কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানি পাসপোর্টে লেখা রয়েছে, ‘ইসরায়েল ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশের জন্য বৈধ।’ পাকিস্তান যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না, এটা তাদের অন্যতম প্রধান পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠান পর থেকে এই নীতি জাতীয় ঐকমত্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে একটি ঐতিহাসিক অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিনের এই ঐকমত্য সম্প্রতি নজিরবিহীন পরীক্ষার সম্মুখীন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তির সঙ্গে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র একটি নাটকীয় ও ‘বাধ্যতামূলক’ সম্প্রসারণের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।
‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তি হচ্ছে ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একাধিক চুক্তি। পরবর্তীকালে মরক্কো ও সুদানও এই চুক্তির আওতাভুক্ত হয়।
ধর্মীয় গোষ্ঠী, মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এ যুদ্ধকে একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে যে একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই অসমর্থনযোগ্য হবে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প এক দীর্ঘ পোস্টে দাবি করেন, একটি ঐতিহাসিক আঞ্চলিক বন্দোবস্তকে সুসংহত করতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক এবং অন্যদের ‘একযোগে’ এ চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত।
ইসলামাবাদ তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ২৬ মে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেন, পাকিস্তান এমন কোনো ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না, যা তার ‘মৌলিক আদর্শের’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পাকিস্তান কেন ‘না’ বলছে
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের ইসরায়েল–বিষয়ক অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। ইসরায়েলকে স্বীকৃতির ব্যাপারটি সর্বদাই প্রাক্-১৯৬৭ সীমান্ত ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
গত জানুয়ারিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এক প্রশ্নের জবাবে আব্রাহাম চুক্তিতে ইসলামাবাদের যোগ না দেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে কোন দেশ যোগ দেবে বা দেবে না, তা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা বিষয়টি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিবেচনা করি।’
বিশ্লেষকদের মতে, এটা কেবল কূটনৈতিক মামলা হয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বারাও এটা গভীরভাবে প্রভাবিত।
ইসলামাবাদ-ভিত্তিক একটি থিঙ্ক-ট্যাংকের প্রধান মুহাম্মদ ইসরার মাদানি বলেন, ‘এ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো নয়। এখানে অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ সক্রিয়। জনমত, ইসলামপন্থী, জিহাদি গোষ্ঠী, সংসদ, নাগরিক সমাজ ও প্রাণবন্ত গণমাধ্যম—সবাই পররাষ্ট্রনীতির বিতর্কে প্রভাব রাখে।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের রাজনৈতিক মূল্য ‘অধিকাংশ আরব দেশের তুলনায় পাকিস্তানে অনেক বেশি’। তিনি আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের পক্ষ ত্যাগ করার মানেই হলো সরকারকে ধর্মীয় দল ও জনগণের একটি বড় অংশের প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে।’
কাশ্মীর বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থানের কারণে এটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকেরা ফিলিস্তিনি ও কাশ্মীরিদের সংগ্রামের মধ্যে মিল দেখিয়ে উভয় ইস্যুকে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় হিসেবে আলাপ করেছেন।
অনেকে বলছেন, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান ব্যতিরেকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি প্রদান ইসলামাবাদের কূটনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে।
আই থেকে অনূদিত।
ওয়াশিংটনের চাপ
ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রস্তাবটি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কূটনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি বর্ধিত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে আছে আব্রাহাম চুক্তি। এ উদ্যোগের অন্যতম সমর্থক কংগ্রেসে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যুক্তি দিয়েছেন যে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানের উচিত এটাকে সমর্থন করা। তিনি এটাকে ‘এই অঞ্চল ও পৃথিবীর জন্য রূপান্তরকারী শক্তির চেয়েও বেশি কিছু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গ্রাহাম ২৪ মে এক পোস্টে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের পরামর্শ অনুযায়ী যদি এই পথে চলতে অস্বীকার করা হয়, তাহলে এটা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে এবং এই শান্তি প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে। ইতিহাস একে বড় ভুল পদক্ষেপ হিসেবে দেখবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের এক সংবেদনশীল মুহূর্তে এ বিতর্কে উঠে এল।
ইসলামাবাদ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করছে, পাশাপাশি সৌদি আরব ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। অন্যদিকে সিনেটর গ্রাহামের মতো মার্কিন আইনপ্রণেতা ও কয়েকজন বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান বজায় রেখে পাকিস্তান কীভাবে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে?
কিন্তু আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। ইসরায়েলের স্বীকৃতি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করতে পারে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ উসকে দিতে পারে। ইসলামাবাদের ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক কূটনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইরান ও আরব আমিরাতে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, ‘জবরদস্তি বা লেনদেনভিত্তিক চাপের মাধ্যমে এই চুক্তি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।’
তাঁর মতে, স্থায়ী আঞ্চলিক শান্তির জন্য ‘বিশ্বাসযোগ্য কূটনীতি, পারস্পরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার প্রশমন এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে অর্থপূর্ণ অগ্রগতি’ প্রয়োজন।
প্রবীণ পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য আসলে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের অস্বীকৃতির প্রতি তাঁর ক্ষোভ।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক মানেই যে ইসরায়েল–বিষয়ক নীতি পরিবর্তিত হবে, এমন ধারণার বিরুদ্ধেও কোনো কোনো বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন। তাঁরা বলছেন, ওয়াশিংটনের চাপের মুখেও ইসলামাবাদ ঐতিহাসিকভাবেই চীন, আফগানিস্তান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখেছে।
ইসলামাবাদ-ভিত্তিক এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্প এই সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি স্বীকার করছেন যে দু–একটা দেশ এই চুক্তিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সম্ভবত পাকিস্তানই হতে পারে সেটা।’
সৌদি সমীকরণ
পাকিস্তান যদিও জোর দিয়ে বলে যে তাদের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন, তবু বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল–বিষয়ক নীতির পরিবর্তন সৌদি আরবের অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবে। ইসলামাবাদের ওপর রিয়াদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে।
এই সম্পর্ক কূটনীতিরও ঊর্ধ্বে। সৌদি আরব দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা, বিনিয়োগ, লাখ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দিয়ে আসছে।
উভয় দেশ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত একটি নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে তাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। অনেক পর্যবেক্ষক তাই মনে করেন, ইসরায়েলের প্রতি সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ যেকোনো বিতর্ককে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান সম্প্রতি বলেছেন, রিয়াদ যদি আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেয়, তবে পাকিস্তান তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার জন্য ‘চাপ অনুভব করবে’। তবে তিনি এ–ও সতর্ক করেন, জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এ পদক্ষেপ পাকিস্তান সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মহত্যার শামিল হবে।
সৌদি আরব এখনো জোর দিয়ে বলছে, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে অবশ্যই দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের একটি নির্ভরযোগ্য উপায়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এটা আদতে পাকিস্তানের নিজস্ব অবস্থানেরই প্রতিফলন।
গাজা ‘ফ্যাক্টর’
২০২৩ সালের অক্টোবরের আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করছিল। অনেক বিশ্লেষক সৌদি-ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচকও ছিলেন। রিয়াদের এমন পদক্ষেপ পাকিস্তানকেও চাপে ফেলত।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের আক্রমণ এবং এর পরবর্তীকালে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই সম্ভাবনাকে পুরো উল্টে দেয়।
গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসরায়েলের সঙ্গে এই সম্পর্কের সমর্থন মুসলিম বিশ্বে তীব্রভাবে হ্রাস পায়। পাকিস্তানেও জনমত তীব্র হয়েছে। ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ পাকিস্তানি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল, অন্যদিকে মাত্র ২ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল।
ধর্মীয় গোষ্ঠী, মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এ যুদ্ধকে একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে যে একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই অসমর্থনযোগ্য হবে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।
ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া পাকিস্তানের জন্য এটাই প্রথম নয়। পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক গতিশীলতা এবং পর্যায়ক্রমিক নীতি পরিবর্তনের জল্পনাকল্পনা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সাত দশকের পুরোনো রেডলাইন এখনো দৃঢ়ভাবে বজায় রয়েছে।
মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
জিয়া উর রেহমান পাকিস্তানি সাংবাদিক ও গবেষক