ট্রাম্পের বিশ্বাসঘাতকতার জবাবে তাইওয়ান এখন কী করবে

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক আবারও পুরোনো এক প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।ছবি : রয়টার্স

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক আবারও পুরোনো এক প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তা হলো: চীন যদি তাইওয়ানে আক্রমণ করে, তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই তাইওয়ানের পাশে দাঁড়াবে?

সন্দেহবাদীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে শুরু করে পশ্চিম গোলার্ধে বিভিন্ন সামরিক তৎপরতা—এই সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার তালিকায় তাইওয়ান ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। ট্রাম্প নিজেও প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সাড়ে নয় হাজার মাইল দূরে’ একটি যুদ্ধের জন্য আমেরিকানরা কেন লড়বে? এমনকি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রিকেও তিনি ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ বলে উল্লেখ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এ ধরনের বক্তব্য সি চিন পিংয়ের জন্য একধরনের সুবিধা তৈরি করে।

শুধু ট্রাম্প কী বলছেন, সেটার দিকে তাকালে পুরো বাস্তবটা বোঝা যায় না। গত ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র আর তাইওয়ানের সম্পর্ক ভেতর থেকে অনেকটাই বদলে গেছে। এখন এই সম্পর্ক আর কোনো এক সরকারের ইচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বা দর-কষাকষির হাতিয়ারও নয়। বরং এটি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, সামরিক পরিকল্পনা, চিপশিল্প, অঙ্গরাজ্যগুলোর সহযোগিতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ—সব জায়গায় তাইওয়ান গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।

এই জটিল সম্পর্ক এতটাই বিস্তৃত যে কোনো মার্কিন প্রশাসনের পক্ষেই সহজে তা ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। একইভাবে, চীনের পক্ষেও এই বন্ধন দুর্বল করা কঠিন। একসময় বিশ্লেষকেরা রাষ্ট্রপতির প্রতিটি বক্তব্য খুঁটিয়ে দেখতেন তাইওয়ান নীতির ইঙ্গিত খোঁজার জন্য। এখন সেই যুগ প্রায় শেষ। উচ্চপর্যায়ের বক্তব্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সম্পর্কের স্থায়িত্ব এখন নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক গতি ও গভীরতার ওপর।

গত দুই বছরে তাইপে ও ওয়াশিংটনে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একই সময়ে চীন তাইওয়ানের ওপর নজিরবিহীন সামরিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তবু সম্পর্ক দুর্বল হয়নি, বরং আরও দৃঢ় হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল নিয়মিত তাইওয়ান সফর করছে, সাম্প্রতিক সময়ে সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির সদস্যরাও গিয়েছেন। অস্ত্র বিক্রিও অব্যাহত রয়েছে, এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। নতুন আইন স্বাক্ষর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও মজবুত করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে তাইওয়ান প্রণালিতে প্রতিরোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নতুন বাণিজ্যকাঠামোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

অতএব, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ এখন আর নির্ভর করছে না যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর। বরং তা নির্ভর করছে, মুক্ত বিশ্বের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ভেতরে তাইওয়ান কতটা গভীরভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারছে তার ওপর।

সবচেয়ে বড় বদলটা আসলে হয়েছে বেসরকারি খাতে। উন্নত চিপ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে তাইওয়ান এতটাই এগিয়ে যে এখন তাকে শুধু ঝামেলার জায়গা হিসেবে দেখা যায় না; বরং বিশ্ব অর্থনীতির খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। চীনের প্রভাব ছাড়া যে নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, সেটাও এখন বাস্তব, আর তার কেন্দ্রেই আছে তাইওয়ান।

এর একটা বড় উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় তাইওয়ানের চিপ কারখানা। শুধু এটুকুই নয়, তাইওয়ানের অনেক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টার, ইলেকট্রনিকস আর উন্নত প্রযুক্তির খাতে বিনিয়োগ করছে। আবার আমেরিকার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও তাইওয়ানে কাজ বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর ক্লাউড প্রযুক্তিতে। দুই পক্ষই ধীরে ধীরে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে।

আগে যুক্তরাষ্ট্র শুধু কথায় বলত, চীন থেকে আলাদা হতে হবে। এখন সেটা বাস্তবে ঘটছে। তাইওয়ানের বিনিয়োগে আমেরিকার শিল্প খাত নতুন গতি পাচ্ছে, আর নতুন প্রযুক্তির জন্য আমেরিকান কোম্পানিগুলো তাইওয়ানের ওপর ভরসা করছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে, যা তাইওয়ানের নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি—দুটোকেই প্রভাবিত করছে।

এর প্রভাব সাধারণ মানুষের মনেও পড়ছে। এখন অনেক আমেরিকান তাইওয়ানকে দূরের কোনো সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখেন, যে গণতান্ত্রিক এবং প্রযুক্তিতে শক্তিশালী। তাইওয়ান এখন শুধু নিরাপত্তার জন্য নির্ভরশীল নয়, বরং প্রযুক্তিগত শক্তির একটা ভিত্তি।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোও তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। অর্ধেকের বেশি অঙ্গরাজ্য এখন তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য বা বিনিয়োগে যুক্ত। তারা তাইওয়ানের বিনিয়োগ টানতে প্রতিযোগিতা করছে। অনেক জায়গায় শ্রমশক্তি গড়ে তোলার জন্যও চুক্তি হয়েছে। নিয়মিত অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিরা তাইওয়ান সফর করছেন, এবং এই সমর্থন এখন স্থায়ী রূপ পাচ্ছে। শুধু ২০২৫ সালেই ৩০টির বেশি অঙ্গরাজ্য আইনসভা তাইওয়ানের পক্ষে প্রস্তাব পাস করেছে।

একই সঙ্গে মানুষে মানুষে যোগাযোগও বাড়ছে। চীনে পড়াশোনা কমে যাওয়ায়, এখন অনেকেই মান্দারিন শেখার জন্য তাইওয়ানে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য, সাইবার নিরাপত্তা বা মানবিক সহায়তা—এসব ক্ষেত্রেও তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে।

এই সম্পর্কগুলো হয়তো সরাসরি সামরিক প্রতিশ্রুতির মতো শক্তিশালী নয়, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো শুধু ওয়াশিংটনেই সীমাবদ্ধ নেই—স্থানীয় অর্থনীতি, বিশ্ববিদ্যালয় আর সমাজের ভেতরেও তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন তৈরি করছে।

এখানেই একধরনের বৈপরীত্য রয়েছে। চীন বহুদিন ধরে তাইওয়ানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সামরিক চাপ, ‘ধূসর অঞ্চলের’ কৌশল এবং অর্থনৈতিক ভয় দেখানো—এসব পদক্ষেপ উল্টো ফল দিয়েছে। তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল না হয়ে বরং আরও শক্তিশালী হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার সংযুক্তি বেড়েছে, এবং এমন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে।

তবে এই পরিস্থিতির ঝুঁকিও আছে। তাইওয়ান যত বেশি পশ্চিমা প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, ততই চীনা নেতৃত্বের মনে হতে পারে যে জোর করে একীকরণের সুযোগের জানালা বন্ধ হয়ে আসছে। ফলে একদিকে প্রতিরোধ শক্তিশালী হলেও, অন্যদিকে সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সি চিন পিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগকে তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন দুর্বল হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রেখেছে, তা হয়তো আরও অস্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সম্পর্ক এখন কূটনৈতিক নাটকের চেয়ে অনেক বেশি গভীর কাঠামোগত শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে।

কংগ্রেস, প্রতিরক্ষা দপ্তর, অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, মেয়র, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি শিল্প—সবাই মিলে এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করছে। একই সঙ্গে, তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠানগুলোরও অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রণোদনা রয়েছে এই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

অতএব, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ এখন আর নির্ভর করছে না যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর। বরং তা নির্ভর করছে, মুক্ত বিশ্বের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ভেতরে তাইওয়ান কতটা গভীরভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারছে তার ওপর।

চ্যানিং লি স্পেশাল কম্পিটিটিভ স্টাডিজ প্রজেক্টে গ্লোবাল পার্টনারশিপস-এর পরিচালক এবং ‘স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড’ পডকাস্টের সঞ্চালক।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ