর্তে কাজে লেগেছে। ইরানের সঙ্গে তার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা আছে। আবার চীনের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা সুপরিচিত।
এই চারদিকমুখী সম্পর্ক পাকিস্তানকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে সে প্রায় সব পক্ষের সঙ্গেই কথা বলতে পারে। অনেক রাষ্ট্রেরই মতামত থাকে, কিন্তু সবার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকে না। পাকিস্তানের ছিল। এ কারণেই ইসলামাবাদ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাকিস্তান প্রথম যে লাভটি তুলেছে, তা হলো নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে কিছুটা রক্ষা করা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পাকিস্তানের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়তই। দেশটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ আছে, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আছে, ঋণের বোঝা আছে।
এমন অবস্থায় তেলের বাজার অস্থির হলে বা হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়লে পাকিস্তানের জন্য তা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারত। ২ এপ্রিল জ্বালানির দাম হঠাৎ বাড়ানোর ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, এই যুদ্ধ পাকিস্তানের জন্য দূরের কোনো খবর ছিল না। যুদ্ধবিরতির ফলে অন্তত সাময়িকভাবে ইসলামাবাদ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। তাই এই কূটনৈতিক সক্রিয়তা শুধু মর্যাদার জন্য ছিল না, ছিল প্রয়োজন থেকেও।
দ্বিতীয় বড় লাভ হলো ভাবমূর্তি। বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানকে সাধারণত নিরাপত্তাসংকট, জঙ্গিবাদ, ঋণনির্ভর অর্থনীতি, সামরিক প্রভাব এবং দুর্বল গণতন্ত্রের আলোচনায় দেখা হয়। এ ঘটনা সাময়িক হলেও সেই চিত্রে ফাটল ধরিয়েছে।
পাকিস্তানের অর্জন অন্য জায়গায়। সে এই সংকট সমাধান করে ‘বড় শক্তি’ হয়ে যায়নি। কিন্তু সে প্রমাণ করেছে, উপযুক্ত সময় এলে ভূগোল, সামরিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক তৎপরতাকে একসঙ্গে ব্যবহার করে নিজেকে দরকারি করে তোলা যায়। ২০২৬ সালের এই এপ্রিল পর্বে পাকিস্তান সেটাই করেছে।
হঠাৎই পাকিস্তানকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যে শুধু নিজের সমস্যা সামলাতে ব্যস্ত নয়, আঞ্চলিক সংকটেও ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ছোট বিষয় নয়। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সব দেশের কণ্ঠ সমানভাবে শোনা হয় না। কিন্তু যখন একটি দেশ সংকটের মুহূর্তে দরকারি হয়ে ওঠে, তখন তার প্রতি দৃষ্টিও বদলে যায়। পাকিস্তান এই পরিবর্তিত দৃষ্টিই এখন কাজে লাগাতে চাইবে।
তৃতীয় লাভটি আরও গভীর। পাকিস্তান অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে পুরোনো নিরাপত্তানির্ভর কাঠামোর বাইরে নিয়ে যেতে চাইছে। আবার উপসাগরীয় দেশগুলোকেও দেখাতে চাইছে যে সংকটের সময় তাকে বিশ্বাস করা যায়। একই সঙ্গে চীনের কাছেও এটি একটি বার্তা, পাকিস্তান শুধু করিডর নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও কার্যকর। যদি ইসলামাবাদ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপের আরও বড় পর্বের আয়োজক হতে পারে, তাহলে এই সাময়িক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক মূলধনে পরিণত হতে পারে। এখানেই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্ভাবনা।
তবে এখানে বাড়াবাড়ি করার সুযোগ নেই। যুদ্ধবিরতি মানেই সংকট শেষ—এমন ভাবার কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর অবস্থানে আছে। তেহরানও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিজস্ব অধিকার এবং হরমুজ ঘিরে তার অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি। এর ওপর ইসরায়েলও স্পষ্ট করেছে যে এই অস্থায়ী বিরতি পুরো সংঘাতের শেষ নয়। ফলে পাকিস্তানের সাফল্য বাস্তব, কিন্তু তা এখনো নড়বড়ে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আলোচনা ভেঙে গেলে এই প্রশংসা দ্রুত মিলিয়ে যেতে পারে।
আরেকটি কথাও মনে রাখতে হবে—পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু একা ছিল না। তুরস্কের গোয়েন্দা ভূমিকার কথাও এসেছে। চীনের প্রভাবও ছিল উল্লেখযোগ্য। কাজেই পাকিস্তানকে এই যুদ্ধবিরতির একমাত্র রচয়িতা বলা ঠিক হবে না; বরং বলা যায়, জটিল ও বিপজ্জনক এক কূটনৈতিক পরিসরে পাকিস্তান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীদের একজন হয়ে ছিল।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের অর্জন অন্য জায়গায়। সে এই সংকট সমাধান করে ‘বড় শক্তি’ হয়ে যায়নি। কিন্তু সে প্রমাণ করেছে, উপযুক্ত সময় এলে ভূগোল, সামরিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক তৎপরতাকে একসঙ্গে ব্যবহার করে নিজেকে দরকারি করে তোলা যায়। ২০২৬ সালের এই এপ্রিল পর্বে পাকিস্তান সেটাই করেছে।
এখন দেখার বিষয়, ইসলামাবাদ এই সাময়িক সাফল্যকে স্থায়ী বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ দিতে পারে কি না। কারণ, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একবার দরকারি হয়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বারবার দরকারি হয়ে ওঠাই আসল শক্তি।
আসিফ বিন আলী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো। ই-মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব
