হাম থেকে বাঁচার সুরক্ষা বলয়ের এই ফাটল সারাব কীভাবে

হামে আক্রান্ত এক শিশুকে নেবুলাইজ করা হচ্ছে। রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে।ছবি : মীর হোসেন

ঢাকা শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো এখন রোগীতে উপচে পড়ছে। তীব্র ফ্লুরোসেন্ট আলোর নিচে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ছোট ছোট শিশুদের। এটি কয়েক দশক আগের কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়; বরং ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকের এক নির্মম বাস্তবতা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে; আর প্রতিদিন নতুন করে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

আমাদের স্বাস্থ্য তথ্য নজরদারি বা সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বিবেচনা করলে প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়ে অনেক বেশি।

অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ আমাদের সবচেয়ে অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। যে দেশটি একসময় রোগটি প্রায় নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, তাদের জন্য এটি এক চরম বৈপরীত্য।

বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি টিকাদান কর্মসূচি এত দ্রুত কীভাবে ভেঙে পড়ল? প্রাপ্ত প্রমাণগুলো ভাইরাসের কোনো আকস্মিক রূপান্তরের দিকে ইঙ্গিত করে না; বরং এটি প্রশাসনিক গাফিলতি, নীতির পরিবর্তন এবং সরবরাহব্যবস্থার পুঞ্জীভূত ব্যর্থতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। দেশজুড়ে হাম ও রুবেলার টিকার পাশাপাশি সিরিঞ্জের মতো অতি প্রয়োজনীয় উপকরণের মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার পরও সেই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় গড়ের হিসাব অনেক সময় বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে ‘জিরো ডোজ’ অর্থাৎ এক ডোজ টিকাও না পাওয়া শিশুদের বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। এই শিশুরা পুরোপুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

রোগ সব সময়ই সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত হানে। যেখানে বিশুদ্ধ পানি ও নিয়মিত চিকিৎসা পৌঁছায় না, ভাইরাস সেখানেই বিস্তার লাভ করে।

বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বেশি কেন্দ্রীভূত। যেমন কড়াইল ও মোহাম্মদপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তসংলগ্ন ‘জটিল’ অঞ্চলগুলো।

এই অতি ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে একটি মহামারি কেবল জীববৈজ্ঞানিক ঘটনা থাকে না; বরং তা একটি সামাজিক সংকটে রূপ নেয়। এটি বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।

আরও পড়ুন

বর্তমান উদ্বেগ ও সংকট

এই তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য–সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে স্বচ্ছতার অভাব এবং টিকার সরবরাহ–ব্যর্থতার কারণ নিয়ে বিভ্রান্তিকর বয়ান।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকা ক্রয়পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। সেখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি থেকে সরে আসার ফলে বিলম্ব ঘটেছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আরও জটিল চিত্র সামনে আসে। মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি রোধের জন্যই সরাসরি ক্রয়–পদ্ধতি (ডিপিএম) থেকে উন্মুক্ত দরপত্র–পদ্ধতির (ওটিএম) দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন এই পদ্ধতিতে তখনো কোনো টিকা কেনা হয়নি। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যদি নতুন পদ্ধতি কার্যকর না হয়ে থাকে, তাহলে আগের পদ্ধতিতেই কেন সময়মতো টিকা কেনা হয়নি? এটি কি শুধুই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা?

এমন সন্দেহের যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে এখন দায় চাপানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরাসরি ক্রয়–পদ্ধতিতে অনিয়মের সুযোগ বেশি থাকে এবং যাঁরা এতে লাভবান হন, তাঁদের জন্য এই সংকটের দায় সংস্কারের ওপর চাপানোই সহজ।

প্রশ্ন উঠতেই পারে—সরকার কবে প্রথম টিকার ঘাটতির সতর্কবার্তা পেয়েছিল? যদি মজুত থাকত, তাহলে তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়নি কেন?

নজরদারি তথ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। একদিকে ড্যাশবোর্ডে টিকার কাভারেজ কম দেখাচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, এটি ৯০ শতাংশের বেশি। এই গরমিল প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপনার বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

এই বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে বড় সংকট এখন হাসপাতালগুলোতে। শিশুদের অবস্থা খারাপ হলে অভিভাবকেরা আইসিইউ শয্যার জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।

যখন কোনো ক্লিনিকে গিয়ে বলা হয়, টিকা নেই বা হাসপাতালে বেড নেই। তখন বোঝা যায় এই চাপ অনেক আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল, যা আমরা উপেক্ষা করেছি।

অথচ এখনো সমাধানের বদলে রুদ্ধদ্বার বৈঠক আর সীমিত তথ্য প্রকাশেই বিষয়টি আটকে আছে। মহামারির সময় ভুল তথ্য ও আতঙ্ক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। স্বচ্ছতার অভাবে জনগণের আস্থা সবার আগে নষ্ট হয়।

আরও পড়ুন

সুপারিশ ও উত্তরণের উপায়

এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা পুনর্গঠনের জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করা প্রয়োজন, তবে এটি কখনোই নিয়মিত টিকাদানের বিকল্প হতে পারে না।

প্রথমত, অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও বহুমাত্রিক জাতীয় প্যানেল গঠন করতে হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা, আইইডিসিআরের এপিডেমিওলজিস্ট, মাঠপর্যায়ের চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও স্বাধীন পরিসংখ্যানবিদদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, টিকাদান কৌশলকে আরও সুনির্দিষ্ট ও বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। দ্রুত ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’ চালু করা জরুরি—অর্থাৎ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর তার সংস্পর্শে আসা সবাইকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দেওয়া।

একই সঙ্গে একটি স্থায়ী জাতীয় টিকা ক্রয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা সরকার পরিবর্তন হলেও স্থিতিশীল থাকবে। টিকার বাফার স্টক ও সিরিঞ্জের মজুত যেন কখনো ফুরিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে আগাম পরিকল্পনা থাকতে হবে। সরবরাহব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনার আগে যথাযথ রূপান্তর পরিকল্পনা থাকা জরুরি, তবে স্বচ্ছতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

তৃতীয়ত, সংকট মোকাবিলায় প্রতিদিন উন্মুক্ত পাবলিক ব্রিফিং চালু করতে হবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন বা প্রশাসনিক বিলম্ব—কোনো কিছুকেই এই ভাইরাস ছাড় দেয় না। এই সংকট মোকাবিলার পর অবশ্যই একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে, যাতে ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করা যায়। টিকাদান কর্মসূচিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় আর না ঘটে।

হাসপাতালের শয্যার অবস্থা ও সক্ষমতা নিয়ে একটি লাইভ ড্যাশবোর্ড চালু করা উচিত। সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে বেসরকারি আইসিইউ সেবায় ভর্তুকি দিতে হবে এবং বেসরকারি খাতকে আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এত বড় প্রাদুর্ভাব এবং শিশুমৃত্যুর হার সত্ত্বেও এখনো কেন ‘জাতীয় জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা হয়নি?

২০২৬ সালের এই হামের সংকট আমাদের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তন বা প্রশাসনিক বিলম্ব—কোনো কিছুকেই এই ভাইরাস ছাড় দেয় না। এই সংকট মোকাবিলার পর অবশ্যই একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে, যাতে ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করা যায়। টিকাদান কর্মসূচিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় আর না ঘটে।

  • ডা. আরিফুজ্জামান খান, পিএইচডি, অ্যাডভান্সড এপিডেমিওলজিস্ট, ওয়াইড বে পাবলিক হেলথ ইউনিট এবং অনারারি সিনিয়র লেকচারার, স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।

    *মতামত লেখকের নিজস্ব।