প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, তিন বছর পর গত রোববার রাত সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হলে ক্যাম্পাসে সংগঠনের পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। ঘোষিত কমিটিতে পদ–বাণিজ্য ও অছাত্রদের রাখার অভিযোগে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শাখা ছাত্রলীগের উপপক্ষ চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ারের একাংশের নেতা-কর্মীরা। শতাধিক নেতা-কর্মী বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় তাঁরা ‘অবৈধ কমিটি, মানি না মানব না’ ও ‘টাকার বিনিময়ে কমিটি মানি না মানব না’ বলে স্লোগান দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি শায়ন দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘যাঁরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে শুরু থেকে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে এ কমিটিতে বাইরের অনেকেই পদ পেয়েছেন।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতি দুটি পক্ষে বিভক্ত। এক পক্ষ সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী এবং আরেকটি পক্ষ শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। এই দুটি পক্ষের আবার ১১টি উপপক্ষ আছে। ছাত্রলীগের উপদলীয় সংঘাতের শিকার হয়ে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অসংখ্যবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ শাস্তি পাননি। যাঁদের নামে ছাত্রলীগ নানা উপদলে বিভক্ত, তাঁরাও এর দায়িত্ব নেন না। ১ আগস্ট ছাত্রলীগের অবরোধের পর শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ফেসবুকে যে বার্তা দিয়েছেন, তাতেও প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসেনি। এসেছে অর্ধসত্য। তিনি যদি ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব না চান, সাবেক মেয়রের সঙ্গে বসে বিষয়টি ফয়সালা করছেন না কেন? রাজনীতিতে দেখছি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক টেবিলে বসানো কেবল অসম্ভব নয়; চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের উপদলের দুই অভিভাবক নেতাকেও এক টেবিলে বসানো অসম্ভব।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সম্মেলন করে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিটি কমিটি গঠন করার কথা। কোথাও সম্মেলন করা না গেলে কেন্দ্রীয় নেতারাও কমিটি করে দিতে পারেন বলে উল্লেখ আছে এতে। এখন বিশেষ ক্ষেত্রই ‘সর্বজনীন’ হয়ে উঠেছে। সময়মতো কোথাও ছাত্রলীগের সম্মেলনই হয় না। সম্মেলন হলেও নির্বাচন হয় না। মনোনীত, বিতর্কিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই ছাত্রলীগ চলছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি ঘোষণা করেছেন। সেখানকার নেতা-কর্মীদের ওই কমিটির বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তাঁরা কেন্দ্রীয় কমিটিকে বলতে পারতেন। প্রয়োজনে অভিভাবক প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে নালিশ জানাতে পারতেন। তা না করে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দিয়েছেন। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অচল করার মোক্ষম অস্ত্র হলো শাটল ট্রেন বন্ধ করা। প্রতিদিন শহর থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে আসেন। অবরোধের কারণে শিক্ষক বাসও চলতে পারেনি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হতে বাধ্য।

ছাত্রলীগের ‘বিদ্রোহী’ নেতা-কর্মীরা ২ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় অবরোধ তুলে নিলেও পাক্কা দুই দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ছিল। ১ আগস্ট সারা দিন অবরোধ ছিল। ফলে ক্লাস-পরীক্ষা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। পরদিন সাড়ে ১১টার আগপর্যন্ত ধর্মঘট চলেছে। ফলে ওই দিনও ক্লাস-পরীক্ষা হতে পারেনি। করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন ক্লাস–পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষাজীবন রীতিমতো বিপর্যস্ত। সেখানে ছাত্রলীগের অবরোধের কারণে দুই দিন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি, তার দায় কে নেবে? ছাত্রলীগ নেতৃত্ব কি বলবেন?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কমিটি নিয়ে যে বিরোধ, তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীর কোনো সম্পর্ক নেই। এরপরও তাদের ‘শাস্তি’ ভোগ করতে হলো। এভাবে ছাত্রলীগ কত বিশ্ববিদ্যালয়ের কত শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিয়েছে, তার হিসাব নেই।

দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র দখলদারি। লাগামহীন সিট-বাণিজ্য। কে কোন হলে থাকবে, তা ঠিক করে দেয় ছাত্রলীগ। কে সমাবেশ করতে পারবে, আর কে পারবে না, সেসবও ঠিক করে দেয় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে অছাত্র ও বিবাহিতদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কমিটি করে দিয়েছেন। তাহলে কে কাকে টাকা দিলেন বা কে টাকা নিলেন, এই প্রশ্নও উঠবে। এত দিন ছাত্রলীগ অভিযোগ করত, ছাত্রদল হলো বিবাহিত ও ‘বুড়ো খোকাদের’ সংগঠন। এবারে খোদ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁদের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনেছেন।

ছাত্রলীগের অবরোধের কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। একদিন ক্লাস স্থগিত থাকলে পরদিন পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে নতুন করে সেটি নিতে অনেক সময় লাগবে। সেশনজট আরও বাড়বে।

ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে কেবল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হাঙ্গামা হয়নি। দুদিন আগে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের ৩১৬ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে; যাতে মামলার আসামি, বিবাহিতসহ বিতর্কিত অনেকে ঠাঁই পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পদবঞ্চিতদের একটি অংশ ফটিকছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়েছিল ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। নগরের ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন ডাকার পর মারামারির কারণে তা পণ্ড হয়ে যায়। এরপর ওই বছর ৫ মে তানভীর হোসেন চৌধুরীকে সভাপতি ও রেজাউল করিমকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্যের কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়। এই কমিটি গঠনের এত বছর পর এসে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের অভিযোগ, নবঘোষিত কমিটিতে অছাত্র, মামলার আসামি ও বিবাহিতদের জয়জয়কার। যোগ্য অনেকের জায়গা হয়নি। এই কমিটির বিরুদ্ধে ফটিকছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ হয়েছে। উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, অনেকের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানানো হবে।

এদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের যে ১১ সদস্যের কমিটি হয়েছে, তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, মাদক ব্যবসাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। যশোর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের বিরোধের জেরে ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র নাঈমুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। আসামির তালিকায় ৩ নম্বরে তানভীর ফয়সালের নাম রয়েছে। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সম্মেলন করে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিটি কমিটি গঠন করার কথা। কোথাও সম্মেলন করা না গেলে কেন্দ্রীয় নেতারাও কমিটি করে দিতে পারেন বলে উল্লেখ আছে এতে। এখন বিশেষ ক্ষেত্রই ‘সর্বজনীন’ হয়ে উঠেছে। সময়মতো কোথাও ছাত্রলীগের সম্মেলনই হয় না। সম্মেলন হলেও নির্বাচন হয় না। মনোনীত, বিতর্কিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই ছাত্রলীগ চলছে।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন