দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ১৯৭৫ সালেও দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জাহাজ নির্মাণকারী শক্তি। তবে তখনই তার আধিপত্যে ভাটা শুরু হয়েছিল। শতাব্দীর শেষ দিকে সরকারি নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণশিল্প দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে চীন এগিয়ে যায় দ্রুতগতিতে। ২০১৫ সালে চীনের নৌবহর মোটামুটি যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছে যায়। পাঁচ বছর পর চীনের যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫০। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে তখন ছিল ২৯৩টি। ১৯৮৭ সালে মার্কিন নৌবহরে জাহাজ ছিল ৫৮৩টি। অর্থাৎ চার দশকের কম সময়ে তা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
জাহাজ নির্মাণেও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবধান বিশাল। বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ মিলিয়ে বর্তমানে বিশ্বের মোট জাহাজ নির্মাণের অর্ধেকের বেশি চীনে হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও বড় উৎপাদক। ২০২৫ সালে চীনের জাহাজ নির্মাণশালাগুলো ১ হাজার ৭০০টি জাহাজ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে মাত্র পাঁচটি।
আগামী দিনেও ব্যবধান বাড়ার আশঙ্কা আছে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে নৌবহরে ৪৩৫টি জাহাজ নিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ২০৩১ সালের মধ্যে ৫৮টি নতুন জাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ১৫টি হবে ‘ট্রাম্প শ্রেণির’ যুদ্ধজাহাজ। চীনের লক্ষ্যকে বাস্তবসম্মত মনে করা হলেও মার্কিন পরিকল্পনাকে অনেক বিশ্লেষক অবাস্তব বলে মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে জাহাজ নির্মাণশিল্প পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ‘শিপস ফর আমেরিকা আইন’-এ শিল্পে ভর্তুকি এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর নানা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলারের ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ‘মেরিটাইম অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য সামুদ্রিক শিল্পভিত্তি পুনর্গঠন করা। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্রদের কাছ থেকেও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ফ্লিট’-এর ‘ট্রাম্প শ্রেণির’ পারমাণবিক যুদ্ধজাহাজ আরও ব্যয়বহুল হবে। নকশা তৈরিতেই এক দশকের বেশি সময় লাগতে পারে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের হিসাবে পুরো কর্মসূচির ব্যয় ২৭৫ বিলিয়ন ডলার। প্রথম জাহাজটির খরচই হতে পারে ২৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য না হলেও এটি চালিয়ে যাওয়া নৌবাহিনীর বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
কিন্তু সমস্যা শুধু নতুন জাহাজ তৈরির সক্ষমতায় নয়। বিদ্যমান নৌবহর সচল রাখতেও যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ ব্যয় ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ২০ বছরের জট তৈরি হয়েছে। কিছু জাহাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই অবসরে পাঠাতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে নৌবহরের প্রস্তুতির হার নেমে আসে ৬৮ শতাংশে। নৌবাহিনীর লক্ষ্যমাত্রা ৮০ শতাংশ। ফলে ছয় মাসের মধ্যে অভিযান শেষ করার লক্ষ্যও পূরণ হচ্ছে না। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অবনতিশীল অবস্থা, ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের ৩২৬ দিনের অভিযান এবং সম্প্রতি ইউএসএস বেনফোল্ডে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট এই সংকটেরই লক্ষণ।
জাহাজ নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার অন্যতম কারণ ১৯২০ সালের ‘মার্চেন্ট মেরিন অ্যাক্ট’-এর ২৭ নম্বর ধারা, যা ‘জোনস অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত। এই আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য নিতে হলে জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত ও নির্মিত হতে হবে। মালিকানা ও নাবিকের ক্ষেত্রেও মার্কিন শর্ত রয়েছে। বিদেশে জাহাজ মেরামত করালেও ৫০ শতাংশ কর দিতে হয়।
দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে গিয়ে এই আইন উল্টো জাহাজ নির্মাণ ও পরিবহনকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করেছে। বড় জাহাজ নির্মাণকারী দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে একটি জাহাজ তৈরিতে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি খরচ হয়। বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় তিন গুণ। শ্রম ও উপকরণের উচ্চমূল্য এর বড় কারণ।
এর ফল ভয়াবহ। ২০২৫ সালে এক মার্কিন বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পণ্য পরিবহনের উপযোগী জোনস অ্যাক্টের আওতাভুক্ত জাহাজ ছিল মাত্র ৯২টি। এসব জাহাজের গড় বয়সও নিরাপদ ব্যবহারের সীমা ছাড়িয়েছে। নৌপথে পরিবহন এত ব্যয়বহুল যে রেল, সড়ক ও বার্জে পণ্য পাঠানো অনেক সময় সস্তা। ফলে ১৯৬০ সালের পর আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে নৌপথে পণ্য পরিবহন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে মার্চে ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানি ও সার পরিবহনে জোনস অ্যাক্টের ছাড় দেয়। আগস্টের শুরুতে সেই ছাড় আরও ৯০ দিন বাড়ানো হয়। ছাড় দেওয়ার পর উপসাগরীয় উপকূল থেকে পশ্চিম উপকূলে যত জেট জ্বালানি পাঠানো হয়েছে, আগের ৩৬ বছরে সম্মিলিতভাবেও এত পাঠানো হয়নি।
বিদেশি বড় জাহাজ নির্মাণশালাগুলো বাণিজ্যিক ও সামরিক—দুই ধরনের জাহাজই তৈরি করে। ফলে একই ইস্পাত, ইঞ্জিন, প্রপেলারসহ অনেক উপকরণ দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যায়। শ্রমিকেরা সহজ বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে জটিল সামরিক জাহাজ নির্মাণে যেতে পারেন। সামরিক চাহিদা কমলে একই শ্রমিককে বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণে কাজে লাগানো যায়। এ কারণে এসব দেশের শিল্প বেশি প্রতিযোগিতামূলক।
আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের ওপর শুল্কও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় বাড়াচ্ছে। ২০২৬ অর্থবছরে নৌবাহিনীর বাজেট ২৯২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জাহাজ নির্মাণে বরাদ্দ ৪৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বাড়তি ব্যয় মেটাতে শেষ পর্যন্ত হয় কর বাড়াতে হবে, নয়তো নৌবহরের আকার ও সক্ষমতা কমাতে হবে।
এর মধ্যে ট্রাম্পের কিছু ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল করছে। নৌবাহিনী বিমানবাহী রণতরিতে বৈদ্যুতিক চুম্বকনির্ভর বিমান উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পছন্দ করে। এটি সস্তা, কম নাবিক লাগে এবং দ্রুত বিমান ওঠানো-নামানো যায়। কিন্তু ট্রাম্প বাষ্পচালিত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। বিমানবাহী রণতরির নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারও তাঁর পছন্দের নান্দনিক অবস্থানে সরানোর সম্ভাবনা যাচাই করতে বলেছেন। এতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হবে, কিন্তু যুদ্ধক্ষমতা বাড়বে না।
প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ফ্লিট’-এর ‘ট্রাম্প শ্রেণির’ পারমাণবিক যুদ্ধজাহাজ আরও ব্যয়বহুল হবে। নকশা তৈরিতেই এক দশকের বেশি সময় লাগতে পারে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের হিসাবে পুরো কর্মসূচির ব্যয় ২৭৫ বিলিয়ন ডলার। প্রথম জাহাজটির খরচই হতে পারে ২৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য না হলেও এটি চালিয়ে যাওয়া নৌবাহিনীর বাজেটে বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
এই বিপুল ব্যয় কমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি প্রতিযোগীদের কাছ থেকে জাহাজ কিনতে হবে। তবে এতে দেশীয় বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প পুনরুজ্জীবিত হবে না। সে জন্য জোনস অ্যাক্ট বাতিল করা জরুরি।
তত দিন কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনে ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে জাহাজ ও যন্ত্রাংশ কেনাই বাস্তবসম্মত। নৌবাহিনীর বাজেটের একটি অংশ এ কাজে ব্যবহার করলে যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশে নির্মাণের খরচের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি জাহাজ কিনতে পারবে। একই সঙ্গে কম খরচে নৌবহরের সক্ষমতাও বাড়ানো সম্ভব হবে।
অ্যান ও ক্রুগার বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ