অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিসিএস চাকরিসংক্রান্ত প্রস্তুতির জন্য নিজেদের ব্যস্ত রাখে। নিজ ডিসিপ্লিন বা সাবজেক্ট বা বিষয়ের প্রতি তাদের মনোযোগী হতে দেখা যায় না। আমি এমনও দেখেছি, আমার ক্লাসে যে শিক্ষার্থী অনুপস্থিত, সেই একই ব্যক্তি ওই সময় বিসিএস কোচিং সেন্টারে ক্লাসে উপস্থিত থাকে। সকালের প্রথম কর্মঘণ্টা ক্লাসগুলোতে বা বৃষ্টি হলে কিছু শিক্ষার্থী নিজ সাবজেক্টের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, অথচ সেই একই শিক্ষার্থী বিসিএস কোচিং সেন্টারে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও তার উপস্থিতি নিশ্চিত করছে। এটি সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যায় যে শুধু শিক্ষার্থীর মধ্যে নয়, শিক্ষকদের মধ্যেও নিজ ডিসিপ্লিনের অধ্যয়নের প্রতি আগ্রহ ক্রমে কমছে।

বিসিএস প্রস্তুতির প্রতি শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ তাদের নিজ ডিসিপ্লিনের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্ততা কমিয়ে দিচ্ছে। তারা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জ্ঞানার্জন থেকে বঞ্চিত করছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। কিছু কাঠামোগত কারণ রয়েছে, যেগুলো এই অনাগ্রহের জন্য দায়ী।

১. পুষ্টিকর খাদ্য ও আবাসনের অভাব:

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হলের ব্যবস্থাপনা তথা সিট বরাদ্দ ও ডাইনিং হলের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীর রয়েছে চরম অসন্তোষ। সিট বরাদ্দে রাজনৈতিক আধিপত্য কতখানি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত বাজেটে সব আবাসিক শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। হলের বাইরে রাস্তার ধারে বা গাছতলায় যেসব খাবারের দোকান আছে, তা যথাযথভাবে প্রশাসনের ব্যবস্থাপনার অধীন নেই। সেখানে যে খাবার পাওয়া যায়, তা সুষম ও পুষ্টিকর নয়। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা অপুষ্টিকর খাবার গ্রহণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করেই শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করতে বাধ্য হচ্ছে। এরূপ প্রতিকূল পরিবেশে শিক্ষার্থীরা নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

২. শিক্ষার্থীবান্ধবহীন ক্লাস রুটিন:

ক্লাস রুটিনে সাধারণত সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে পঠন–পাঠন নির্ধারণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় একঘেয়েমি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে হয়। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা উদ্দীপনা নিয়ে ক্লাসে উপস্থিত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় যে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহের কিছুদিন শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থেকে লাইব্রেরিতে পড়ালেখা করে।

কেউ সপ্তাহের এক বা দুই দিন কাজ করে উপার্জন করে। পড়ালেখার পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা উপার্জন করলে শিক্ষার্থীরা একাডেমির বাইরে বাস্তবতাকে বুঝতে শেখে। শিক্ষার্থীরা স্বনির্ভর হওয়ার সম্ভাবনা ও উপায় সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মদিবসের প্রতিদিন ক্লাস থাকায় শিক্ষার্থীরা বাস্তব জগতের সঙ্গে পরিচয় হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও বহু শিক্ষার্থী সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউশনি করে আয় করে। টিউশনি বাদে শিক্ষার্থীরা ভিন্ন উপায়ে, যেমন রেস্টুরেন্টে খণ্ডকালীন কাজ বা দোকানে বিক্রেতা হিসেবে কাজ করার সাহস ও উৎসাহ পায় না।

৩. সামঞ্জস্যহীন পরীক্ষার সময় ও নম্বর:

সম্প্রতি উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিস্টার–পদ্ধতিতে পঠন-পাঠন ও পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে একটি একাডেমিক বছরে পড়ালেখার চাপ দুই ভাগে বণ্টন করা হয়েছে, যথা প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টার। প্রতিবছরে দুটি সেমিস্টারের অধীন দুটি চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেমিস্টার–পদ্ধতি ছাড়াও পুরোনো পদ্ধতি, তথা বছরে একটি চূড়ান্ত পরীক্ষাপদ্ধতিও চালু আছে। বলা বাহুল্য, দুটি পদ্ধতিই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত লেখাপড়া করার জন্য অনুপ্রেরণা জোগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বড় কারণ হচ্ছে চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় ও নম্বরের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভেদে পরীক্ষার সময় ও নম্বর ভিন্ন হতে পারে। এখানে একটি সাধারণ চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরোনো পদ্ধতিতে একটি পূর্ণ কোর্সের নম্বরকে দুই ভাগে বণ্টন করা হয়, যথা ২০ নম্বরের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও ৮০ নম্বরের চূড়ান্ত পরীক্ষা। অ্যাসাইনমেন্ট, মৌখিক পরিবেশনা কিংবা ফিল্ডওয়ার্ক ইত্যাদি সম্পন্ন করার মধ্যে দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোর্স শিক্ষক অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন করেন। এ ধরনের পরীক্ষার জন্য সাধারণত কোনো নির্ধারিত সময় বেঁধে দেওয়া হয় না, যেমন শিক্ষক চাইলে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় দিতে পারেন। কিন্তু ৮০ নম্বরের চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য চার ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়। শিক্ষার্থীরা মাত্র ২০ নম্বরের জন্য পর্যাপ্ত সময়ের চেয়েও বেশি পাচ্ছে আর ৮০ নম্বরের জন্য পাচ্ছে মাত্র চার ঘণ্টা—অসামঞ্জস্যতাটা এখানেই।

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার জন্য নির্ধারিত স্থানের অভাব:

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বড় অংশ সাধারণত হলে অথবা মেসে থাকে। সেগুলোতে নিবিড়ভাবে মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করা সম্ভব নয়। কারণ, বাস্তবতা হচ্ছে স্বল্প ব্যয়ে হল ও মেসগুলোতে স্থানের তুলনায় অধিক শিক্ষার্থী থাকে। এমন পরিবেশে কোনো রকম রাতে ঘুমানো যেতে পারে কিন্তু নিবিড় মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করা সম্ভব নয়। নিরিবিলি পরিবেশে পাঠ করার একমাত্র স্থান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কিন্তু সেগুলো শিক্ষার্থীদের কতখানি গুণগত সেবা প্রদানে প্রস্তুত, তা নিয়ে সংশয় আছে।

সন্তানেরা পেশার বৈচিত্র্যময়তা সম্পর্কে অনুসন্ধান করে না। অত্যধিক পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা গ্র্যাজুয়েট হওয়ার আগেই সরকারি চাকরির প্রস্তুতির মধ্যে নিজেকে যান্ত্রিকভাবে নিমজ্জিত রাখে। ফলে জ্ঞানার্জনের পড়ালেখা নয়; বরং চাকরির জন্য পড়ালেখা নীতি অটল থাকে। এই সমস্যা সমাধানে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

৫. জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থানের অভাব:

তুলনামূলকভাবে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর চেয়ে বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন ও কম্পিউটার–সম্পর্কিত বিষয়গুলোর গ্র্যাজুয়েটরা চাকরি করার সুযোগ বেশি পায়। একজন গ্র্যাজুয়েট যদি চাকরির অভাবে বেকার থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি ও তার ডিসিপ্লিন (সাবজেক্ট বা বিষয়) কোনোভাবেই দায়ী নয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পরিকল্পনার অভাবের কারণেই এমনটি ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্র্যাজুয়েটরা তাদের অর্জিত জ্ঞান নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ পায় না।

উদাহরণস্বরূপ, ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন বিষয়ে থেকে যদি ৩০ জন গ্র্যাজুয়েট হন, তাহলে প্রতিবছরে সেই বিষয়ের ওপর গ্র্যাজুয়েট হবেন ৯০০ জন। ৫ বছরে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৫০০। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিমাণ গ্র্যাজুয়েটরা তাদের অর্জিত বিশেষ জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছে কি?

৬. বৈচিত্র্যময় পেশার প্রতি সমাজের রক্ষণশীলতা:

সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পরিবার অন্যতম একটি উপাদান। ব্যক্তিত্ব, পেশা ও মনন গঠনে পারিবারিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের প্রভাব খুবই শক্তিশালী। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজগুলোতে ঔপনিবেশিক কাল থেকে শিক্ষিত ব্যক্তিরা চাপ অনুভব করেন যে তাঁদের অফিস-আদালতেই চাকরি করতে হবে। তাই শিক্ষিত ব্যক্তিদের পেশা নির্বাচন নির্দিষ্ট কিছু কর্মক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে শিক্ষিত ব্যক্তিরা প্রথাগত পেশার বাইরে নিজ আগ্রহের বা পছন্দের পেশা নির্বাচনের সাহস পায় না। এটি পর্যবেক্ষণ করা যায় যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের সরকারি চাকরি, বিশেষ করে সরকারি প্রশাসক হওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। বলা বাহুল্য, আমাদের সমাজে অন্য পেশাজীবীদের চেয়ে প্রশাসকদের কদর অত্যধিক।

কাঠামোগত কারণেই একই গ্রেড ও একই স্কেলের বেতন পাওয়া সত্ত্বেও একজন সরকারি কলেজের শিক্ষকের চেয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সামাজিক মর্যাদা অত্যধিক। সমাজে কোন পেশার মর্যাদা কতখানি, তা ঘটকদের ‘পাত্র-পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন পাঠ করলে বোঝা যায়। আমাদের সমাজে অলিখিত একটি অনুক্রম (হায়ারারকি) আছে। যেমন সমাজে সরকারি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও প্রশাসকদের সামাজিক মর্যাদা বেশি। ঘটকদের বিজ্ঞাপনে এই পেশাগুলো শীর্ষ সারিতে থাকে।

বাংলাদেশের সমাজে অন্যান্য পেশার প্রতি একধরনের অবহেলা পর্যবেক্ষণ করা যায়। পরিবার ও সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এমনটি ঘটছে। বহু অভিভাবক আছে, যারা সন্তানদের পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে খুবই রক্ষণশীল। ফলে সন্তানেরা পেশার বৈচিত্র্যময়তা সম্পর্কে অনুসন্ধান করে না। অত্যধিক পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা গ্র্যাজুয়েট হওয়ার আগেই সরকারি চাকরির প্রস্তুতির মধ্যে নিজেকে যান্ত্রিকভাবে নিমজ্জিত রাখে। ফলে জ্ঞানার্জনের পড়ালেখা নয়; বরং চাকরির জন্য পড়ালেখা নীতি অটল থাকে। এই সমস্যা সমাধানে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অন্যথায় সমাজে শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে হতাশা ও সংকীর্ণ মানসিকতা তৈরি হবে।

  • ড. মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক
    [email protected]