২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে। নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটিই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
একই দিনে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারসংক্রান্ত ‘জুলাই সনদ’ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের ওপর এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হবে। এই দুটি উদ্যোগই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ঐতিহাসিক মিশন। এগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনরায় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসার কথা।
এরপরও বাস্তবতা হলো, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন থেকেই যাবে। রাজনৈতিক দল ও গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে এ বিষয়ে বিরোধিতা প্রবল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনুশোচনা দেখা যায়নি। একই সঙ্গে পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যেকোনো মূল্যে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
আমার বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার লক্ষ্যে অধ্যাদেশ প্রণয়ন। এ ছাড়া বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও স্থানান্তরের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের হাত থেকে মুক্ত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছরে কোনো সরকারই এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করেনি। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও এর উপদেষ্টারা নিঃসন্দেহে অভিনন্দনের দাবিদার।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি বড় সাফল্য হতে পারত স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনের কাঠামোয় আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার নানা ব্যবস্থা সংযোজন করে একে কার্যত ক্ষমতাহীন করে ফেলার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। ফলে এই অধ্যাদেশ পুনর্বিবেচনা করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা পুলিশ বাহিনীকে তাঁর আজ্ঞাবহ লাঠিয়াল বাহিনীতে রূপান্তর করেছিলেন। হাসিনার ক্ষমতা রক্ষার প্রয়াসে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচার গুলি চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করে। আহত হন প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যাদের বড় একটা অংশ চিরতরে পঙ্গু ও অন্ধ হয়ে গেছে। উপরন্তু পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় সবাই ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ—এমন ধারণা জনমনে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখাতে না পারা অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গুরুতর ব্যর্থতা।
সরকারের এই অন্তর্বর্তী সময়ের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারলেই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা টেকসই রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে। অন্যথায় এই বিপজ্জনক বাস্তবতায় জাতির জন্য একটাই বার্তা প্রযোজ্য—সাধু সাবধান!
ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারেও অন্তর্বর্তী সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য দেখাতে পেরেছে। প্রায় দেউলিয়াত্বের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আপাতত স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে ভয়াবহ লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল ব্যাংকিং খাত। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ১১টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। বাস্তব প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়স্বজন, দলীয় নেতা ও তাঁর পৃষ্ঠপোষক ধনকুবেরদের লুটপাটের সুযোগ করে দিতে বিপুলসংখ্যক ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল।
এই ১১টির মধ্যে চট্টগ্রামের কুখ্যাত ব্যাংক লুটেরা এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল। একটি চক্রের হাতে সাতটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের নজির পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত এস আলম প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছেন। শেখ হাসিনার সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লুণ্ঠন করেছেন, আর সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এই সংকট সমাধানে অবিলম্বে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল গঠন জরুরি। কিন্তু এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিধা ও নিষ্ক্রিয়তা অগ্রহণযোগ্য।
সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠায়। গত ১৬ মাসেও মব–সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এই মব–সন্ত্রাসের আড়ালে নানা উগ্রপন্থী শক্তি সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলোকে টার্গেট করছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দমনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নিষ্ক্রিয়তা এখানে প্রকট। পুলিশ বাহিনী অধিকাংশ সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
সরকারের আরেক বড় ব্যর্থতা দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে। ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করলেও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশগুলো ছিল হতাশাজনক এবং সরকার সেগুলো বাস্তবায়নেও ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ আবারও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়েছে। জনমনে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে যে সরকার সাংবিধানিক সংস্কারে যতটা আন্তরিক, দুর্নীতি দমনে ততটাই অনীহাপ্রবণ।
সবশেষে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যর্থতা হলো রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ। এই প্রবণতা চলতে থাকলে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ব্যর্থ রাষ্ট্রে রূপান্তরের ঝুঁকি তৈরি হবে। আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ওই গোষ্ঠী সহিংসতার মাধ্যমে বিপদে ফেলবে। নতুন সরকারকে অকার্যকর করার চেষ্টা চালাবে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর ওপর সাম্প্রতিক হামলাই তার প্রমাণ।
সরকারের এই অন্তর্বর্তী সময়ের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারলেই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা টেকসই রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে। অন্যথায় এই বিপজ্জনক বাস্তবতায় জাতির জন্য একটাই বার্তা প্রযোজ্য—সাধু সাবধান!
● ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব
