হয়তো কারও কারও মরদেহ মফস্‌সলে বা গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখানে আবার জানাজার পর দাফন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আত্মীয়স্বজন, কাছের বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীরা রাত নাগাদ নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাবেন। নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে দু-চারটা ভালো কথা বলবেন। হয়তো বলবেন, আহা রে, ভালো মানুষটা এত তাড়াতাড়ি চলে গেল।

ধর্ম আর মানুষভেদে এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা তারতম্য হতে পারে। তবে এটাও ঠিক, অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এটাই রুটিন প্রক্রিয়া।

২.

বলা বাহুল্য, এ চিত্র মনে ঘুরপাক খাচ্ছে ৮ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ দিন ধরে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সংবাদচিত্র সকাল-বিকেল দেখে দেখে। দেশি-বিদেশি যে চ্যানেলই ঘুরিয়েছি, প্রতিটিতে কমবেশি ছিল তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের খবর। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চার দিন চার রাত ধরে লাখো মানুষের শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি দেখে জেনেছিলাম ইংল্যান্ডের সবচেয়ে খ্যাতিমান ফুটবলার, তাদের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডেভিড বেকহামও লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে।

যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দূরদূরান্তের দেশ থেকে বহু সাধারণ মানুষ রানির প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছিলেন, লাইনে অপেক্ষা করেছেন ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা। ইউরোপের যে বড় দুটি দেশের বিপ্লবীরা তাঁদের রাজা-রানির সবচেয়ে বেশি বারোটা বাজিয়েছিলেন, সেই দেশ দুটি হলো ফ্রান্স আর রাশিয়া। রাজা-রানিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল পরিবার-পরিজনসহ, ফ্রান্সে ১৭৯৩ আর রাশিয়ায় ১৯১৮ সালে।

রানির শেষকৃত্যে তিনটি দেশ—রাশিয়া, বেলারুশ আর মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। যে দেশ সবচেয়ে বেশি রাজা-রানিবিরোধী, সেই ফ্রান্সেরও বহু সাধারণ মানুষ রানির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে লন্ডনে হাজির হয়েছিলেন।

লেখাটা শুরু করেছিলাম আমাদের সাধারণ জনের সম্ভাব্য শেষকৃত্যের কথা দিয়ে। এ মেঠো চিত্র অবশ্যই বড় নেতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সাধারণ নাগরিকের মতো তাঁরা কি ভাববেন বা ভাবেন তাঁদের শেষযাত্রার কথা? তাঁরা কি ভাববেন আমরা তাঁদের কীভাবে মনে রাখব? এই চিন্তা বা ভাবনা তাঁদের চারপাশের চাটুকারদের কথার ফুলঝুরিতে বুঁদ হওয়া থেকে বেরিয়ে এসেই ভাবতে হবে, এতে সবার মঙ্গল হবে আরও অনেক বেশি।

আমরা সবাই এই ১১ দিনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিত্র কমবেশি দেখেছি। ইদানীংকালের বিশ্বে এটাই সবচেয়ে বেশি জমকালো শেষকৃত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম সবচেয়ে জনবহুল শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, মহাত্মা গান্ধীর। তাঁর দেহভস্ম ছড়িয়ে দেওয়ার সময় গঙ্গার দুই পাড়ে ২০ লাখের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিল।

সময়ের ক্রমানুসারে, ১৯৬৩ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি আর একইভাবে ১৯৬৮ সালে নিহত মার্টিন লুথার কিংয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লাখো মানুষ সমবেত হয়েছিল। এরপর বৃহত্তর শেষকৃত্য ছিল মিসরের বিপ্লবী রাষ্ট্রপ্রধান জামাল আবদেল নাসেরের, ১৯৭০ সালে।

১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইরানের সবচেয়ে বেশি জনাকীর্ণ শেষকৃত্যানুষ্ঠানের জন্ম দিয়েছিল। তারপর জনঢল নেমেছিল ১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর শোকে। বর্তমান শতাব্দীতে সবচেয়ে বড় মৃত্যুশোকের ঘটনা ছিল ২০১৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্য। নেলসন ম্যান্ডেলাই নাকি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি রানি এলিজাবেথকে শুধু ‘এলিজাবেথ’ নামেই সম্বোধন করতেন। এর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘সে-ও তো আমাকে নেলসনই ডাকে।’

৩.

ইকুয়েটোরিয়াল গিনির বর্তমান প্রেসিডেন্ট—মহা লম্বা আফ্রিকান নাম, তাই স্মরণ করতে পারছি না—এ সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আবারও প্রার্থী হবেন। তাঁর ছেলে ওই দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে ‘বাবা এতবার, এত বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বলে আবারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ জানা কথা, আবারও জিতবেন।

নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর এই পরবর্তী মেয়াদ শেষ হতে হতে তাঁর শাসনামলের স্থায়িত্ব হয়ে যাবে প্রায় অর্ধশতাব্দী। নিঃসন্দেহে শাসনের অর্ধশতাব্দী পূর্তি উপলক্ষে যথাসময়ে সে দেশে বিকট ধরনের জমকালো একটা অনুষ্ঠান হবে।

আমাদের মতো দেশের বড় বড় নেতা তাঁদের শাসনামল শেষে দেশের নাগরিকেরা তাঁদের কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটা নিয়ে ভাবেন কি না, জানি না। বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের শাসনামল শেষ হলে তাঁদের একটা অবসরকালীন প্রধান কাজ হয় রাষ্ট্রীয় খরচে নিজ নিজ নামে প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরির স্থাপন এবং সেটা গোছানো। খুব নিকট অতীতে স্থাপিত হয়েছে জিমি কার্টার প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরি। রোনাল্ড রিগ্যান, বিল ক্লিনটন থেকে বারাক ওবামার নামেও প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এ কাজে নজর দেওয়ার সময় হয়তো এখনো পাননি।

আমাদের বড় নেতাদের জীবনদর্শন, কীর্তি, অবদান এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলাদা বিশেষায়িত গ্রন্থাগার এখনো আমরা গড়তে পারিনি।

৪.

১৯৬২ সালে, যত দূর মনে পড়ে, সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। থাকতাম ঢাকার বেইলি রোডে। বলা বাহুল্য, সেই বয়সে রাজনীতির লাড্ডুও বুঝতাম না। মনে পড়ে, হঠাৎ একদিন দেখি, সকাল ১০টার দিকে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে সারি সারি লোক নীরবে বেইলি রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

তখন তো আর ঢাকা শহরে মানুষ গিজগিজ করত না। এত লোক একসঙ্গে দেখা, সেটাই ছিল আমার জন্য প্রথম। আশপাশে আমার মতো দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে বুঝেছিলাম, তারা যাচ্ছে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জানাজায় শরিক হতে। বুঝতে পেরেছিলাম, শেরেবাংলা ছিলেন একজন বিশাল মাপের রাজনৈতিক নেতা। পরে সেই অল্প বয়সে মনে মনে একটা চিত্র বোধ হয় প্রোথিত হয়েছিল যে সেই ব্যক্তিই বড় রাজনৈতিক নেতা, যাঁর জানাজায় হাজার হাজার মানুষ যায়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে, আমাদের জাতিগত দুর্ভাগ্য এটাই যে আমরা বড় নেতাদের বড় জানাজা এখনো দেখিনি। তবে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর জানাজায় অনেক লোক সমাবেশ হয়েছিল। তাঁর দল বিএনপি তখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। চলে গিয়েছেন অনেকটা নিভৃতে। প্রধান বিচারপতি-রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের জানাজায় জনসমাগম হয়নি। ফিরিস্তি আর লম্বা নাইবা করলাম।

পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নেতারা তাঁদের শাসনামলেই চিন্তা করা শুরু করে দেন যে শাসনামল শেষে দেশের লোকজন তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে, তাঁর কী কাজ নিয়ে ভাববে, তাঁর কোন কোন কাজের জন্য শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করবে। বলা বাহুল্য, এটা সব উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়। যেমন ইতালিতে কোনো সরকারপ্রধানই এক বা দুই বছরের বেশি টেকেননি। আর আমাদের মতো দেশে নিজ নিজ শাসনামলে নেতারা তাঁদের শাসন নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত থাকেন যে শাসনপরবর্তী সময়ের কথা চিন্তা করার ফুরসত হয়তো তাঁরা পাননি বা পান না।

লেখাটা শুরু করেছিলাম আমাদের সাধারণ জনের সম্ভাব্য শেষকৃত্যের কথা দিয়ে। এ মেঠো চিত্র অবশ্যই বড় নেতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সাধারণ নাগরিকের মতো তাঁরা কি ভাববেন বা ভাবেন তাঁদের শেষযাত্রার কথা? তাঁরা কি ভাববেন আমরা তাঁদের কীভাবে মনে রাখব? এই চিন্তা বা ভাবনা তাঁদের চারপাশের চাটুকারদের কথার ফুলঝুরিতে বুঁদ হওয়া থেকে বেরিয়ে এসেই ভাবতে হবে, এতে সবার মঙ্গল হবে আরও অনেক বেশি।

মৃত্যুর পর তো আর এসব ভাবা যাবে না, কিছু পরিবর্তনও করা যাবে না।

  • ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক