৩ জুলাই ইরানের রাজধানী তেহরানে ইমাম খোমেনি মোসাল্লা গ্র্যান্ড মসজিদে শুরু হয় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান।
৮৬ বছর বয়সী এই নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ অভিযানের প্রথম বিমান হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। শোকানুষ্ঠানের শুরু থেকেই একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়—ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এবং উম্মাহর ধর্মীয় ঐক্য অটুট থাকবে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই জানাজায় অংশ নেন।
এটি ছিল ছয় দিনের এক দীর্ঘ যাত্রার সূচনা, যা কোম, নাজাফ ও কারবালা অতিক্রম করে ৯ জুলাই মাশহাদের ইমাম রেজা দরগাহে দাফনের মাধ্যমে শেষ হওয়ার কথা।
কিন্তু এই আয়োজন কি শুধুই একটি জানাজা, নাকি তার চেয়েও বড় কোনো রাজনৈতিক-ধর্মীয় বার্তা বহন করে—এ প্রশ্নই সামনে এসেছে।
এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কাড়ে সৌদি আরবের উপস্থিতি। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খুরাইজি একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
তাঁরা তেহরানে এসে আনুষ্ঠানিক শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন। এই অংশগ্রহণ ছিল একদিকে সতর্ক, অন্যদিকে প্রতীকী দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আঞ্চলিক প্রভাব ও পশ্চিমা শক্তির ভূমিকা নিয়ে ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব চলমান থাকলেও এই উপস্থিতি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি নতুন দিক তুলে ধরে।
২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরব কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার ছিল।
তবু বাস্তবে দুই দেশ বহু ক্ষেত্রে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। সে প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে, ধর্মীয় সংহতি এখনো আঞ্চলিক ঐক্যের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে থাকতে পারে।
অনেকের কাছে সৌদি আরবের এই ‘অপ্রত্যাশিত’ উপস্থিতি একটি বড় বার্তা। বার্তাটি হলো আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাত সমসাময়িক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও উম্মাহকে একত্র করতে পেরেছে।
একই সঙ্গে এটি ইরান-সৌদি উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দেয় এবং ইরানের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে একধরনের প্রকাশ্য স্বীকৃতি দেয়; যদিও সৌদি আরব ইরানের মতাদর্শকে সরাসরি সমর্থন করেনি।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিবর্তে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতি ছিল একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
এতে যেমন কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখা হয়েছে, তেমনই পশ্চিমা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইরান, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক অবস্থান ধরে রাখার প্রচেষ্টাও এতে স্পষ্ট।
এই জানাজায় ইরান কূটনৈতিকভাবে মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরিয়ে স্থিতিশীলতা ও সম্প্রসারণের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এর জন্য তারা বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে সামনে এনেছে।
সৌদি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে সুরা আলে–ইমরানের একটি আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। আয়াতটি বদরের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে। এই আয়াতের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়—জয় নির্ভর করে না সামরিক শক্তি, কৌশলগত জোট বা সংখ্যার ওপর; বরং আল্লাহর পথে সংগ্রামের ওপর।
এই আয়াতকে একদিকে যেমন বহিরাগত শক্তি (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) থেকে নিজেদের পৃথক করার আহ্বান হিসেবে দেখা হয়েছে, তেমনই এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি পুনর্মিলনের বার্তা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে, নিরাপত্তা ও শক্তির মূল উৎস ইমান ও আল্লাহর সহায়তা।
প্রতীকী দিক থেকে এই তিলাওয়াত ইরানের বেঁচে থাকার গল্পকে তুলে ধরে ইমান, প্রতিরোধ এবং আল্লাহর সমর্থনের মাধ্যমে। একই সঙ্গে এটি সাম্প্রদায়িক বিভাজন অতিক্রম করে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বানও জানায়।
জানাজার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইসলামি পরিচয়ের প্রতীকী ঐক্য। মতাদর্শ ও মাজহাবগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইরান মহররম মাসকে এই শোকানুষ্ঠানের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়ে একটি শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ ইসলামি পরিচয় তুলে ধরেছে।
ইসলামি চান্দ্রবর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের এই মাসে কারবালার যুদ্ধ হয়েছিল। এটি শোক, শাহাদাত, প্রতিরোধ ও সমষ্টিগত স্মৃতির প্রতীক। এটি মুসলিম সমাজে ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক ধারণা ও সামাজিক আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
কারবালা হয়ে জানাজার শোভাযাত্রা অতিক্রম করাও এই ঐতিহাসিক সংযোগকে সামনে আনে। ইরান খামেনিকে ‘প্রতিরোধের শহীদ’ হিসেবে তুলে ধরে এই জানাজাকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক তাৎপর্যে ভরিয়ে তুলেছে।
শিয়া মুসলমানদের কাছে মহররম অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক, আর সুন্নিদের কাছে এটি রোজা ও স্মরণের মাস। কিন্তু কারবালার যে প্রতীকী ভাষা, তা কেবল ইতিহাস নয়; এটি এক রাজনৈতিক ভাষা।
এই ভাষায় প্রতিটি মুসলমান, মতভেদ থাকলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মৃত্যুকে আত্মত্যাগ হিসেবে দেখে এবং শোকের মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়া জানায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ন্যায়বিচার, আনুগত্য, ত্যাগ, যন্ত্রণা ও নৈতিক দ্বন্দ্বের এক সমষ্টিগত ভাষায় পরিণত হয়েছে।
সৌদি আরবের উপস্থিতি ইসলামি সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের শক্তিকে আরও একবার সামনে আনে এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শকে একধরনের বৈধতা দেয়।
খামেনির পরবর্তী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে শুধু প্রশাসনিক নয়, এক পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। কারবালার ইতিহাসের সঙ্গে এই ধারাবাহিকতাকে যুক্ত করে আনুগত্যকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় করা হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালালেও এই জানাজা দেখিয়ে দিল—তেহরান এখনো তার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ককে কাজে লাগাতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধির উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, ইসলামি মূল্যবোধ ও সংহতির প্রশ্নে ওয়াশিংটন-তেল আবিবের নীতিকে পুরোপুরি অনুসরণ করতে অনীহা রয়েছে।
এই সম্পর্কগুলো ইরানকে চীন, ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে অ-পশ্চিমা জোটের মাধ্যমে নৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। যখন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা মূল্যবোধের ভিত্তিতে গণতন্ত্রের ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করছে, তখন ইরান তার নিজস্ব শোকযাত্রা ও কারবালার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং মতাদর্শিক গভীরতা তুলে ধরেছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও ধর্মীয় পরিচয় ও অভিন্ন মূল্যবোধ খামেনির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ধারাবাহিকতাকে বৈধতা দেয়।
এই সম্পর্কগুলো ইরানকে চীন, ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে অ-পশ্চিমা জোটের মাধ্যমে নৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়।
যখন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা মূল্যবোধের ভিত্তিতে গণতন্ত্রের ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করছে, তখন ইরান তার নিজস্ব শোকযাত্রা ও কারবালার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং মতাদর্শিক গভীরতা তুলে ধরেছে।
পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক যুদ্ধে কে জয়ী, তা এখনই বলা কঠিন। তবে ইরান এই জানাজার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আঞ্চলিক ঐক্যের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে এবং সেই ঐক্যের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের আছে।
আজিমাহ সলিম পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ে স্বতন্ত্র গবেষক।
দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।