সমাজে ধর্মীয় বিতর্কের রূপান্তর ও মীমাংসা–অমীমাংসার সীমানা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চা নিয়ে ধারাবাহিক তর্কবিতর্ক দেখা যাচ্ছে। এতে যেমন পুরোনো অনেক বিতর্ক নতুন করে সামনে আসছে, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে নতুন বাস্তবতাও দেখা যাচ্ছে। ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণের নিরিখে লিখেছেন রাফসান গালিব

নেমেসিসের ২৫ বছর পূর্তির কনসার্টে মাহের খানের অংশগ্রহণ এবং একটি অনুষ্ঠানে নাজিয়া সামান্থার ড্রাম বাজানো নিয়ে তর্কবিতর্ক পুরোনো কিছু প্রশ্ন আমাদের সামনে এনেছে
কোলাজ: প্রথম আলো

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও সাংস্কৃতিক বাসনার মধ্যে পুরোনো কিছু বিতর্ক নতুন করে হাজির হয়েছে।

ইস্যুগুলো হচ্ছে: নেমেসিস ব্যান্ডের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাদের একসময়কার জনপ্রিয় গিটারিস্ট মাহের খানের অংশগ্রহণ, যিনি কিনা ধর্মীয় কারণে ব্যক্তিগতভাবে ব্যান্ড থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন; নাজিয়া সামান্থা নামের এক তরুণী হিজাব পরা অবস্থায় ড্রাম বাজানো এবং এ নিয়ে সমালোচনা ও তাঁর বাবার ক্ষমা চাওয়া, একটি ইসলামি ছাত্রসংগঠনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতির অল্পবয়সী মেয়ের ইসলামি সংগীত শেখার সময় সংগীতশিক্ষকের সামনে হারমোনিয়ামসহ ছবি প্রকাশ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র আক্রমণ, হালালা সেন্টার নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ‘শরিয়তসম্মতভাবে’ হিল্লা বিয়েকে সামনে নিয়ে আসা; যে হিল্লা বিয়ে ধর্মীয়ভাবে নিন্দনীয় ও দেশীয় আইনে অপরাধের কাজ।

ধর্মীয়গতভাবে সংগীত বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, হিল্লা বিয়ে বৈধ নাকি অবৈধ (হালাল নাকি হারাম)—এসব বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক কিন্তু নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে তর্কবিতর্কের পর এমন অনেক বিষয় আধুনিকতা, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, বৈশ্বিক প্রভাব, সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক উপযোগিতার একেক পর্যায়ে মানুষের জীবনচর্চায় স্বাভাবিক হয়ে আসে, আবার নতুনভাবেও হাজির হয়। মানুষের ধর্মীয় নৈতিকতার আদর্শ এবং সময় ও বাস্তব জীবনের উপযোগিতার মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বের ফলে এসব বিতর্ক নানাভাবে চাঙা হয়।

গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ইস্যুগুলো ভিন্ন ভিন্ন হলেও তর্কবিতর্কের ধরন ও উপস্থাপন থাকে একই। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটা ইস্যু সমাজে স্বাভাবিকীকরণ বা আত্মস্থ হয়ে গেলেও অন্য ইস্যুকে ঘিরে আবার সেই তর্কবিতর্ক ফিরে আসে। এর পেছনে কাজ করে ধর্মীয় মতপার্থক্য, ঐতিহাসিক বাস্তবতা, স্থানীয় ও সম্প্রদায়গত চিন্তাচর্চার ধরন এবং সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া ইত্যাদি কারণ।

ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রশ্ন

ইসলাম একটি বৈশ্বিক ধর্ম হলেও এর বিকাশ ঘটেছে আরব অঞ্চলে। ফলে এ ধর্মের সঙ্গে আরবের সংস্কৃতির গভীর সম্পৃক্ততা, যোগাযোগ ও প্রভাব আছে। তবে ইসলাম যখন আরবের বাইরে ছড়িয়ে যেতে লাগল, তখন বিভিন্ন স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। সমাজবিদ ও নৃতাত্ত্বিকেরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে ইসলাম তিনটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে—সাংস্কৃতিক উপাদান গ্রহণ (অ্যাকালচারেশন), সংশোধন (রিফর্ম) এবং বর্জন (রিজেকশন)।

রিচার্ড ইটন তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার’ বইয়ে দেখিয়েছেন, বাংলায় ইসলাম যখন স্থানীয় সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তা তিনটি ধাপে কাজ করেছে। (ইনক্লুশন বা অন্তর্ভুক্তিকরণ): স্থানীয় সংস্কৃতির উপাদানকে ইসলাম নিজের ভেতরে জায়গা দিয়েছে। আইডেন্টিফিকেশন (চিহ্নিতকরণ/সমন্বয়): ইসলামি চরিত্রগুলোকে স্থানীয় সংস্কৃতির রূপকের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে (যেমন: আল্লাহকে ‘নিরঞ্জন’ বা নবীকে ‘মহাপুরুষ’ বলা)। ডিসপ্লেসমেন্ট (প্রতিস্থাপন/স্থানপূরণ/সংস্কার বা বর্জন): পরবর্তী সময়ে যখন মানুষ ইসলামের নানা সংস্কার আন্দোলনের সংস্পর্শে এসেছে, তখন তারা স্থানীয় সংস্কার বা অ-ইসলামি প্রথাগুলো বর্জন করেছে।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ধাপগুলো আসলে একটি চলমান প্রক্রিয়া। কারণ, ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির বাহাস চিরন্তন। সময়ের পরিক্রমায় ইসলামের বিভিন্ন গোষ্ঠীগত বোঝাপড়া এখানে নানা মতাদর্শ, পাঠ ও চর্চা তৈরি করে; যা ঐতিহ্য আকারে একেকটা গোষ্ঠীর ধর্মীয় ভিত্তিও তৈরি করে দেয়। যেখানে ইসলামের একটি গোষ্ঠীর কাছে সংস্কৃতির একটি শৈল্পিক প্রকাশ তথা সংগীত হারাম হিসেবেই বিবেচিত হয়, আবার আরেকটি গোষ্ঠী যেমন তরিকতি ধারায় এটি ধর্মীয় ঐতিহ্যেরই অংশ। সাধারণ মুসলিম সমাজের বিশাল অংশের কাছে সংগীত ও বাদ্যবাজনা স্বাভাবিক একটি সাংস্কৃতিক আচরণ বা বিনোদনের মাধ্যম। শ্লীলতা-অশ্লীলতা এবং নীতিনৈতিকতার মানদণ্ডে সংগীতের গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টিও আবার সেখানে যুক্ত থাকে।

বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবন ও সংগীতের বিকাশ এবং এর তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক চর্চায় মুসলিমদের অবদান বহুলস্বীকৃত। অনেক মুসলিমপ্রধান দেশে সংগীত সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং খুবই স্বাভাবিক চর্চিত বিষয়।

আরও পড়ুন

বলতে হয়, ধর্ম ও সংস্কৃতি বিবিধ প্রশ্ন বিবিধ চর্চায় আমাদের মাঝে হাজির থাকে। কখনো কখনো জোরালোভাবে বিতর্ক তৈরি করে। একই প্রশ্ন, একই বিতর্ক—তবে সময়ের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন আদলে। কারণ, প্রশ্নগুলো শুধু ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যেই থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে নানা রাজনীতি—পরিচয়বাদী রাজনীতি, ধর্মীয় রাজনীতি, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, সেক্যুলার বা গণতান্ত্রিক রাজনীতি।

ফলে শবে বরাত, মহররম, পয়লা বৈশাখ, স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, গানের অনুষ্ঠান, কনসার্ট, বাউল-ফকিরের আসর, মাজারের ওরসকে ঘিরে একই ধরনের বিতর্কের আরোহণ-অবরোহণ দেখা যায়।

তবে ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্কটা কেমন? এই উত্তরও চিন্তাশীল লোকেরা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। যেমন আবুল মনসুর আহমদ বলছেন, ‘ধর্ম ও কৃষ্টির সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়; কিন্তু তা হইলেও দুইটা এক বস্তু নয়। এক কথা বলা যায় ধর্ম কালচারের নির্যাস; পোটেনটাইয্‌ড্‌কালচার দার্শনিক ম্যালিনস্কির ভাষায় “মাস্টার ফোর্স অব হিউম্যান কালচার”। কাজেই ধর্মের সবটুকুই কালচার, কিন্তু কালচারের সবটুকুই ধর্ম নয়। সহজে বুঝিবার জন্য কালচারকে গাছের সঙ্গে তুলনা করিলে ধর্মকে গাছের ফলের সঙ্গে তুলনা করিতে হয়। গাছ হইতে রিলিজিয়ান ও রিলিজিয়ান হইতে কালচারের উৎপত্তি। গাছ কিন্তু ফলের মতো নিটোল অনাবিল নয়। তেমন ভাল-মন্দ ও ফুল-কাঁটা লইয়াই কালচার।’ (বাংলাদেশের কালচার, আবুল মনসুর আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস)

টিভি থেকে স্মার্টফোন

একটা সময় এ অঞ্চলের মুসলিম সমাজে, বিশেষ করে গ্রাম-মফস্‌সলে ‘টিভি দেখা হারাম’ এমন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জোরালো ছিল। মানুষের ঘরে ঘরে টিভি তখনো পৌঁছায়নি। কয়েকটা পাড়া বা মহল্লা মিলে একটা বা দুইটা ঘরে টিভি ছিল। সেখানে আশপাশের মানুষ টিভি দেখতে ভিড় করত। সে সময় ওয়াজে-মাহফিলে টিভি দেখার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হওয়া ছিল সাধারণ ঘটনা।

চট্টগ্রাম শহরে দেখেছি, রিকশা করে মাইক বাজিয়ে ছোট ছোট বইও ফ্রিতে বিলি করা হতো বা অল্প দামে বিক্রি করা হতো। বইয়ের শিরোনাম ছিল এমন—টিভি দেখায় কবরের আজাব। বইয়ের প্রচ্ছদে থাকত কাফনে মোড়ানো মৃত মানুষের ছবি, যাকে বড় একটি সাপ পেঁচিয়ে আছে। মসজিদে জুমার নামাজের পরে কে বা কারা ফটোকপি করা কিছু কাগজ বিলি করত। যেখানে লেখা থাকত, একজন স্বপ্নে দেখেছে মৃত্যুর পর টিভি দেখার কারণে কার কী শাস্তি হয়েছে এমন গল্প। সেই কাগজ ফটোকপি করে ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশনাও থাকত।

নব্বই দশক থেকে শূন্য দশকের গোড়ার কথা এসব। দেশের মফসস্‌ল শহরগুলোতে এমন অনেক দৃশ্য আমাদের স্মৃতিতে আছে। এর এক–দেড় দশকের মধ্যে আমরা দেখলাম ঠিকই ঘরে ঘরে টিভি পৌঁছে গেল। কোনো বিধিনিষেধ তা আটকাতে পারেনি। তবু ধর্মীয় সমাজের একটা অংশে কখনো টিভি ঢুকতে পারেনি। তবে টিভি ঢুকে গেছে তাদের সবার পকেটে পকেটে।

ইন্টারনেটের বদৌলতে একটি স্মার্টফোন এখন টিভির চেয়েও বেশি বিনোদনের মাধ্যম। একসময় যে ওয়াজ–মাহফিল থেকে টিভি দেখা হারাম ঘোষণা করা হতো, সেই ওয়াজ–মাহফিলই এখন লাইভ সম্প্রচার হয়। ছবি, ভিডিওসহ নিজস্ব ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল ছাড়া ইসলামি বক্তা খুঁজে পাওয়াও এখন মুশকিল।

কিছু বিতর্কের সূচনা ও প্রেক্ষাপট

মূলত পশ্চিমে টিভি আবিষ্কারের পর সারা দুনিয়ায় এটি ছড়ানো শুরু করলে পঞ্চাশ-ষাটের দশকে মিসর, তুরস্ক ও আরব রাষ্ট্রগুলোতে তুমুল তর্কবিতর্ক ওঠে। টিভি দেখা শরয়ীভাবে বৈধ নাকি অবৈধ—এ নিয়ে সেসব দেশের ধর্মীয় সমাজের মধ্যে নানা বিভক্তিও তৈরি হয়।

১৯৬৫ সালে সৌদি বাদশাহ ফয়সাল যখন দেশে প্রথম রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন স্টেশন চালু করার উদ্যোগ নেন, তখন দেশটির কট্টরপন্থী আলেম সমাজ এর তীব্র বিরোধিতা করে। সৌদি আরবের তৎকালীন প্রধান মুফতি টিভির বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন। আলেমদের একটি বড় অংশ এটিকে ‘শয়তানের বাক্স’ এবং ইসলামবিরোধী সংস্কৃতির হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এই ফতোয়া ও বিতর্কের জেরে ১৯৬৫ সালে বাদশাহ ফয়সালের ভাগনে যুবরাজ খালিদ বিন মুসাইদ রিয়াদের টিভি স্টেশনে হামলা চালাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় সেই খালিদের ভাইয়ের গুলিতেই এক দশক পর বাদশাহ ফয়সালও হত্যার শিকার হন। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের ‘আ হিস্টোরি অব সাউদি আরাবিয়া’ বই ঘাঁটলে এসব বিষয় জানা যায়। এ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার এবিসি চ্যানেল একটি ডকুমেন্টারিও তৈরি করে।

একসময় যেসব বিষয়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত ছিল কঠোর, সেই বাস্তবতা একটা পর্যায়ে এসে পাল্টে গেছে। যে কারণে টিভি দেখা, ছবি তোলা, কনটেন্ট বানানো ইত্যাদি কার্যক্রম এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এমন মীমাংসিত ইস্যুও আবার সময়, বাস্তবতা ও রাজনীতির নানা সংকটের মধ্যে ধর্মীয় সমাজের কোনো কোনো অংশে নতুনভাবে তর্কবিতর্ক আকারে হাজির হয়।

মুসলিম সমাজে মূলত এ তর্কবিতর্ক শুরু হয়েছিল আরও আগেই—ছবি তোলা নিয়ে। ফটোগ্রাফি আবিষ্কৃত হয় ১৮৩৯ সালের দিকে। মুসলিম বিশ্বে যখন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার প্রযুক্তি আসে, তখন থেকেই এটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়, বিশেষ করে তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্য (বর্তমানে তুরস্ক) ও মিসরে।

তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের দেওবন্দি আলেমরা দীর্ঘ সময় ধরে ছবি তোলাকে হারাম বলে ফতোয়া জারি রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তাঁরা ‘জরুরি প্রয়োজনে’ (দ্বীনি বা দুনিয়াবি বাধ্যবাধকতা) ছবি তোলাকে জায়েজ বলে স্বীকৃতি দেন। এখন স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে জরুরি প্রয়োজন ছাড়াও ছবি তোলা ধর্মীয় সমাজের জন্যও স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগের প্রভাব ও নতুন বাস্তবতা

একটা সময় সামগ্রিকভাবে সমাজে ধর্মীয় ইস্যুতে তর্কবিতর্কের যে প্রভাব ছিল, তা থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার সাম্প্রতিক তর্কবিতর্কের ধরনগত ও চরিত্রগত পার্থক্য আছে বলতে হবে। বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থার উত্থানের ঢেউ ও পরিচায়বাদী রাজনীতির প্রভাব দেশে দেশে ছড়িয়ে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা আছে। মতাদর্শ ছড়ানোর পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক-ভিউ-মনিটাইজেশনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ধর্মীয় নানা তর্কবিতর্ক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে নাজিয়া সামান্থার ড্রাম বাজানোর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো লুফে নেয় মূলত ক্লিকবেট কনটেন্ট হিসেবে। এ দেশে সাধারণত নারীদের ড্রাম বাজাতে দেখা যায় না। ফলে একজন নারীর ড্রাম বাজানো ঘটনাই হতে পারত মূল খবর। কিন্তু মনিটাইজেশনের যুগে সেটি থেকেও বেশি ‘অর্থকরী’ খবর হলো হজ করে এসে ও হিজাব পরে নারীর ড্রাম বাজানো। ফলে সংগীত বা ড্রাম বাজানোর প্রতি তরুণীর একাগ্রতা এখানে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল।

মনিটাইজেশনের জন্য ওই তরুণীকে ধর্মীয় তর্কবিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়ে তাঁর সামাজিক জীবন বিপর্যস্ত করে তোলা হলো। যার ফলে তাঁর বাবা ক্ষমা চাইতেও বাধ্য হন। যদিও ওই তরুণী বলেছেন, হিজাব পরেই যত দিন মন চায় তত দিন তিনি ড্রাম বাজিয়ে যাবেন। ধর্মীয়ভাবে এতে তিনি আপত্তি দেখছেন না, বরং এ নিয়ে যাঁরা কটূক্তি বা বাজে ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাঁর কাছে ধর্মীয়ভাবে সেটিই বরং বেশি আপত্তিকর।

মাহের খান সংগীতপ্রিয় তরুণদের একটি অংশের কাছে বিপুল জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে তিনি ব্যান্ড থেকে দূরে সরে যান। ব্যান্ডের ২৫ বছর পূর্তিতে দীর্ঘদিন পর গিটার হাতে মাহেরকে আবারও মঞ্চে দেখা যাওয়ায় ‘দ্বীনে ফেরা শহুরে তরুণদের’ অনেকে তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন। সোশ্যাল মিডিয়ার চরম আক্রমণের শিকার হন তিনি। যাকে তিনি ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করেছেন। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘যাঁরা নেতিবাচকতা ছড়িয়েছেন এবং রুচিহীন মন্তব্য করেছেন, তাঁদের উদ্দেশে বলছি—নিজেদের এত নিচে আনতে দেখে আপনাদের জন্য খারাপই লাগে।’

মীমাংসা-অমীমাংসার সীমা কোথায়

একসময় যেসব বিষয়ে ধর্মীয় সিদ্ধান্ত ছিল কঠোর, সেই বাস্তবতা একটা পর্যায়ে এসে পাল্টে গেছে। যে কারণে টিভি দেখা, ছবি তোলা, কনটেন্ট বানানো ইত্যাদি কার্যক্রম এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এমন মীমাংসিত ইস্যুও আবার সময়, বাস্তবতা ও রাজনীতির নানা সংকটের মধ্যে ধর্মীয় সমাজের কোনো কোনো অংশে নতুনভাবে তর্কবিতর্ক আকারে হাজির হয়। যেমন বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ কিংবা হিল্লা বিয়ে।

এ দেশের সাধারণ মুসলিম সমাজে বহুবিবাহ নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, ইসলামি শরিয়তে বৈধতা থাকলেও নিরুৎসাহিত করার পথই সুগম করা হয়েছে। অন্যদিকে শরিয়তে ও দেশীয় আইনে হিল্লা বিয়ে গর্হিত, নিন্দনীয় ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, এসব কাজকে ধর্মীয়ভাবে ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে মাসনা কলোনি ও হালালা সেন্টার নামে নতুন ফেনোমনা। এর মধ্য দিয়ে নতুন সংকটও হাজির হচ্ছে সমাজে।

‘বাংলাদেশের কালচার’ বইয়ে আবুল মনসুর আহমদ বিশদ আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, ধর্ম ইউনিভার্সাল বা বিশ্বজনীন হতে পারে, কিন্তু কালচার সব সময়ই রিজিওনাল বা আঞ্চলিক। দুনিয়ার সব মুসলমানের ধর্ম এক হতে পারে, কিন্তু দুনিয়ার সব অঞ্চলের সব মুসলমানের কালচার এক হওয়া অসম্ভব এবং প্রাকৃতিক কারণে অবাস্তব।

শুধু একটা দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও অঞ্চলভেদে বিভিন্ন মুসলিম সমাজে ধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চায় নানা বৈচিত্র্য ও পার্থক্য আমরা দেখি। সমাজে মত-দ্বিমত-মতপার্থক্য-মতবিরোধ থাকা সমাজের জন্যই জরুরি। তবে এতে যদি ঘৃণা ও বিদ্বেষচর্চা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন, হুমকি, সংঘাত যুক্ত হয়ে পড়ে, তা ধর্ম বা সংস্কৃতি উভয়ের ওপরেই আঘাত বলতে হবে। এতে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতিচর্চা বাধাগ্রস্ত হয়। নানা তর্কবিতর্কের মধ্যে এই বিবেচনাবোধ আমাদের মধ্যে আরও বেশি জোরালো হোক।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    ই–মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব