ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিযুক্ত হলেন। তাঁর কাছে ঢাকা নিয়ে প্রত্যাশা কী? ঢাকা নিয়ে কথা বলতে গেলেই যেন ঢাকা পড়ে যাই, মুক্ত থাকি না! ঢাকা পড়ে যাই সংকটে, বৈষম্যে, দূষণে-দুর্ভাবনায়-অস্থিরতায়, উদ্বেগে।
অথচ মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের কত কত লড়াই। সর্বশেষ রক্তাক্ত লড়াইয়ে ঘটল কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে জুলাই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান। কিন্তু আমরা কতটা মুক্ত হলাম?
নতুন বন্দোবস্তের কথা হলো অনেক, কিন্তু কাঠামো থেকে গেল পুরোনো বন্দোবস্তের। ঢাকাও তাই। জুলাই আন্দোলনে দেয়াল ভরে উঠল গ্রাফিতিতে, কত রেটরিক হলো, কিন্তু হলো না রিকনস্ট্রাকশন। এত এত সংস্কার আলাপে ঢাকা নিয়ে হলো না নীতিনির্ধারকদের কোনো সংস্কার আলাপ।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণায় কিছুটা আলোচনায় এল বটে ঢাকা, তা-ও নাগরিকদের মতামতের চাপে, ভোট বিবেচনায়। বিএনপি চেয়ারম্যান ও নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কয়েকটা সভায় দেখা গেল কিছু কর্মসূচিও তুলে ধরতে। তারপরও প্রশ্ন থাকে রাজনীতিবিদেরা কতটা শুনতে পান রাজধানীর আর্তনাদ?
‘এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু’—কবীর সুমনের এই গানের মতোই ঢাকা আমার প্রথম সবকিছু। এখানেই জীবনের প্রথম আলো। হাওয়া-জলে বেড়ে ওঠা, স্কুল যাওয়া কিংবা পালানো, বন্ধু-স্বজন-প্রেম-বিয়ে-সন্তান আর শত সহস্র মানুষ, যারা আমাকে শিখিয়েছে ভালোবাসতে, লড়তে, দাঁড়াতে। এমনই কোটি মানুষের গল্পের এই শহর, যেখানে জন্ম নিয়েছে ’৫২, ’৬৯, ’৭১; আর এই তো সেদিনের ’২৪। যে শহর আমাদের একদিন দিয়েছে ‘দম’, সে নিজেই হয়ে পড়ছে এখন ‘ডুম’!
আমাদের হাতেই মরছে পৃথিবীর বড় শহর!
আমরা অনেকেই বলি জাদুর শহর ঢাকা। স্বপ্ন নিয়ে আসি এখানে, কিন্তু প্রতিদিন আমাদের স্বপ্নগুলোকে এক এক করে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিতে হয় এবং এভাবে একদিন এই শহর নিজেও জাদুঘরে যাবে? আমাদের হাতেই মরছে এই শহর। এই শহরের মৃত্যুর কারণগুলো যদি দেখি, প্রথমেই যা ভাবায় তা হলো—জনসংখ্যা। জাতিসংঘ বলছে, জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আর ২০৪৫ সালে এটাই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে ‘বড়’ শহর!
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ওয়েবসাইটে বলা আছে, এই এলাকায় মানুষ আছে ১ কোটি ২০ লাখ। ঢাকা উত্তর সিটির ওয়েবসাইটে বলা আছে, সে এলাকায় লোক আছে ৫৫ লাখ। দুই সিটি মিলিয়ে মোট আছে ১ কোটি ৭৫ লাখ লোক। বিবিএস বলছে, ঢাকায় মোট লোক আছে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। অন্যদিকে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক/সামাজিক বিষয়ক বিভাগ বলছে, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। নগরবিদদের ধারণা, ২ কোটি ১০ লাখ। আর ঢাকার উত্তরে থাকা ৮০ ভাগ লোক নিম্ন-মাঝারি জীবন যাপন করে। কতটা নিম্নমানের এ জীবন, তা বোঝা যায় যখন তাকাই বাতাসের দিকে, পানির দিকে, আবাসনের দিকে, রাস্তার দিকে।
ঢাকায় থাকলে সাত বছর কম বাঁচি, কারণ নগর মানুষের মতো! মানুষের হৃৎপিণ্ড অসুস্থ মানে যেমন গোটা শরীর অসুস্থ, তেমনি রাজধানী অসুস্থ মানে গোটা দেশ অসুস্থ। এখানে অসুস্থ বায়ু। ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা। রিকশার ব্যাটারি থেকে ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী বিষ। ঢাকায় থাকলে সাত বছর কম বাঁচি! শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী—বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার গড় আয়ু কমছে সাত বছর সাত মাস।
আর সারা দেশের গড় আয়ু কমছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। তাহলে গড় আয়ু ৭২ বছর হলে ঢাকায় থাকলে এই বায়ুদূষণের কারণে আমরা বাঁচি মাত্র ৬৫ বছর।
এখানে ‘অসুস্থ’ পানি
প্রতিবছর ঢাকার পানির স্তর গড়ে তিন মিটার করে নিচে নামছে। সুয়ারেজ লাইন লেকে গিয়ে পড়েছে। ৪৫ শতাংশ পানির নমুনায় পাওয়া গেছে ব্যাকটেরিয়া, আয়রন ও অ্যামোনিয়া। ঢাকার ৮০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানিতে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও লেডের মাত্রা সীমা অতিক্রম করেছে। এমনই জানাচ্ছে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ স্ট্রাটেজিস (বিআইএইচএস)।
প্রতিদিন ৮ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে? শহর এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩৩ হাজার ৫৭৪ টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। ঢাকায় প্রতিদিন ৮ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য নতুন যুক্ত হচ্ছে। এই বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা কী? এই বর্জ্যেই ভরে উঠছে আমাদের লেক, খাল, নদী।
ঢাকার জন্য নেই সাশ্রয়ী আবাসন
কড়াইল বস্তিতে ১০ বার আগুন লেগেছে গত ১২ বছরে। বিবিএস বলছে, রাজধানীতে প্রায় ৪ হাজার বস্তিতে ৪০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে। তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত, কাজের সন্ধানে আসা ৫০.৯৬ শতাংশ ও দারিদ্র্যের কারণে আসা ২৮.৭৬ শতাংশ মানুষ। এই মানুষগুলোর আবাসনের ব্যবস্থা কী?
ঢাকার মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ ফ্ল্যাট নিম্নমধ্যবিত্তদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ (সিএইচবিআর)-এর তথ্যমতে, ঢাকার বাসিন্দারা তাঁদের আয়ের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ আয় কেবল বাড়ি ভাড়ার পেছনে ব্যয় করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়ে অনেক (৩০ শতাংশ) বেশি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) বলছে, একজন সাধারণ মানুষের বার্ষিক আয়ের তুলনায় ফ্ল্যাটের দাম ১২.৫ গুণ বেশি। নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য এই অনুপাত অনেক ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২১ গুণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আর গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাসা ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ।
অসুস্থতার আরেক নাম পাবলিক টয়লেট
দুই সিটি করপোরেশনে সব মিলিয়ে মোট ১৯৪টি পাবলিক টয়লেট আছে। ঢাকায় প্রতিদিন যাতায়াত করে প্রায় এক কোটি মানুষ। প্রায় প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য মাত্র একটি টয়লেট। ৮০ শতাংশ পাবলিক টয়লেটে পানি, সাবান বা টিস্যু নেই। ৯০ শতাংশ টয়লেটে পর্যাপ্ত আলো বা নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুপস্থিত, যা নারীদের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পাবলিক টয়লেট ছাড়া কীভাবে নিরাপদ হবে প্রাথমিক জনস্বাস্থ্য?
স্বাস্থ্যসেবা নেই জনগণের দোরগোড়ায়
ঢাকা উত্তরে ৫৪টি ওয়ার্ডের মাত্র ২৫টিতে ৩৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা আছে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী, স্বাস্থ্য–ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ টাকা নাগরিকেরা নিজের পকেট থেকে খরচ করেন। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে, প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে শয্যার সংখ্যা মাত্র ০.৪টি। নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসী মানুষের প্রায় ৮০ শতাংশ চিকিৎসার জন্য ওষুধের দোকান বা হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল (বিশ্বব্যাংক ও বিআইডিএস)।
সংকটের আরেক নাম গণপরিবহন
বিআরটিএ নিবন্ধন দিয়েছে ৪৩ হাজার ৬৭৬টি বাস। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই ফিটনেসবিহীন। প্রতিটি রুটে অন্তত ১০টির মধ্যে ৮টি বাসই দৃশ্যমানভাবে ফিটনেসবিহীন। একদিকে অপর্যাপ্ত, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের হাতে বন্দী গণপরিবহন। গণপরিবহন ছাড়া চলতে পারে একটা নগর?
অচল শহর অর্থনীতি কীভাবে সচল করবে
যানজটে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ৪.৮ কিলোমিটার। প্রতি ২ ঘণ্টায় ৪৬ মিনিট যানজটে আটকে থাকতে হয় (বুয়েট গবেষণা)। অচল শহর অর্থনীতি কীভাবে সচল করবে? কীভাবে সচল হবে ঢাকা?
কীভাবে হবে নিরাপদ নগর
ঢাকার প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। (বিআইডিএস)
গড়ে প্রতি ৬৩০ জন নাগরিকের জন্য মাত্র ১ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত। অথচ আদর্শ নিয়ম হলো—প্রতি ২৫০ জনে ১ জন পুলিশ থাকবে। এই অবস্থায় কীভাবে হবে নিরাপদ নগর?
এ নগর নারীর জন্য নয়
গণপরিবহনে ৮৭ ভাগ নারী মৌখিক, শারীরিক ও অন্যভাবে হয়রানির শিকার হন। আর কর্মক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ নারী কর্মী শারীরিক বা মানসিকভাবে হয়রানির শিকার (আইন ও সালিশ কেন্দ্র)। নগর কীভাবে নারীর হবে?
মরেও শান্তি পাবে না মানুষ?
এখানে স্থায়ী কবরের দাম ৪ কোটি টাকা! শান্তিতে মরতেও পারবে না মানুষ কিংবা মরেও শান্তি পাবে না মানুষ?
ওমর সাদাত নগর অধিকারকর্মী ও সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
মতামত লেখকের নিজস্ব