সমাজ কি এতটাই নির্মম নাকি কেবল তার মুখোশ খুলে যাচ্ছে

এখানে শিশুদের ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের শরীরের অঙ্গ বিকৃত করে সারা জীবন ভিক্ষা করতে বাধ্য করা হয়। এখানে একটি অসুস্থ, দুর্বল কুকুরের যত্ন না নিয়ে ধাক্কা দিয়ে কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এখানে মব মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলে এবং বাকিরা সবাই সেই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করে।

এমন অনেক ঘটনা এখানে ঘটে, যা দেখে আমরা বুঝতে পারি এগুলো সব আমাদের নির্মমতার প্রকাশ। আমাদের মনের ভেতরে জন্ম নেওয়া এক নিষ্ঠুরতা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজকে গ্রাস করছে।

আমাদের সমাজ কি আসলেই এত নির্মম হয়ে উঠছে? নাকি আমরা সব সময়ই নির্মম ছিলাম, এখন কেবল তার মুখোশ খুলে যাচ্ছে?

সমাজের চরিত্র এক দিনে গঠিত হয় না তা আমরা জানি। সমাজ তৈরি হয় আমাদের প্রতিদিনের আচরণে, ছোট ছোট সিদ্ধান্তে এবং আমরা কী সহ্য করি বা কী করি না তার ওপর। সমাজে যা বারবার ঘটতে থাকে, একসময় সেটিই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

আজ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন নির্মমতা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। একজন ৩৫ বা ৪০ বছর বয়সী শিক্ষক, যাঁর শিশুদের জ্ঞানের আলো দেওয়ার কথা, তিনি সাত-আট বছরের ছাত্রদের বেদম মার মারছেন। এমনভাবে মারছেন যেন শিশুর শরীর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি।

এই দৃশ্য আবার কেউ ভিডিও করছে। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে। কেউ বলছে ‘শেখার জন্য একটু মার খেলে ক্ষতি কী?’ আমার মনে হয় এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের এক গভীর অসুখ। আমরা সহিংসতাকে ন্যায়বিচার হিসেবে মেনে নিতে শিখেছি। আমরা মনে করি, শাসনের জন্য অমানবিক শাস্তি দিতেই হবে, অপমান করার মাধ্যমে শিক্ষা দিতে হবে, শৃঙ্খলা আনতে ভয় দেখাতেই হবে।

এভাবেই একদিন আমাদের শিশুরা বড় হয়। তারাও শেখে যে ক্ষমতার অর্থ অন্যকে আঘাত করার অধিকার। একদিন সেই শিশুই বড় হয়ে অন্য কাউকে আঘাত করবে। একদিন সেই শিশুই হয়তো ক্ষমতার আসনে বসে নির্মম হবে।

এখানে শিশুরা ধর্ষিত হয়। সংবাদগুলো যখন জানতে পারি, কয়েক দিন আমাদের মনে আলোড়ন তোলে। প্রতিবাদ করি; তাও আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারপর সমাজ আবার শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু যেই মেয়েরা এই সহিংসতার শিকার হয়, তাদের জীবন কখনোই আগের মতো থাকে না।

আরও অনেক ভয়াবহ দৃশ্য আমরা দেখি। আমরা দেখি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বেঁধে পেটানো হচ্ছে। আমরা কেউ তাদের মানুষ মনে করছি না। তারা যেন বস্তু—মানুষ নয়। এই দৃশ্যগুলো শুধু অপরাধ নয়, এগুলো আমাদের মানসিকতার প্রতিচ্ছবি। আমরা কি সবাই দৈত্য হয়ে উঠছি? একটি সমাজ আসলে কেমন তা বোঝা যায় সেই সমাজ দুর্বলদের সঙ্গে কী আচরণ করে। যেখানে শিশু নিরাপদ নয়, নারী নিরাপদ নয়, প্রাণী নিরাপদ নয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিরাপদ নয়, সেই সমাজ সভ্য নয়।

ধর্মপ্রাণ বলে আমরা নিজেরা গর্ব করি। নামাজ পড়ি, ওয়াজ মাহফিল যাই, ধর্মীয় বক্তৃতা শুনি। কিন্তু ধর্মের শিক্ষা নিয়ে আমরা কি আমাদের মনকে মানবিক করতে পারছি? যদি ধর্মচর্চা মানুষকে নির্মমতা থেকে বিরত রাখতে না পারে, তবে সেই ধর্মচর্চা কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যাচ্ছে না?

একই প্রশ্ন করা যায় আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সব প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই শিক্ষা কি আমাদের মানবিক করছে? নাকি আমরা শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার শিক্ষা নিচ্ছি? সমাজের ভেতরে যদি সহানুভূতি না জন্মায়, তবে শিক্ষা কেবল দক্ষতা তৈরি করে, মানুষ তৈরি করে না।

এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কাজ কী? যাঁরা ক্ষমতায় আছেন তাঁরা কী করবেন? আমরা দেখছি তাঁরা কেউ সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত, কেউ অর্থনীতি নিয়ে, আবার কেউ উন্নয়নের পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যস্ত।

এই ব্যস্ততাও প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে রাষ্ট্র টিকে থাকে সমাজের ওপর। সমাজ যদি নৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে, রাষ্ট্রের কাঠামো নাও টিকতে পারে।

সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র—এসব তৈরি করা সহজ। অর্থ থাকলেই তা করা যায়। কিন্তু সমাজ গঠন করা অনেক কঠিন। কারণ, সমাজ ইটপাথর দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় মানুষের চিন্তা-বিবেক দিয়ে।

আমাদের সমাজ কি একা একা বেড়ে উঠছে? সেখানে কি রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা আছে? রাষ্ট্র চলছে নিজের পথে—অর্থনীতি, রাজনীতি, উন্নয়ন। ওদিকে সমাজ চলছে রাগ, হতাশা, হিংসা ও প্রতিহিংসা নিয়ে। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব যে বাড়ছে তা আমরা খেয়াল করছি না।

একদিন এই দূরত্ব ভয়াবহ হয়ে উঠবে। আমরা যখন মনে করব যে সমাজে নির্মমতা স্বাভাবিক বিষয়, তখন আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করব যে সবারই নির্মম হওয়ার অধিকার আছে।

একজন শিক্ষক ছাত্রদের মারছেন, আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পেটাচ্ছি, প্রাণীদের নির্যাতন করছি এবং বাকি সবাই নির্লিপ্তভাবে ভিডিও করছে। আমরা এক বিপজ্জনক খাদে পড়েছি। আমরা বুঝতে পারছি না যে নির্মমতা সংক্রামক এবং একজনের নির্মমতা আরেকজনকে নির্মম হতে উৎসাহ দেয়।

যদি রাষ্ট্র, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, বুদ্ধিজীবীরা এ বিষয়ে কথা না বলেন, তবে আমরা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করব যে নির্মমতা একটি বৈধ আচরণ।

তখন আর ফেরার সময় থাকবে না। তখন ধ্বংস হয়ে যাব।

একটি সমাজ হঠাৎ করে ধ্বংস হয় না। প্রথমে আমাদের সহানুভূতি কমে যায়। তারপর আমরা অন্যের কষ্টের প্রতি উদাসীন হয়ে যাই এবং অন্যের কষ্টকে বিনোদন হিসেবে দেখতে শুরু করি।

আমরা কি কষ্ট দেখে কষ্ট পাচ্ছি? নাকি শুধুই দেখছি?

  • ইকরাম কবীর কথাসাহিত্যিক। ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব