স্বাধীন বিচার বিভাগ: সংসদ আইন না করলে অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে

শাহদীন মালিক

অধ্যাদেশ সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে, সীমিত সময়ের জন্য নির্বাহী ক্ষমতাবলে জারি করা হয়। এখানে জনসম্পৃক্ততা, সংসদীয় বিতর্ক কিংবা স্বচ্ছতার সুযোগ থাকে না। ফলে আইনটির পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি, সম্ভাব্য প্রভাব কিংবা জনস্বার্থের প্রশ্নগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচিত হয় না।

সাধারণভাবে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলো ভালো এবং সেগুলো সংসদের মাধ্যমে অনুমোদন করা উচিত। কিন্তু এই ধারণার মধ্যেই একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। একটি অনির্বাচিত সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং আমলা মিলে যেভাবে আইন প্রণয়ন করেছেন, সেটা কি খুব কাঙ্ক্ষিত বা গণতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়া? তাহলে সংসদের কী প্রয়োজন?

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শুধু ‘ভালো আইন’ যথেষ্ট নয়; সেই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল নীতিগত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতিই অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।

সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন একটি বহুমাত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। এখানে সরকার একটি বিল উত্থাপন করে, তা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়, সংশোধনের সুযোগ থাকে এবং আবার বিতর্কের মাধ্যমে আইনটি চূড়ান্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় জনগণ জানতে পারে কেন একটি আইন প্রণীত হচ্ছে এবং এর সম্ভাব্য সুফল বা কুফল কী হতে পারে। ফলে আইনটির গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা—উভয়ই বৃদ্ধি পায়। 

তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী প্রেক্ষাপটে এমন কিছু করা একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। এ ক্ষেত্রে একটি যুক্তিসংগত পথ হতে পারে অধ্যাদেশ দুটি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে আইন হিসেবে পাস করা। এতে একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় থাকবে, অন্যদিকে সংস্কারের ধারাবাহিকতাও রক্ষা পাবে। যদি যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে আইন না করা হয়, তাহলে বিচার বিভাগ সংস্কারে সরকারের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

শাহদীন মালিক: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী