হুতিরা যে কারণে সরাসরি ইরান যুদ্ধে জড়াল

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় গাড়িতে হুতি বিদ্রোহীরাফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানের অনুরোধে হুতিরা কেন ঠিক এই মুহূর্তেই সংঘাতে জড়িয়ে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালাল, তার পেছনে সুস্পষ্ট একটি কৌশলগত সামরিক কারণ রয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার কড়া পদক্ষেপ নেন বা পারস্য উপসাগরে আকাশ, নৌ ও স্থলপথে বড় ধরনের কোনো অভিযান চালান, তবে সেটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এ মুহূর্তে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সোউদা বে এলাকায় মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ডের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ চলছে। অন্যদিকে পেন্টাগন সূত্র জানিয়েছে, তিনটি ডেস্ট্রয়ারসহ নিজেদের একটি শক্তিশালী হামলাকারী বহর নিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে এগোচ্ছে ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ নামের আরেকটি বিশালাকার মার্কিন রণতরি।

সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি পার হয়ে ইরানের উপকূলীয় যুদ্ধক্ষেত্রে এই মার্কিন নৌবহর পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। কিন্তু জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পুঁতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এই অব্যাহত হুমকি মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি এবং সৈন্যসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

হুতিদের এসব সক্ষমতা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে। তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। এর পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেকটি বড় বাধা।

সম্প্রতি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা এবং এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ প্রতিহত করা। মূলত ইরানের ওপর কোনো বড় ধরনের হামলার আগে অথবা কড়া পাহারায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন প্রচেষ্টাকে আটকে দিতেই এ কৌশল নিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার হুতির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এই অব্যাহত হুমকি মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি এবং সৈন্যসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের কাছে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি একটি সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। সেই সূত্রের ভাষ্যমতে, সংঘাতের পেছনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া তেলের বিশাল পাইপলাইন।

আরও পড়ুন

ইরান যদি কখনো হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তখন বিকল্প পথ হিসেবে কাজে আসবে এই পাইপলাইন। এর সাহায্যে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরাসরি তেল পাঠানো যাবে। পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ইউরোপে জ্বালানি তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে এ বিপুল পরিমাণ সরবরাহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হুতিদের কড়া জবাব দিতে এবং নিজেদের রণতরিগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল; আর এর মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের মানচিত্রে খুলে যেতে পারে নতুন আরেকটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এমন সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই আগেভাগে নিজেদের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে।

  • রন বেন-ইশাই লেখক ও বিশ্লেষক

    ওয়াই নেট গ্লোবাল থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত