সাংবাদিকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

আরশাদ সাংবাদিক হলেও তাঁর পরিবারকে সামরিক পরিবারও বলা যায়। তাঁর বাবা ও ভাই সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। তবে পারিবারিক সেই ঐতিহ্যের বাইরে এসে ছাত্রাবস্থাতেই সাংবাদিকতায় যুক্ত হন আরশাদ। অথচ পড়ছিলেন ব্যবসায় প্রশাসন এবং মাঝবয়সেই খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেছিলেন তাঁর পেশাগত দক্ষতায়। একসময় দৈনিক ডনের ইসলামাবাদ ব্যুরো চিফ হিসেবে কাজ করেছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে মূল সফলতা এলেও আরশাদের সাংবাদিকতার ধরন নিয়ে পাকিস্তানের মিডিয়াজগতে ভিন্নমতও আছে। কেউ কেউ তাঁর কাজে অতিরিক্ত রাজনৈতিক পক্ষপাতের আলামত দেখান। বিশেষ করে গত বছরগুলোতে তিনি ইমরানের দলের মতো করে ভাবছিলেন অনেক কিছু। ইমরানের শাসনকালে সামরিক-বেসামরিক আমলতন্ত্রের মতামতের প্রতিফলন দেখা যেত তাঁর পেশাগত কাজে। বালুচ ও পশতুন অধিকারকর্মীদের তিনি অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতেন। ফলে তাঁর মৃত্যু দেশটির সংবাদকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। যদিও সবাই এই মৃত্যুর তদন্ত ও বিচার চাইছেন।

নষ্ট রাজনীতি যখন সত্যকে গ্রাস করে ফেলে

রাজনীতি ও প্রশাসন যেসব দেশে দুর্নীতিগ্রস্ত, সেখানে জনগণ সত্য জানতে ভরসা করেন গণমাধ্যমের ওপর। চান অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। কিন্তু এ রকম দেশগুলোতে অনুসন্ধানকারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার কেউ নেই। আরশাদের মৃত্যুর পর পাকিস্তান টুডে ২৭ অক্টোবর লিখেছে, দেশটিতে ২০০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ১১৮ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। ২০২১-এর মে থেকে ২০২২-এর এপ্রিল পর্যন্ত প্রচারমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা বা তাঁদের কাজে বাধা দেওয়ার ৮৬টি অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে। এ রকম ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ইসলামাবাদে। সেটাও আরেক বিস্ময়ের দিক।

সাংবাদিকদের স্তব্ধ করা কর্তৃত্ববাদী শাসকদের দেশে মামুলি ঘটনা আজকাল। কিন্তু আরশাদের মৃত্যু পাকিস্তানকে আয়নায় মুখ দেখতে বাধ্য করছে। উত্তেজনাটা এমনই যে ফয়সাল মসজিদে তাঁর জানাজায় প্রায় চার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করতে হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ভালোই আন্দাজ করছে, জন–অসন্তোষ কত তীব্র; সেই জন্য এ রকম পাহারা। আরশাদের জানাজায় ইসলামাবাদে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসমাবেশ হয়। তাতে এই হত্যার বিচারের দাবিও ওঠে। সরকারকে অবশ্যই এ ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য উপসংহার টানতে হবে। কিন্তু উত্তাল রাজনৈতিক বাদানুবাদে প্রকৃত সত্য কেউ বিশ্বাস করবে কি?

আরশাদের দেশত্যাগ নিয়ে রহস্য

৪৯ বছর বয়সী আরশাদের মৃত্যুর খবর প্রথম আসে নাইরোবি-মাঘাদি মহাসড়কের দুর্ঘটনা হিসেবে। এ বছরের ১০ আগস্ট তিনি দেশ ছাড়েন। পেশোয়ার থেকে প্রথমে দুবাইয়ে যান। সেখান থেকে নাইরোবি। পাকিস্তানি নাগরিকেরা যেসব দেশে বিমানবন্দরেও ভিসা নিতে পারেন, এর মধ্য কেনিয়া আছে। আরশাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৩টি মামলা ছিল। সর্বশেষ ২২ মে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়। স্বভাবত দেশে থাকতে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না তিনি।

মৃত্যুকালে আরশাদ কেডিজি ২০০ এম নম্বরের একটি গাড়িতে ছিলেন। কেনিয়ায় প্রথমে খবর বের হয়, তাঁকে ভুল করে গুলি করেছে স্থানীয় পুলিশ। এখন সেখান থেকে ভিন্ন ধাঁচের খবর আসছে। নাইরোবিতে সবাই পুলিশের ভাষ্য বিশ্বাস করছে না। নাইরোবির এক সাবেক গভর্নর মাইক সংকোকে উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান থেকে ওই দেশে সম্পদ পাচার নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন আরশাদ। এর মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হলো।

মৃত্যুর সময় আরশাদের সঙ্গে ছিলেন জনৈক খুররম আহমেদ। তিনি ঘটনায় অক্ষত আছেন। গাড়িচালকেরও কিছু হয়নি। পুরো গাড়িতে কেবল একজন একাধিক গুলি লেগে মারা গেল, এ–ও জনগণ স্বাভাবিক মানতে পারছেন না।
ইতিমধ্যে পাকিস্তান থেকে তদন্ত কর্মকর্তারা নাইরোবি ছুটে গেছেন ঘটনার বিস্তারিত জানতে। তদন্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিআইজি পুলিশ। সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু প্রথাগত তদন্তের আগেই বিষয়টা চলে গেছে পাকিস্তানের রাজনীতির ময়দানে। তথ্য বেরিয়েছে, আরশাদ প্রাণে মারার হুমকির পরই দেশ ছেড়েছিলেন। প্রশ্ন উঠেছে, এই হুমকি কে দিল?

প্রতিক্রিয়া দেখাল আইএসআই

আরশাদের মৃত্যুতে সবচেয়ে নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) নামে পরিচিত সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ। এর প্রধান সচরাচর প্রচারমাধ্যমকে সময় দেন না। কিন্তু ২৭ অক্টোবর এর প্রধান লে. জেনারেল নাদিম আনজুম সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে আসেন এবং পরোক্ষে ইমরান খানের দিকে ইঙ্গিত করেন দেশটিতে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জন্য। আইএসআই জানাচ্ছে, আরশাদের বিদেশযাত্রার আয়োজন করেছে পিটিআইপন্থী ‘এআরওয়াই নিউজ’ এবং এতে সহায়তা করেছে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক সরকার স্থানীয় সন্ত্রাসীদের থেকে ‘হুমকি’র ব্যবস্থা করে। আরশাদের বিরুদ্ধে আসলে বিশ্বাসযোগ্য কোনো হুমকি ছিল না। আইএসআইয়ের এ রকম দাবির উত্তাপ লেগেছে সরাসরি ইমরানের গায়ে। কারণ, খাইবারে সরকার চালাচ্ছে ইমরানের পিটিআই।

আইএসআইয়ের এ বক্তব্যের সঙ্গে ইমরান খানের কিছুদিন আগেকার বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়। যখন তিনি বলেছিলেন, আরশাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় তালেবানদের ক্ষোভ আছে এবং সে জন্য তিনি তাঁকে দেশ ছাড়তে বলেছেন।

ইমরান খান আরশাদের মৃত্যুসংবাদ আসামাত্র একে ‘খুন’ উল্লেখ করে টুইট করেছেন। সরকারের দিকে যেকোনো খারাপ ইঙ্গিতের সুযোগই তিনি হাতছাড়া করতে চাইবেন না, সেটা স্বাভাবিক। ইমরানের এই টুইটে জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ইমরানের দলের এক নেতা এ–ও দাবি করেছেন, ‘আরশাদের হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে পাকিস্তানেই এবং হত্যার সাক্ষ্য ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’

জনগণ বিক্ষুব্ধ

আরশাদের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের সম্পর্ক ভালো নয়। আবার দেশটির সামরিক গোয়েন্দা বিভাগও তাঁর ওপর ইদানীং ক্ষুব্ধ ছিল। আরশাদ পাকিস্তান ছেড়েছিলেন গোপনে। এসব তথ্য জনমানসে থাকায় আরশাদের মৃত্যু পাকিস্তানের নাগরিকদের অনেক কিছু ভাবাচ্ছে।

ইমরান খান আরশাদের মৃত্যুসংবাদ আসামাত্র একে ‘খুন’ উল্লেখ করে টুইট করেছেন। সরকারের দিকে যেকোনো খারাপ ইঙ্গিতের সুযোগই তিনি হাতছাড়া করতে চাইবেন না, সেটা স্বাভাবিক। ইমরানের এই টুইটে জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ইমরানের দলের এক নেতা এ–ও দাবি করেছেন, ‘আরশাদের হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে পাকিস্তানেই এবং হত্যার সাক্ষ্য ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’

বিপরীত দিকে আইএসআই ইমরানের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আরশাদ শরিফের যুক্ত থাকার দাবি করছে। তাদের মতে, এসবে ‘এআরওয়াই নিউজ’–এর মুখ্য নির্বাহী সালমান ইকবালও আছেন। আরশাদ সর্বশেষ এই নিউজ চ্যানেলে কাজ করতেন এবং এই নিউজ চ্যানেল দেশটির ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে ইমরানের সব বক্তব্যকে বেশ উদ্দামভাবে প্রচার দিয়ে গেছে বিগত মাসগুলোতে।

আলোচনায় সালমান ইকবাল

আরশাদের খুনের পর কেনিয়া থেকে প্রথম ফোনকল এআরওয়াইয়ের সালমান ইকবালই পান, আরশাদের পরিবারের কেউ নন। কেনিয়ায় সালমান ইকবালের একটা খামারবাড়ি আছে বলে জানা যায়। আইএসআই এসবের তদন্ত চাইছে এখন। তারা এমনকি জনগণের চাওয়ার সঙ্গে মিলে জাতিসংঘের অধীনও তদন্তে সম্মত আছে বলে জানিয়েছে। আইএসআইয়ের এ রকম নমনীয় সুরের কারণ অবোধগম্য নয়।

ইমরানের গত কয়েক মাসের প্রচারকৌশল এত দক্ষ ছিল যে পাকিস্তানের তরুণেরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠই মনে করে, ইমরান সরকারের পতনে সশস্ত্র বাহিনীর হাত রয়েছে। মানুষের এ রকম বিশ্বাস দেশটিতে সশস্ত্র বাহিনীকে ইমেজ–সংকটে ফেলেছে। দেশটির সেনাবাহিনী এ–ও মনে করে, ইমরানের এই প্রচারকৌশলে জনগণের সঙ্গে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, সেটা পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর।

জেনারেল আনজুম সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের জন্য সরাসরি ইমরানকে দোষারোপ করেন। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর প্রধান ও তাঁর পরিবার যে ইমরানের ক্রমাগত আক্রমণে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ, সেটাও জানান তিনি। ইমরান তাঁকে পার্লামেন্টে অনাস্থার হাত থেকে রক্ষা করে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করার বিনিময়ে বর্তমান সেনাপ্রধানের মেয়াদ বাড়ানোরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে আনজুম দাবি করেন। স্বভাবত ইমরানকে এখন এসব দাবি মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে।

তবে ইমরান এবং পাকিস্তান—উভয়ে জন্য সময়টা অনিশ্চয়তায় ভরা। দেশটি অপেক্ষা করছে নতুন সেনাপ্রধানের অপেক্ষায়। আগামী ৩০ দিনের ভেতর বর্তমান সেনাপ্রধানের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীর মতোই গুরুত্ব দিয়ে নজর রাখা হয় এই পদের নিয়োগের। ১৯৫১ সালে ১৬ জানুয়ারি আইয়ুব খানের এ পদে নিয়োগ থেকেই এ রকম গুরুত্ব তৈরি হয়েছে এবং বিগত সময়ের ১৬ জন সেনাপ্রধানের নিয়োগকে ঘিরেই এর সঙ্গে রাজনীতির মিশেল ঘটেছে। তবে এবার সেনাপ্রধান নিয়োগের গুরুত্ব আরও বেশি; কারণ, ঠিক এ সময়ই ইমরান লাহোর থেকে ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের ডাক দিয়েছেন। তাঁর দাবি নতুন নির্বাচন, আবার ক্ষমতায় ফিরতে চান তিনি। আর সশস্ত্র বাহিনী প্রকাশ্যেই তাঁকে অপছন্দের কথা জানিয়ে রেখেছে। ইমরান এবং আইএসআইয়ের চাওয়া-পাওয়ার এই ব্যবধানের মধ্যে হয়তো আরশাদ হত্যার রহস্য হারিয়ে যাবে। দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতার জন্য অবশ্যই একটা মুহূর্ত এটা।

  • আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ে গবেষক