সীমিত সম্পদের এই দেশে বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্তিত্বের তাগিদে কঠিন প্রতিযোগিতা থাকাটা অস্বাভাবিক বা অন্যায্য কিছু নয়। সাফল্যের জন্য যখন আমরা কোমলমতি শিশু-কিশোরদের প্রতি একধরনের বিক্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া মার্কেটিং ম্যানেজারের মতো আচরণ করি, তখন তা অবশ্যই অসুস্থ। শুধু একাডেমিক ফলাফলকে অতিমাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে আমরা শুধু শিশু-কিশোরদের শৈশব-কৈশোরকেই হত্যা করছি না, তাদের এমন দুর্বিষহ জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছি যে তারা অনেক সময় তাল মেলাতে না পেরে নানা রকম অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতিতে জড়িয়ে পড়ছে; এমনকি আত্মহননের দিকেও চলে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং স্কুল-কলেজ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা কথা বলা হয় এবং তার অনেকটাই হয়তো সংগত।

আজকাল অনেক শিক্ষাবিদই এটা বেশ জোরেশোরে বলছেন যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অতিমাত্রায় পরীক্ষণনির্ভর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শিশু-কিশোরদের জীবনের বৃহত্তর অংশ কাটে পরিবারের সঙ্গে, বিদ্যালয় থেকে দূরে এবং সে ক্ষেত্রে আমরা অভিভাবকেরা যে ভূমিকা রাখছি, তা নিয়ে তুলনামূলক অনেক কম আলোচনা হয়ে থাকে।
ভালো একাডেমিক ফল অবশ্যই শিশু-কিশোরদের চেষ্টা, শিক্ষকদের ভালো পাঠদান এবং অভিভাবকদের যথার্থ তদারকের নির্দেশ করে। কিন্তু একাডেমিক ফলাফলের চেয়ে আরও অনেক বড় ব্যাপার হলো, শিশু-কিশোরদের মানুষ হিসেবে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা। আজ নিজের শৈশব-কৈশোরের কথা মনে পড়লে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়। একাডেমিক ফলাফল মানুষের জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র পরিচায়ক—তখনো মফস্বল শহরে এমন মরিয়া ভাব ছিল না।

হয়তো এর কারণ ছিল, তখন অনেক অভিভাবক শিশুদের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থীর পড়াশোনার প্রতি প্রকৃত আগ্রহ ছিল, তাতে তাদের এমন কোনো ক্ষতি হতো বলে মনে হয় না। আর তাতে আমরা যে শুধু স্বাধীনভাবে শেখার চেষ্টা করতে পারতাম, তা-ই নয়, পাঠ্যপুস্তক ছাড়া পাঠক্রমবহির্ভূত কার্যকলাপ এবং যে ‘আউট বই’কে আজকাল অনেক অভিভাবক মূল্যবান সময়ের অপচয় হিসেবে বাঁকা চোখে দেখেন, সেগুলোয় আমরা অনেক সময় দিতে পারতাম।
আমাদের শৈশব-কৈশোরে অন্তত মফস্বল শহরের স্কুলে খেলার মাঠ বলে কিছু একটা বস্তু ছিল, চাইলে আমরা খেলাধুলা করতে পারতাম। আমরা এমন নির্মমভাবে আমাদের শিশুদের বড় করছি যে স্কুল থেকে কোচিং আর কোচিং থেকে স্কুল—এই যেন তাদের জীবন। শহরের মধ্যে ইনডোর কিছু ক্ষণিক বিনোদন ছাড়া শহুরে শিশু-কিশোরদের বিনোদনের সুযোগ নেই বললেই চলে।

এভাবে আমরা শুধু তাদের আত্মকেন্দ্রিক করে গড়ে তুলছি কি না, এমনকি অনেক সময় তাদের চিন্তা-ভাবনাকে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে বেঁধে ফেলছি কি না, তা নিয়ে মনস্তত্ত্ববিদেরা গবেষণা করতে পারেন। শিশু-কিশোরদের ভালো স্কুলে পড়া বা তাদের ভালো একাডেমিক ফল অর্জন করা অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের জন্য মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ শিশু-কিশোরদের বৃহত্তর পরিসরে একাডেমিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য ভালো ফল করার চেয়ে তাদের মধ্যে জানার ইচ্ছা এবং প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলাটা অনেক বেশি প্রয়োজন, সেটা হয়তো অনেক শিক্ষাবিদই বলবেন।
জীবনের সব একাডেমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করা অবশ্যই কৃতিত্বের ব্যাপার। কিন্তু সব সময় প্রথম হতে হবে বা অভিভাবকের মনের মতো ফলাফল করতেই হবে, এটা সুস্থ জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না। যেকোনো মূল্যে ভালো একাডেমিক ফল অর্জন করার জন্য অনেক অভিভাবক ছাত্র-ছাত্রীদের অসুস্থতার অজুহাতে স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে কোচিংয়ে পাঠিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেন, এমন অভিযোগও শোনা যায়। এই সাময়িক সাফল্যের জন্য মিথ্যাচারকে উৎসাহ বা প্রশ্রয় দিয়ে আমরা অভিভাবকেরা শিশু-কিশোরদের কী শেখাচ্ছি, তা আমরা বুঝলে শুধু শিশু-কিশোরদের নয়, দেশ ও জাতিরও মঙ্গল হতো। এসব শিশু-কিশোর বড় হয়ে তাদের পেশাগত জীবনে সাফল্যের জন্য নানা রকম শর্টকাট পন্থা অনুসরণ না করলেই বরং তা অস্বাভাবিক হবে।

যে শিশু ভালো ছবি আঁকতে পারে, যার মৌলিক সৃজনশীল লেখার হাত রয়েছে, খেলার প্রতি যার আগ্রহ রয়েছে, তাকে পড়াশোনায় অতিরিক্ত জোর করে ভালো কোনো ফল পাওয়া দুরূহ। ভালো একাডেমিক ফলের মাধ্যমে হয়তো আজকের শিশু-কিশোররা আগামী দিনে সফল বা ক্ষমতাশালী পেশাজীবী হবে।

যাঁরা সমাজ চালান, যাঁরা পৃথিবীতে মহান পরিবর্তন আনেন, আমরা যাঁদের আদর্শ হিসেবে মানি, তাঁদের অনেকেরই একাডেমিক ফলাফল তথৈবচ, তাতে তাঁরা কোনোভাবেই ছোট হন না। যে শিশু ভালো ছবি আঁকতে পারে, যার মৌলিক সৃজনশীল লেখার হাত রয়েছে, খেলার প্রতি যার আগ্রহ রয়েছে, তাকে পড়াশোনায় অতিরিক্ত জোর করে ভালো কোনো ফল পাওয়া দুরূহ। ভালো একাডেমিক ফলের মাধ্যমে হয়তো আজকের শিশু-কিশোররা আগামী দিনে সফল বা ক্ষমতাশালী পেশাজীবী হবে।

কিন্তু এটাই জীবনের লক্ষ্য হওয়া সমীচীন নয়, বিশেষ করে তাদের ক্ষেত্রে, যারা এটা চায় না। মা-বাবাকে খুশি করার জন্য চিকিৎসা বা প্রকৌশলবিদ্যা পড়া ছেলেমেয়ের সংখ্যাও একেবারে নগণ্য নয়। এমনকি আলাপচারিতায় অনেক ছাত্রছাত্রীর মুখে শুনতে পাই, তাঁরা আইন পড়ছেন, কারণ, তাঁদের মা-বাবা চেয়েছেন। নিজের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের জন্য ছেলেমেয়েদের প্ররোচিত করা, যা কখনো কখনো কিনা বাধ্য করার পর্যায়ে চলে যায়, তা কতটা সমীচীন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করার সময় সুপার মার্কেটে যখন ছোট্ট এক শিশু তার বাবাকে বলছিল, ‘ড্যাড, আই ডু নট অ্যাগ্রি’, আমার বাঙালি কানে তা খুব লাগছিল। আমাদের সমাজকাঠামোয় এ ধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়তো প্রয়োজন নয়, কিন্তু সব সময় শিশু-কিশোরদের ভালো-মন্দ তারা নিজেরা কিছুই বোঝে না, তাদের পছন্দ-অপছন্দ গুরুত্বহীন, মা-বাবাই তাদের সব বিষয়ের হর্তাকর্তা, এই ভাবনাও হয়তো যুগোপযোগী নয়। আর্থিকভাবে সফল বা নিরাপদ জীবন যেমন কাম্য, সুখী জীবন বা সুখী জীবনের অন্বেষণ তার চেয়ে কম কাম্য হওয়ার কারণ দেখি না। আমাদের অভিভাবকদের যে অতিস্নেহ কোমলমতি শিশু-কিশোরদের আত্মঘাতী করে তোলে, তা স্নেহ না প্রাণঘাতী অপরাধ, সেটা নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত।

  • মো. রিজওয়ানুল ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের সদস্য।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন